রোহিঙ্গাদের রেশন অর্ধেকের বেশি কমালো ডব্লিউএফপি

রেশনের জন্য অপেক্ষারত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা।
রেশনের জন্য অপেক্ষারত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা।

কেনিয়ার শরণার্থীরা তাদের খাদ্য সহায়তা কমানোর প্রতিবাদ জানানোর দিন কয়েকের ব্যবধানে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ‘রেশন’ অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বা ডব্লিউএফপি।

সংস্থাটি বলছে, তাদের কাছে সম্পূর্ণ রেশন সরবরাহ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত তহবিল নেই, তাই খাদ্য সহায়তা ১ হাজার ৫১৫ টাকা থেকে কমিয়ে ৭২৬ টাকায় নামিয়ে আনা হবে।

অনুদানের মাধ্যমে চালিত এই সংস্থা সারাবিশ্ব ১৫ কোটিরও বেশি মানুষকে সহায়তা দিয়ে আসছে।

সংস্থাটি বাংলাদেশকে জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হওয়ায় তারা এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।

রিফিউজিজ ইন্টারন্যাশনালের আফ্রিকা, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিচালক ড্যানিয়েল সুলিভান বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য দাতারা সহায়তা কমিয়ে দেওয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদে সাহায্যে কাটছাঁট করতে হয়েছে, যাকে আখ্যায়িত করেছেন ‘অসমর্থনযোগ্য ক্ষতি’ হিসেবে।

এর আগে অনুদানের পরিমাণ বাড়ানো হলেও জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মার্কিন সহায়তা ব্যয় স্থগিত করার ফলে এবং ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের সহায়তা ব্যয় জিডিপির ০.৫% থেকে কমিয়ে ০.৩% করার সিদ্ধান্তের কারণে অনুদানের অঙ্কে টান পড়ে।

সুলিভান বলেন “এই আকস্মিক খাদ্য সহায়তা কমানোর ফলে দশ লাখেরও বেশি শরণার্থীর ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়বে। এই সিদ্ধান্তের ফলে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী বসতিটির স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার উপরও বিশাল প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।”

তিনি মনে করিয়ে দেন, এর আগে ২০২৩ সালে যখন রেশন কমানো হয়েছিল তখন অপুষ্টি এবং লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছিল।

সুলিভান বলেন, “ইউএসএআইডির পাশাপাশি অন্যান্য দাতারাও তাদের সহায়তার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে, যার ফলে খাদ্য সহায়তার সম্ভাবনা হতাশাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং এর ফলে জীবনহানির শঙ্কা বেড়ে যাবে।”

মাসিক খাদ্য ভাউচার ব্যবহার করে শরণার্থীরা ডব্লিউএফপি’র নির্ধারিত আউটলেট থেকে খাবার কিনতে পারতেন।

শরণার্থীরা জানিয়েছেন, নতুন নির্ধারিত সহায়তা দিয়ে তারা সর্বোচ্চ ১০ কেজি চাল, দেড় কেজি ডাল এবং আধাকেজি লবণ কিনতে পারবেন।

বাংলাদেশের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, তারা যে পরিমাণ সহায়তা পেত তা দিয়ে কোনোরকমে এতদিন জীবন নির্বাহ করতে পেরেছে।

তিনি বলেন, “রেশন অর্ধেকের বেশি কমিয়ে আনায় শরণার্থীদের স্বাস্থ্য এবং পুষ্টির উপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে। শিশু এবং নারীরা এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবেন, কারণ এখানকার শরণার্থী জনসংখ্যার প্রায় ৭৮ শতাংশই শিশু ও নারী।

“বিশেষকরে, জীবনের চাহিদা মেটাতে গিয়ে শরণার্থীদের মাঝে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে। আশ্রয় শিবিরের ভেতরে এবং আশেপাশে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখাই এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।”

কক্সবাজারের শিবিরগুলিতে ১৩ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর বাস। জামতলী শরণার্থী শিবিরে বসবাসকারী রোহিঙ্গা শিক্ষক নূর কদর বলেন, “মনে হচ্ছে বিশ্ব আমাদের না খেয়ে মারতে চাইছে।”

“আমরাও মানুষ, ঠিক পশ্চিমের দেশগুলির মানুষের মতো। অথচ আমাদের অবস্থান তার ধারেকাছেও নেই।”

বালুখালী শিবিরের একজন রোহিঙ্গা শরণার্থী জাফর আলম বলেন, গত চার বছরে বাংলাদেশে খাদ্য এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদার দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।

“পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য, আমরা আসলে রেশনের পরিমাণ বাড়ানোর আবেদন জানিয়ে আসছিলাম। কিন্তু এখন, তারা রেশন আরও কমিয়ে দিচ্ছে। আমাদের সকলকে এখন অনাহারে থাকতে হবে।”

গত সপ্তাহে, ডব্লিউএফপি কেনিয়ার শরণার্থীদের জানিয়েছিল যে, তারা তাদের খাদ্য রেশন মাসে ৩ কেজি শস্যে কমিয়ে আনবে। এ ছাড়া তেল সরবরাহ করবে না – যা সম্পূর্ণ রেশনের ৪০ শতাংশ।

এই পদক্ষেপের ফলে কাকুমা শরণার্থী শিবিরে বিক্ষোভ শুরু হয়, যেখানে ৩ লাখ শরণার্থী বাস করে। ওই বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে চারজন শরণার্থী আহত হয়।

ডব্লিউএফপি চলতি সপ্তাহে জানিয়ে দিয়েছে, সোমালিয়ায়ও তাদের সহায়তার পরিমাণ হ্রাস করতে হবে।

সোমালিয়ার পরিস্থিতি সম্পর্কে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মানবিক চাহিদা বাড়লেও সীমিত তহবিলের কারণে বিভিন্ন কর্মসূচিতে কাটছাঁট বা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে হচ্ছে।

এপ্রিল থেকে ডব্লিউএফপি সর্বোচ্চ ৮ লাখ ২০ হাজার জনকে খাদ্য এবং নগদ সহায়তা দিতে পারবে, যা ২০২৪ সালে প্রতি মাসে পৌঁছেছিল ২২ লাখে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads