মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে শক্তিশালী ভূমিকম্পের কারণ কী

Earthquake

মিয়ানমারে শুক্রবার দুপুরে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূমিকম্পের প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভারতের বিভিন্ন এলাকায়।

ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা এরই মধ্যে হাজার ছাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারকে এই সঙ্কট মোকাবেলায় সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে কী পরিমান ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কারণ দেশটির একটা বড় অংশেই ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে রেখেছে জান্তা বাহিনী।

শুক্রবারের ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে মিয়ানমারের প্রাচীন রাজধানী ও দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ে। সাগাইন অঞ্চলের নিকটে অবস্থিত এই শহরে বহু ভবন ধসে পড়েছে এবং অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া প্রতিবেশি দেশ থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে একটি নির্মাণাধীন ৩০তলা ভবন ধসে পড়েছে। সেখানে শনিবার রাত অব্দি ১০ শ্রমিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আরও ৮১ জন এখনও ধ্বংসস্তুপে আটকা পড়ে আছে। 

জাতিসংঘের ভূমিকম্প ঝুঁকি মূল্যায়ন তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩০ সালে মিয়ানমারের দক্ষিণ শহর বাগোতে ৭ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। তখন কমপক্ষে ৫৫০ জন মারা গিয়েছিলেন।

প্রশ্ন উঠেছে, সেই ভূমিকম্পের এত বছর পর আবার কেন হঠাৎ করে মিয়ানমারে ভূমিকম্প হলো। আর এবারের ভূমিকম্পটি কতটা শক্তিশালী ছিল?

ভূমিকম্পের কারণ

পৃথিবী তিনটি অংশে বিভক্ত: কেন্দ্রে একটি গলিত, অধিকাংশ মেটালিক কোর, তার চারপাশে একটি গরম, প্রায় কঠিন শিলা স্তর যা মানটল নামে পরিচিত। বাইরের দিকে একটি খাঁজকাটা ভূ-স্তর রয়েছে যা টেকটনিক প্লেটের মাধ্যমে তৈরি।

এই প্লেটগুলো মানটলের ওপর স্লিপের মতো চলতে থাকে, বিভিন্ন গতি এবং দিক থেকে। আর এর ফলে শক্তি জমা হয়। এই শক্তি উন্মুক্ত হলে পৃথিবীর পৃষ্ঠে তীব্র কম্পন ঘটে। একে আমরা ভূমিকম্প বলি। আর শক্তি সমুদ্রের নিচে উন্মুক্ত হলে বিশাল তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। এটি সুনামি নামে পরিচিত।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ উইল ইয়েকের মতে, “ভূমিকম্পের মূল কম্পনের পর পৃথিবীতে চাপের পরিবর্তনের কারণে আফটারশক ঘটে।”

মিয়ানমারের ভূগর্ভের অবস্থা

মিয়ানমারের অবস্থান দুটি টেকটনিক প্লেটের মধ্যে। একটি ভারতীয় প্লেট ও অন্যটি ইউরেশিয়ান প্লেট। এর ফলে দেশটি ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে।

এই দুটি প্লেটের সীমান্তকে সাগাইন ফল্ট বলা হয়। বিশেষজ্ঞরা একে একটি দীর্ঘ, সোজা রেখা হিসেবে বর্ণনা করেন। এটি প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ। উত্তর থেকে দক্ষিণে চলে মান্দালয় ও ইয়াঙ্গুন শহরের মধ্য দিয়ে গিয়েছে রেখাটি। এই রেখার উপর বসবাসরত মিয়ানমারের কয়েক লাখ মানুষ সবসময় ঝুঁকিতে থাকে।

ইউএসজিএস অনুযায়ী, মিয়ানমারের ভূমিকম্প হওয়ার কারণ ভারতীয় ও ইউরেশিয়ান প্লেট দুটি একে অপরের পাশের অংশে সংঘর্ষ। এর ফলে ‘স্ট্রাইক-স্লিপ ফল্টিং’ তৈরি হয়।

স্ট্রাইক-স্লিপ ফল্টিং হলো এক ধরনের ভূগাঠনিক পরিবর্তন, যেখানে দুটি ভূ-স্তর (টেকটনিক প্লেট) পরস্পরের বিপরীত দিকে অনুভূমিকভাবে সরতে থাকে। এই ধরনের ফল্টে প্লেটগুলো উল্লম্বভাবে তেমন নড়াচড়া করে না। বরং একে অপরের পাশ দিয়ে ঘষা খায়। এর ফলে ভূ-পৃষ্ঠে তীব্র কম্পন সৃষ্টি হয়।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের টেকটনিক বিশেষজ্ঞ ড. রেবেকা বেল। তিনি লন্ডনভিত্তিক সায়েন্স মিডিয়া সেন্টারের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, দুটি প্লেটের সীমান্তটি ক্যালিফোর্নিয়ার বিখ্যাত সান আন্দ্রিয়াস ফল্টের মতো। ১৯৯৪ সালে মারাত্মক নর্থরিজ ভূমিকম্পের কারণে তৈরি হয়েছিল ওই ফল্টটি।

তিনি বলেন, “সোজা রেখার কারণে ভূমিকম্প বড় এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে যেতে পারে। ফল্টের বড় অংশ সরে গেলেও ভূমিকম্প বড় হয়।”

কতটা শক্তিশালী ছিল ভূমিকম্পটি

১৯৭০-এর দশকে ভূমিকম্প পরিমাপ হতো প্রচলিত রিখটার স্কেলে। কিন্তু এখন ভূমিকম্পের তীব্রতা মোমেন্ট ম্যাগনিটিউড স্কেলে পরিমাপ করা হয়।

শুক্রবারের মিয়ানমারে হওয়া ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পকে শক্তিশালী হিসেবে বিবেচনা করা হয় ওই স্কেলে। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ৩০ তলা একটি নির্মাণাধীন ভবন ধসে পড়ে। এতে কমপক্ষে ১০জন নিহত হন এবং বহু নির্মাণ শ্রমিক ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েন।

মিয়ানমারের মান্দালয়ে বহু ভবন ধসে পড়েছে, প্রাচীন রাজপ্রাসাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এবং সড়ক ও রেল সংযোগকারী আভা ব্রিজ ভেঙে গেছে। এছাড়া বর্তমান রাজধানী নেপিদো ও সাবেক রাজধানী ইয়াঙ্গুনেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দেশজুড়ে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, মিয়ানমারের প্রায় ৮ লাখ মানুষ ভূমিকম্পের সবচেয়ে তীব্র কম্পনের মধ্যে ছিলেন। আগামী দিনে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা

শুক্রবারের ভূমিকম্পটি ছিল তুলনামূলকভাবে অগভীর। মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে।

ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ভূবিজ্ঞান বিভাগের ড. ইয়ান ওয়াটকিনসন সায়েন্স মিডিয়া সেন্টারে বলেন, অগভীর ভূমিকম্প বেশি ক্ষতি করতে পারে। কারণ ভূপৃষ্ঠে পৌঁছানোর আগেই ভূকম্পন শক্তি খুব বেশি হ্রাস পায় না।

ক্যালিফোর্নিয়া ও জাপানের মতো ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে ভবন নির্মাণের বিশেষ নিয়ম রয়েছে। তবে শুক্রবারের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর অবকাঠামো এতটা শক্তিশালী নয়।

ওয়াটকিনসনের মতে, মিয়ানমারে দ্রুত নগরায়ণ ঘটেছে। আর সেখানে ‘রিইনফোর্সড কংক্রিট’ দিয়ে তৈরি অনেক বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে। তিনি মনে করেন, শুক্রবারের ভূমিকম্প ২০২৩ সালে তুরস্কের দক্ষিণে ঘটে যাওয়া ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের মতোই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাতে পারে। সেখানে বহু ভবন অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণের কারণে ধসে পড়েছিল।

আরও পড়ুন