বাংলাদেশে এখন সর্বত্র আলোচনা- দেশ কি সত্যিই জরুরি অবস্থা জারি হওয়ার পথে হাঁটছে? চায়ের আড্ডা থেকে বাজারে, সবখানে একই বিষয়, ভেতরে হচ্ছেটা কী! খবর মিলছে না গণমাধ্যমে, সামাজিক মাধ্যমের উড়ো খবরই তাই ভরসা!
সরকারি মহল থেকে যদিও সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘জরুরি অবস্থা’ জারির মতো পরিবেশ দেশে বিরাজ করছে না, বরং এ ধরনের খবরের পুরোটাই গুজবনির্ভর। তবে রাজনীতিবিদদের বিচ্ছিন্ন ‘আলাপ’ আর বিভিন্ন বিশ্লেষণে যে আঁচ মিলছে তা কিন্তু সর্বাংশে উড়িয়ে দেওয়াও যায় না!
সাড়ে সাত মাস আগে ঘটনা ছিল পুরোপুরি উল্টো। জুলাই আন্দোলনের চূড়ান্ত লগ্নে সেনাবাহিনী তখন ‘দর্শকের ভূমিকায়’, শেখ হাসিনা দেশ ছাড়লেন, সেই ৫ আগস্ট শাহবাগে সেনাসদস্যদের আলিঙ্গনে বেঁধেছিল আন্দোলনকারীরা।
সেই আন্দোলনের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা দলের একজন শীর্ষ নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ বিতর্ক উসকে দিলেন এই বলে যে, আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন প্রশ্নে সেনাবাহিনী তাদেরকে চাপ দিচ্ছে।
এ নিয়ে গেল শুক্রবার রাজপথে বিক্ষোভের ঘোষণা এলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় তা হালে পানি পায়নি। যদিও সীমিত আকারে মিছিল হয়েছে, স্লোগান ওঠেছে- ‘ওয়াকার না হাসনাত/ হাসনাত, হাসনাত, কচুক্ষেত না রাজপথ/ রাজপথ, রাজপথ’।
মিছিলের সেই ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পরিস্থিতিকে ভিন্ন মাত্রা দেওয়ার চেষ্টা করলেও এবার আর সফল হননি ধানমণ্ডি বত্রিশের ভাঙচুরের নির্দেশদাতা অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্য ও তার অনুসারীরা।
মূলত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর দিন যত গড়াচ্ছে, রাজনীতির চিত্র পাল্টাচ্ছে প্রতিদিনই। এই মাঠের বড় খেলোয়াড় আওয়ামী লীগ নেই, আরেক বড় খেলোয়াড় বিএনপি সদর্পে থাকলেও কী যেন একটা অস্বস্তি। নিষিদ্ধের খাঁড়া কাটিয়ে জামায়াতে ইসলামী ডালপালা মেলছে। নতুন জার্সিতে এই খেলায় নেমেছে অভ্যুত্থানকারী তরুণরা, নতুন রাজনৈতিক দল গড়ে।
বাংলাদেশের রাজনীতির দাবায় আগে সামনে থেকে খেললেও এখন কী কারণে সেনাবাহিনীকে পেছনে থেকে খেলতে হচ্ছে তা আর অজনা নেই। অভ্যুত্থানকারীরা মুখোমুখি দাঁড়ালেও এবিষয় নিয়ে তেমন একটা উচ্চবাচ্য করেনি সেনাবাহিনী। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) থেকেও দেওয়া হয়নি কোনো প্রতিক্রিয়া।

উল্টো রোববার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইফতার সারেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। ওই আয়োজনে তাদের সঙ্গে কেবল কুশল বিনিময়ের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি সেনাপ্রধান, পাশে থাকার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেছেন।
বাইরে সেনাবাহিনীর প্রতিক্রিয়া দৃশ্যমান না হলেও বিভিন্ন মাধ্যমে খবর বের হয়েছে, সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে রোববার রাতে এবং সোমবার সকালে সেনা সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিমিয় করেছেন সেনাপ্রধান।
সোমবারের ওই সভায় যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে, দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা স্থিতিশীল ও উন্নতি করে সেনা সদস্যরা ক্যান্টনমেন্টে ফিরে যাবেন, কোনো উসকানিতে প্রতিক্রিয়া না দেখানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়। এ ছাড়া সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আশঙ্কার কথা জানিয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
চারিদিকে প্রচুর ভুল তথ্য ছাড়ানোর কথা তুলে ধরে সবাইকে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও ধৈর্য ধারণের নির্দেশনাও দেওয়া হয় সেসব সভা থেকে।
এ বিষয়ে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক নবনীতা চৌধুরী বলেন, “দেশের যা অবস্থা তাতে হয়তো জরুরি অবস্থা জারি হতে পারে। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ১/১১-র মতো এবার পুনরাবৃত্তি হবে কি না।”
১/১১ এর কথা মনে করিয়ে দিয়ে এই রাজনীতি বিশ্লেষক বলেন, “১/১১-তে কি ঘটেছিল? প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে রেখে উপদেষ্টারা বাংলাদেশ সরকারের কাজ করছিলেন। সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ উপদেষ্টা পরিষদ ভেঙে দিয়ে নতুন সরকার গঠন করেন। সেই সরকারের প্রধান হলেন ফখরুদ্দিন আহমেদ।”

“তার মানে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বিশ্বস্ত ও অনুগত এমন একজনকে প্রধান উপদেষ্টা করে একটি নতুন সরকার গঠন হতে পারে। এই সরকারের দুটি প্রতিশ্রুতি দিতে চাইবে। এক- আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হবে এবং দুই- অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের দিকে হাঁটবে।”
তিনি বলেন, “জরুরি অবস্থা হোক বা না হোক। সেনাবাহিনীর কমান্ড ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশ সেনাপ্রধানকে বর্তমান সরকারের একটা বড় পরিবর্তনের সম্ভবনা আমি দেখছি।”
সেনাপ্রধানকে নিয়ে ‘গুজব’ ছড়ানোর বিষয় সামনে এনে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান বলেন, “কিছু মানুষ গুজব ছড়িয়ে মজা পান। গুজব ছড়িয়ে নির্বাচন পিছিয়ে দিতে চায়। সেনাপ্রধানকে সরিয়ে দিতে দেওয়ার অংশ এই জরুরি অবস্থার গুজব।”
পাশাপাশি যোগ করেন, “জরুরি অবস্থা জারি করতে হলে সেটি প্রধান উপদেষ্টাকে করতে হবে। রাষ্ট্রপতি যদি তা করেও তা প্রধান উপদেষ্টার সম্মাতিতে করতে হবে। সংবিধান ও আইন তাই বলে।”
এদিকে, বাংলাদেশের সেনা তৎপরতা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের গণমাধ্যমে সোমবার একাধিক খবর বের হয়েছে।
দিল্লির জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জয়ন্ত রায় চৌধুরী বলেন, “এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে বাংলাদেশ সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনাবাহিনীর ‘ধৈর্য’ সম্পর্কে কথা বলেন, বিশেষ করে ইসলামী চরমপন্থীদের হামলার হুমকির প্রেক্ষাপটে। তিনি সতর্ক করে দেন যে গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী আগামী মাসে কিছু ‘অস্বাভাবিক’ ঘটনা ঘটতে পারে, তাই সেনাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।”
তিনি বলেন, “এর অর্থ দাঁড়ায় যে কোনো মুহূর্তে সেনাবাহিনী বিশেষ ব্যবস্থা নিতে পারে। এখন যা অবস্থা তাতে জরুরি অবস্থা জারি করা সময়ের ব্যাপার মাত্র।”
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ‘রেড এলার্ট’ দিয়ে রাখা হয়েছে বলে দাবি করেন ভারতের অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা কর্নেল দীপ্তাংশু চৌধুরী।
তিনি বলেন, “সোমবার সকালে সেনা সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে কমব্যাট ইউনিফর্মে সবাইকে আসতে বলা হয়েছিল। সবাই সেভাবেই এসেছে। কমব্যাট ইউনিফর্ম পরার অর্থ অপারেশন ডেপ্লয়।”
হিযবুত তাহরীর, জামায়াত-শিবির, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ছাত্রদের পরিচয়ে মাঠে নামতে পারে বলে ভারতের কাছ খবর আছে বলেও জানান তিনি।
যদিও জরুরি অবস্থা জারির বিষয়টি ‘গসিপ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রসচিব নাসিমুল গনি।
সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এসব গসিপ আলাপ–আলোচনা হচ্ছে। আমরা সতর্ক আছি, পুলিশ সতর্ক আছে, সবাই চেষ্টা করছি যে স্থিতিশীলতা আছে, সেটা যেন রক্ষা করতে পারি।”
দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কার কোনো তথ্য নেই এবং পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও দাবি করেন স্বরাষ্ট্রসচিব।