যুক্তরাষ্ট্রে ‘র’ নিষিদ্ধের সুপারিশ

ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের (র) ওপর নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের একটি কমিশন থেকে।
ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের (র) ওপর নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের একটি কমিশন থেকে।

বাংলাদেশে র‌্যাবের ওপর যেমন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তেমনি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের (র) ওপর নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের একটি কমিশন থেকে।

ধর্মীয় স্বাধীনতা সুরক্ষার কমিশন ইউনাইটেড স্টেটস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম (ইউএসসিআইআরএফ) এই সুপারিশ করেছে বলে রয়টার্সে খবর এসেছে।

ইউএসসিআইআরএফ’র ২০২৫ সালের প্রতিবেদন মঙ্গলবারই প্রকাশিত হয়েছে, সেখানেই ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতা গুরুতরভাবে লঙ্ঘন হচ্ছে অভিযোগ তোলা হয়। ধর্মীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রে দেশ হিসাবে ভা্রতকে চিহ্নিত করা হয় ‘উদ্বেগজনক সত্তা’ হিসাবে। 

পাশাপাশি ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এক শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাকে হত্যার চেষ্টায় জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে ‘র’কে যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করা হয়।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ভারত সরকার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কমিশনটিতেই ‘উদ্বেগজনক সত্তা’ আখ্যায়িত করা হয় বলে এনডিটিভি জানিয়েছে।

এদিকে ইউএসসিআইআরএফ ওই প্রতিবেদনে ধর্মীয় স্বাধীনতার নিরিখে পাকিস্তানকেও ‘উদ্বেগজনক সত্তা’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয় বলে দেশটির সংবাদপত্র ডন জানিয়েছে। সেই সঙ্গে পাকিস্তানের নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান ও সরকারি কর্মকর্তার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে।

এই প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও পাকিস্তান বাদে শ্রীলঙ্কায় ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলেও বাংলাদেশ নিয়ে আলাদা করে কিছু নেই।

পাকিস্তানের দৈনিক ডন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসে ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান উভয় দলের সদস্যদের নিয়ে গঠিত এই কমিশনের সুপািরশ মানার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই বলে তা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তা বাস্তবায়ন করার সম্ভাবনা খুবই কম।

‘র’ নিষিদ্ধের সুপারিশ কেন?

ভারতীয় শিখদের একটি অংশ স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখে। পাঞ্জাব রাজ্যকে কেন্দ্র করে ‘খালিস্তান’ প্রতিষ্ঠার এই আন্দোলনকে বিচ্ছিন্নতা তৎপরতা হিসাবে দেখে ভারত সরকার।

কানাডায় খালিস্তান আন্দোলনের পক্ষে থাকা হরদীপ সিং নিজ্জরকে ২০২৩ সালে গুলি চালিয়ে হত্যার পর তাতে র জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছিল। তা নিয়ে ভারতের সঙ্গে নয়া দিল্লির কূটনৈতিক টানপড়েনও দেখা দেয়।

ওই বছরই নিউ ইয়র্কে আরেক আমেরিকান শিখ নাগরিক গুরপতওয়ান্ত সিং পান্নুকে হত্যাচেষ্টায় ‘র’র জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। এই অভিযোগের পক্ষে কানাডা সরকারের গোয়েন্দা তথ্যের কথা জানিয়েই ‘র’কে নিষিদ্ধের সুপারিশ করেছে ইউএসসিআইআরএফ।

তাদের প্রতিবেদনে বিকাশ যাদব নামে ভারত সরকারের একজন কর্মচারীর নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, হত্যাচেষ্টায় তার সম্পৃক্ততার তথ্য প্রমাণ মার্কিন বিচার বিভাগে জমা পড়েছে।

পাশাপাশি ভারতকে ‘কান্ট্রি অফ পার্টিকুলার কনসার্ন’ বা সিপিসি’র তালিকাভুক্ত করতেও সুপারিশ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। যেসব দেশে সরকার গুরুতরধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনে সম্পৃক্ত হয় বা লঙ্ঘন দেখেও ব্যবস্থা নেয় না, তাদের এই তালিকায় রাখা হয়।

ভারতের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া

ইউএসসিআইআরএফ’র প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিন বুধবার ভারত সরকার একটি বিবৃতি দিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সেই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কমিশনের প্রতিবেদন পক্ষপাতপূর্ণ ও রাজনৈতিক দুরভিসন্ধিমূলক।

“ইউএসসিআইআরএফ যেভাবে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে বারবার ভুলভাবে তুলে ধরতে চাইছে এবং ভারতের প্রাণবন্ত ও বহুত্ববাদী সমাজকে নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চাইছে, তাতে বোঝা যায় ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে তাদের সত্যিকারের উদ্বেগ নেই, বরং এর পেছনে কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে।”

বিবৃতিতে সআরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ওই কমিশন যে ভারতের আসল চিত্রটা তুলে ধরবে, সেটা তারাও আশা করে না।

‘র’ কী, কাজ করে কীভাবে?

১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে নিজেদের গোয়েন্দা সক্ষমতায় ঘাটতি দেখার পর ১৯৬৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর গঠন করা হয় ‘র’। এটি  মূলত বহির্বিশ্বে দেশের জন্য গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে কাজ করে। ‘র’র প্রথম প্রধান ছিলেন রামেশ্বর নাথ কাও। উপপ্রধান ছিলেন শঙ্করণ নায়ার।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথমে ‘র’ ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো বা আইবি থেকে জনবল সংগ্রহ করত। ১৯৭১ সাল থেকে সরাসরি এজেন্ট নেওয়া শুরু করে। তবে ১৯৭৩ সালের পর থেকে কঠোর এক পরীক্ষার মাধ্যমে এজেন্ট নেওয়া শুরু হয় এবং তা এখনও চলছে।

‘র’তে নিয়োগের পর এজেন্টদের অন্তত একটি বিদেশি ভাষা শিখতে হয়। প্রতিকূল পরিবেশে কাজের পরীক্ষা দিতে হয়। আত্মরক্ষার জন্য মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণও দেওয়া হয় এজেন্টদের।

প্রকাশ্যে এক দেশের গোয়েন্দাদের অন্য দেশে কাজ করার সুযোগ না থাকায় নানা ছদ্মবেশে কাজ করতে হয় এজেন্টদের। এক্ষেত্রে বিশ্বের প্রায় সব দেশই বিদেশে তাদের দূতাবাসগুলোকে গুপ্তচরবৃত্তির কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহার করে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘র’ এজেন্টদের প্রায়ই বিদেশে ভারতীয় দূতাবাসে নানা পদে বসিয়ে পাঠানো হয়। অনেক সময় ভুয়া নাম দিয়ে তাদের বিদেশে পাঠানো হয়।

অনুসন্ধানী সাংবাদিক যতীশ যাদব তার বই ‘র: আ হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়াস কভার্ট অপারেশনস’ এ লিখেছেন, “এর পিছনে কারণ হল তাদের আসল নাম সিভিল সার্ভিসের তালিকায় রয়েছে। একবার ‘র’-এ কর্মরত বিক্রম সিংকে বিশাল পণ্ডিত নাম নিয়ে মস্কো যেতে হয়েছিল। তার পরিবারের সদস্যদেরও নাম বদল করা হয়েছিল। বিদেশে অবস্থান কালে ‘র’ কর্মকর্তাদের কারও পরিবারে যদি কোনো শিশু জন্ম নেয়, তবে তাকেও নকল পদবি দেওয়া হয়।”

আরও পড়ুন