কী বলেছিলেন ইউনূস, মোদীর কাছে যাওয়ার আগে যার ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে

গত ২৮ মার্চ বেইজিংয়ে চীনের ব্যবসায়ীদের সভায় মুহাম্মদ ইউনূস।
গত ২৮ মার্চ বেইজিংয়ে চীনের ব্যবসায়ীদের সভায় মুহাম্মদ ইউনূস।

গত ২৮ মার্চ বেইজিংয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সংলাপ করেছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানাচ্ছিলেন তিনি। এতে কী লাভ, তা তুলে ধরতে বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরছিলেন তিনি।

কিন্তু সেই গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে ভারতের স্পর্শকাতর অংশ ‘সেভেন সিস্টার্স’ নিয়ে একটি কথা বলে বসেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান। তা নিয়ে হৈ চৈ পড়ে যায় ভারতের রাজনৈতিক মহলে।

একে তো কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েন, তার মধ্যে স্পর্শকাতর ‘চিকেন নেক’ নিয়ে কথা বলা; তাও আবার বৈরী দেশ চীনে বসে! ভারতের রাজনীতিকদের মধ্য থেকে আসে তীব্র প্রতিক্রিয়া।

অন্যদিকে বাংলাদেশে কেউ কেউ ইউনূসের ওই মন্তব্যকে বেফাঁস কথা হিসাবে দেখলেও কেউ আবার এটাকে কূটনৈতিক চাল হিসাবে দেখিয়ে তার প্রশংসায়ও মাতেন।

কিন্তু বিমসটেক সম্মেলনে যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাক্ষাৎ পেতে ইউনূস সরকার দেন-দরবার চালাচ্ছে, তখন চীনে করা ওই মন্তব্য সেই পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াল কি না, সেই ভাবনায় পড়ে সরকারি মহল।

দৃশ্যত তাই বিমসটেক সম্মেলনে যোগ দিতে ইউনূস থাইল্যান্ড রওনা হওয়ার আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে এসে তার সেই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিলেন প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমান। তিনি বললেন, চীনে করা ইউনূসের ওই মন্তব্য সৎ উদ্দেশ্যে, এর অন্য কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করানো অনুচিৎ।

এই সংবাদ সম্মেলনেই খলিলুর রহমান জানান, বিমসটেক সম্মেলনে যোগ দিতে বৃহস্পতিবার ব্যাংকক রওনা হবেন প্রধান উপদেষ্টা। সম্মেলনের ফাঁকে মোদীর সঙ্গে তার বৈঠকের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর আট মাস পার হলেও এখনও প্রতিবেশী দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর দেখা পাননি ইউনূস।

ওই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দিল্লি বেশ দূরেরই হয়ে গেছে। শেখ হাসিনাকে ফেরত পেতে চিঠি পাঠানো হলেও তার কোনো জবাব আসেনি দিল্লি থেকে।

এর মধ্যেই বিমসটেক সম্মেলনে যথন দুই দেশের সরকার প্রধান যাচ্ছেন, তখন মোদীর সঙ্গে ইউনূসের বৈঠক আয়োজনের তোড়জোড় শুরু হয় ঢাকা থেকে। তার মধ্যেই চীন সফরে গিয়ে ওই মন্তব্য করে বসেন ইউনূস।

এমন কথা অবশ্য ইউনূস গত বছরের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার সময়ও করেছিলেন। ভারতের সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশ অস্থিতিশীল থাকলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলও শান্ত থাকবে না।

মুহাম্মদ ইউনূসের মন্তব্য নিয়ে ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো সরব।

বিশাল ভারতের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে  সাতটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলে। সেখানে যাতায়াত কঠিন করে তুলেছে বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান। ওই সাত রাজ্যের পাশাপাশি সিকম রাজ্য ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একটি অংশে যাতায়াতের একমাত্র স্থলপথ বাংলাদেশ ও নেপালের মাঝে মুরগির গলার মতো সরু একটি স্থান। একেই বলে ‘চিকেন নেক’, একে শিলিগুড়ি করিডোরও বলে।

বাংলাদেশের পঞ্চগড় থেকে নেপালের মেচিনগরের মাঝের মাত্র ২২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই পথটি কোনোভাবে আটকে গেলে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে ওই রাজ্যগুলোতে যাওয়ার আর কোনো পথ নেই। ফলে ভারতের কাছে এটি স্পর্শকাতর স্থান হিসাবে বিবেচিত।

চীনে যা বলেছিলেন ইউনূস

প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে গত ২৬ মার্চ চীন যান ইউনূস। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।

২৮ মার্চ বেইজিংয়ের ‘দ্য প্রেসিডেন্সিয়াল’ এ চীনা ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে এক বিনিয়োগ সংলাপে যোগ দেন প্রধান উপদেষ্টা। সেখানে তিনি বাংলাদেশের ব্যবসার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চীনা বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানান।

তাকে উদ্ধৃত করে বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়, “বাংলাদেশ এমন একটি চমৎকার ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে যেখানে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রসহ বড় বড় নদীগুলো প্রবাহিত হয়েছে।

“নেপাল ও ভুটান স্থলবেষ্টিত দেশ, যাদের কোনো সমুদ্র নেই। ভারতের সাতটি উত্তর-পূর্ব রাজ্যও স্থলবেষ্টিত।”

বিপরীতে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর এবং সেখানে বিনিয়োগ করলে পাশের বাজার ধরার সুযোগ পাওয়ার কথা চীনের ব্যবসায়ীদের কাছে তুলে ধরেন ইউনূস।

ভারতে প্রতিক্রিয়া

ইউনূসের ওই বক্তব্য প্রথম প্রতিক্রিয়া আসে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার কাছ থেকে। এরপর অন্যরাও সমালোচনায় মুক্ত হন। বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী মোদীর উপদেষ্টা পরিষদের এক সদস্যও প্রতিক্রিয়া জানান।

ইউনূস তার বক্তব্যে ‘চিকেন নেক’ শব্দটি না বললেও তারা মনে করেন, রাজ্যগুলো স্থলবেষ্টিত বলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সরকার প্রধান আসলে ‘চিকেন নেক’র কথাই বুঝিয়েছেন।

ইউনূসের এই বক্তব্যকে আক্রমণাত্মক ও নিন্দনীয় বলে প্রতিক্রিয়া জানান হিমন্ত শর্মা। ‘চিকেন নেক’র দুর্বলতা নিয়ে ইউনূসের ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্য হালকাভাবে না নিতেও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের মিডিয়া ও জনসংযোগ বিভাগের প্রধান পবন খেরা এক্সে এক পোস্টে বলেন, “বাংলাদেশ চীনকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে ভারতকে ঘিরে ফেলার জন্য। বাংলাদেশ সরকারের এই আচরণ উত্তর–পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য খুবই বিপজ্জনক।”

মানচিত্রে ভারতের চিকেন নেক।

মোদীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সঞ্জীব স্যান্যাল ভারতের সাত রাজ্যের কথা কেন ইউনূসের কথায় এল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ চীনের বিনিয়োগ চাইতেই পারে। কিন্তু তা চাইতে গিয়ে কেন ভারতের সাত রাজ্য স্থলবেষ্টিত, এই কথা টানতে হল? এটা বেশ কৌতূহল উদ্দীপক।

ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোও গত কয়েক দিনে ইউনূসের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ‘চিকেন নেক’ নিয়ে বেশ কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

যে ব্যাখ্যা দিলেন ইউনূসের প্রতিনিধি

ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে বুধবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে আসেন প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলিসংক্রান্ত প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমান। সচরাচর সংবাদ সম্মেলনে তাকে দেখা যায় না।

তিনি বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে ইউনূস-মোদী বৈঠকের আশাবাদ প্রকাশের পাশাপাশি ‘সেভেন সিস্টার্স’ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার মন্তব্যের ব্যাখ্যা দেন।

তিনি বলেন, “এ কথাটি প্রধান উপদেষ্টা এই প্রথমবার বলেননি। তিনি ২০১২ সালে একই ধরনের কথা বলেছিলেন। ২০২৩ সালেও জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিশিদা নর্থ-ইস্ট ইন্ডিয়া এবং বাংলাদেশকে একটা ভ্যালু চেইনে আবদ্ধ করার কথা বলেছিলেন এবং তিনি এ প্রসঙ্গে সিঙ্গেল ইকোনমিক জোনের কথাও বলেছিলেন, যেটিকে ‘বিগ বি ইনিশিয়েটিভ’ হিসেবে গণ্য করা হয়।”

খলিলুর বলেন, আন্তঃযোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য ওই কথাটি বলেছিলেন ইউনূস।

“দেখুন আগেই বলেছি, কানেক্টিভিটি এই অঞ্চলের সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে। বিশেষ করে যাদের জন্য সমুদ্রে অ্যাকসেস (প্রবেশের সুযোগ) পাওয়া খুব কঠিন।”

“অত্যন্ত সৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পথে তিনি (ইউনূস) বলেছেন। এখন যদি এর অন্য রকম ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, আমরা তো সেই ব্যাখ্যা ঠেকাতে পারছি না। আমরা শুধু এটুকু বলতে পারব, আমরা কানেক্টিভিটি সবার ইকুইটিফুল বেনিফিটের (সমান সুবিধা) জন্য দিতে আগ্রহী আছি। কেউ নেবেন তো ভালো, না নিলে নেবেন না,” বলেন খলিলুর।

তিনি আরও বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা চীন সফর করছেন কিংবা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তার বৈঠকের সম্ভাবনা আছে। এগুলো কিন্তু জিরো সাম গেম নয় যে এক জায়গায় গেলে অন্য জায়গায় আমাদের সম্পর্ক নষ্ট হবে।

“আমরা সব জায়গায় গিয়ে আমাদের সুবিধা অনুযায়ী এবং পারস্পরিক সুবিধা অনুযায়ী যতটুকু এগোতে পারি, আমরা সেটার চেষ্টা করব। সেই কারণে আমরা সব দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চাই। কাউকে বাদ দিয়ে আমরা এগোতে চাই না।”

এ সম্পর্কিত খবর:

ব্যাংককে ইউনূস-মোদীর বৈঠক শুক্রবার?

আরও পড়ুন