মাদুরোকে ‘অপহরণের’ পর ট্রাম্প আসলে কী চাইছেন?

নিউইয়র্কের স্টুয়ার্ট এয়ার ন্যাশনাল গার্ড বেসে পৌঁছানোর পর ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ)-এর সদস্যরা। ছবি: এবিসি নিউজ
নিউইয়র্কের স্টুয়ার্ট এয়ার ন্যাশনাল গার্ড বেসে পৌঁছানোর পর ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ডিইএ)-এর সদস্যরা। ছবি: এবিসি নিউজ

ভেনেজুয়েলায় যা ঘটেছে, তা খুবই ভয়ংকর দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াল। অন্তত এই একবিংশ শতাব্দীতে! যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি ব্যবহার করে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করেছে বলে বিভিন্ন পত্রিকায় খবর এলেও এটিকে ‘অপহরণ’ বলাই যুতসই। এটি কেবল আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন নয়, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে এভাবে শক্তির ব্যবহার কখনোই ভালো ফল বয়ে আনতে পারে না।

এতে দুটো বড় বিপদ আছে। একদিকে, কেউ কেউ বলছে- এভাবে নাকি ভেনেজুয়েলা মুক্ত হলো। অন্যদিকে, মাদুরোর লোকজন এটাকে অজুহাত বানিয়ে আরও দমন-পীড়ন চালাতে পারে; শক্তি বাড়াতে পারে সেনাবাহিনী। সত্যি বলতে, দুটো ধারণাই ভুল। জোর করে কখনো কোথাও গণতন্ত্র আনা যায় না।

এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফা ও ক্ষমতার রাজনীতির উদাহরণ হয়ে ইতিহাসে জায়গা করে নেবে, যেমনটি হয়েছিল ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের ক্ষেত্রে। ট্রাম্প আইন বা আন্তর্জাতিক নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়েছেন। এতে করে যে সমস্যাটা সামনে দেখা দিতে পারে, তার মধ্যে রয়েছে চীন বা রাশিয়ার মতো অন্য শক্তিশালী দেশগুলো ভবিষ্যতে একই কাজ করার সাহস পেতে পারে। আবার ট্রাম্পের এই জবরদস্তি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকেও হয়তো ভয় পাইয়ে দিয়েছে! ইউরোপকেও আমেরিকার এমন চোখ রাঙানি হজম করতে হতে পারে ভবিষ্যতে। যদিও ফ্রান্স এবং জার্মানি এই অপহরণকে সাধুবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে!

ট্রাম্প বলছেন, ভেনেজুয়েলায় “নিরাপদ পরিবর্তন” না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে কার্যত শাসন করবে। এটা আরও ভয়ংকর কথা। বাইরের কোনো দেশ নিয়ন্ত্রণ করলে সেখানে গণতন্ত্র আসে না, কায়েম হয় উপনিবেশিক শাসন। সবচেয়ে বাজে বিষয় হলো, ভেনেজুয়েলার বিরোধী দল বা জনগণের মতামতের কথাই এখানে গুরুত্ব পাচ্ছে না।

যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ, ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরো সরকার যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ও অস্ত্র পাচার করছে। কিন্তু ভেনেজুয়েলা সরকার পাল্টা দাবি করে আসছিল, দেশের তেল ও খনিজ সম্পদ দখল করার জন্যই যুক্তরাষ্ট্র এ হামলা চালিয়েছে। বিশ্লেষকদেরও ধারণা, দেশটিতে এ রকম ন্যক্কারজনক অভিযানের পেছনে আছে দেশটির বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেলসম্পদ দখলের পাঁয়তারা। ইতোমধ্যে মার্কিন কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় তেল ব্যবসা চালিয়ে লাভ করার কথা বলতেও শুরু করেছে।

ট্রাম্পের কথায়ও এর সত্যতা মেলে। তিনি মাদুরোকে জিম্মায় নেওয়ার সংবাদ সম্মেলনে বলছিলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা পেলে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প ‘অনেক অর্থ’ আয় করতে পারবে। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় তেল কোম্পানিকে ভেনেজুয়েলায় পাঠাব। তারা হাজার হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে; ভেঙে পড়া তেল অবকাঠামো ঠিক করবে। এই তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার হয়ে আয় করবে।”

তিনি আরও বলেন, ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প ‘পুরোপুরি ব্যর্থ’; অনেক দিন ধরেই তাদের এ অবস্থা। যতটা তেল তারা তুলতে পারত, সে তুলনায় তারা প্রায় কিছুই তুলতে পারেনি।”

তেলের মজুত নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য এবং মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর আকাঙ্ক্ষা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার, এই হস্তক্ষেপ মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য নয়, বরং তেল আর মার্কিন স্বার্থের জন্য।

আন্তর্জাতিক সমাজের দায়িত্ব হলো- আইন মানা এবং ভেনেজুয়েলা এবং বাংলাদেশের মতো দেশের জনগণের চাওয়াকে সম্মান করা। শক্তির জোরে নয়, ব্যালটের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করা। আর তা না হলে বাংলাদেশের মতো নৈরাজ্যের উদাহরণ তো চোখের সামনেই আছে।

এনার্জি ইনস্টিটিউটের হিসাব মতে, বিশ্বের মোট তেল মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশ ভেনেজুয়েলার হাতে, যার পরিমাণ প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল। একসময় ভেনেজুয়েলার তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা জারির পর সেই সম্পর্ক বদলে যায়। এখন দেশটির তেলের প্রধান গন্তব্য চীন। যা যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষেপিয়ে তুলেছিল।

ভেনেজুয়েলায় পরিবর্তন যদি হয়, তা হওয়া উচিত শান্তিপূর্ণভাবে, আলোচনার মাধ্যমে। সকলের অংশগ্রহণে ভোটের মাধ্যমে। তবে আমেরিকা সম্ভবত সেই পথে হাঁটবে না। কারণ তাদের পছন্দের মানুষ, যার পেছনে দীর্ঘ ও বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে বলে ভাবা হয়, সেই বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাডো যিনি কিছুকাল আগে শান্তিতে নোবেল পেয়েছিলেন, তিনি দেশটিতে অজনপ্রিয় ব্যক্তিদের শীর্ষে অবস্থান করছেন। ভোট হলে, আবারও মাদুরোর উত্তরসূরী ক্ষমতায় ফিরবে এটা কল্পিত কোনো বিষয় নয়।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও মাচাডো সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী নন, যেমনটি আগে ভাবা হয়েছিল। শনিবার ওই নজিরবিহীন অপহরণ ঘটনার পর সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি দেশটির পরবর্তী নেতা হিসেবে মাচাডোকে মেনে নিতে অস্বীকার করেছেন।

ট্রাম্পের ভাষায়: “মাচাডো খুব ভালো একজন নারী। আমার মনে হয় ওর পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়া কঠিন হবে। দেশের ভিতরে তার তেমন গ্রহণযোগ্যতা নেই।”

এ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, আমেরিকা এত দ্রুত দেশটি কথিত গণতন্ত্রের পথে পরিচালিত হোক তা চাইছে না। বরং নিজেদের ডামি কাউকে দিয়েই মার্কিন স্বার্থ নিশ্চিত করতে চাইছে। যেমনটি নিকট অতীতে ইরাক ছাড়াও আরব বসন্তের পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে দেখা গিয়েছে।

এর মানে এই নয় যে মাদুরো ভালো শাসক ছিলেন। তিনি নির্বাচনে কারচুপি করেছেন, বিরোধীদের দমন করেছেন, এসব যেমন সত্য, তেমনি তিনি দেশের উন্নয়নে, জনগণের স্বার্থ রক্ষায় সর্বোচ্চ মনোযোগী ছিলেন- এটাও ভুল নয়। তাকে সরানোর সঠিক পথ কোনোভাবেই যুদ্ধ হতে পারে না।

সাম্প্রতিক সময়ে এমন ঘটনা না ঘটলেও বাংলাদেশে কাছাকাছি ঘটনাই ঘটতে দেখা গেছে। দেশটির সরকারকে উৎখাতের পেছনে ‘ডিপ স্টেটের’ ভূমিকা এখন আর আড়ালে নেই। যাকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছিল, সেই মুহাম্মদ ইউনূসকে তৈরি করতে আমেরিকার বিপুল বিনিয়োগ ছিল, শান্তিতে নোবেল পাইয়ে দিতে দরকষাকষি ছিল- এমন সন্দেহ একদম অমূলক নয়। তার শাসনের দেড় বছরের দিকে তাকালে এটা স্পষ্ট হয়ে যায়- এ ধরনের চাপিয়ে দেওয়া সরকার কোনো দেশের জন্য ভালো ফল নিয়ে আসতে পারে না।

যাই হোক, আন্তর্জাতিক সমাজের দায়িত্ব হলো- আইন মানা এবং ভেনেজুয়েলা এবং বাংলাদেশের মতো দেশের জনগণের চাওয়াকে সম্মান করা। শক্তির জোরে নয়, ব্যালটের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করা। আর তা না হলে বাংলাদেশের মতো নৈরাজ্যের উদাহরণ তো চোখের সামনেই আছে।

এহেছান লেনিন: সংবাদকর্মী ও গবেষক

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads