ধান উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দশ দেশের তালিকায় নেই জাপান। তবু দেশটির প্রধান খাদ্য শষ্য ধান। দেশটির কৃষ্টি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধানের সংযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই জাপানেরই এখন নিজের জনগণের কাছে বিক্রির মতো চাল নেই।
কিন্তু কেন নেই, এর সঠিক কারণ নিয়ে সবার মত এক নয়। গত বছর চালের উৎপাদন কিছুটা বাড়ায় সঙ্কট কমার আশা জেগেছিল। কিন্তু এ বছর জাপানে চালের দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। ফলে মানুষ অসন্তুষ্ট। একে অন্যকে দোষারোপ করছে। আর সরকার বাধ্য হয়ে জরুরি মজুদ থেকে চাল সরবরাহ করছে।
জাপানের প্রধান খাবার চাল। এর দাম বেড়ে যাওয়ায় সমাজে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ভোক্তারা ক্ষুব্ধ, পাশাপাশি সাকের (স্থানীয় মদ) প্রস্তুতকারক ও রেস্তোরাঁ মালিকেরাও অসন্তুষ্ট। কিছু সুপারমার্কেট ক্রেতাদের চাল কেনার পরিমাণ সীমিত করেছে।
গ্রামের বৃদ্ধ কৃষকরা তাদের নাতি-নাতনিদের জন্য টোকিওতে চাল পাঠাচ্ছেন। সোশাল মিডিয়ায় চাল সঙ্কট নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি এর প্রভাব বিদেশি মুদ্রাবাজারেও পড়েছে। গত জানুয়ারিতে সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় ব্যাংক অব জাপান। এতে ইয়েনের মূল্য বেড়েছে।

জাপানের চাল বাজার একটি জটিল ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হয়। দেশটিতে কৃষকরা চাল বিক্রি করেন এজেন্টদের কাছে। এজেন্টরা এটি পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। আর পাইকাররা দোকান ও রেস্তোরাঁয় সরবরাহ করেন।
গত বছর চাল উৎপাদন ১ লাখ ৮০ হাজার টন বেড়েছিল। তবে এজেন্টরা জানিয়েছে, তারা প্রত্যাশিত পরিমাণের তুলনায় ২ লাখ ৩০ হাজার টন কম চাল কিনতে পেরেছে। জাপানের কৃষি মন্ত্রণালয়, যারা চাল উৎপাদনের হিসাব রাখে, এই পার্থক্যের কারণ ব্যাখ্যা করতে পারছে না।
কৃষি, বন ও মৎস্যমন্ত্রী তাকু এতো গত ২১ ফেব্রুয়ারির এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “চাল অবশ্যই আছে। পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, কোথাও কিছু চাল মজুদ বা লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এ কারণেই সঙ্কট দেখা দিয়েছে।”
চালের দাম বাড়তে শুরু করে গত বছরের আগস্টে। তখন সরকার দক্ষিণ জাপানের উপকূলে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কার কথা জানায়। এতে মানুষ আতঙ্কে বেশি চাল কিনতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে সতর্কতা তুলে নেওয়া হলেও দাম কমেনি।
ধান চাষিরা সাধারণত খুব বেশি আয় করেন না। ওয়েবসাইট এগ্রিজব অনুসারে, ধান চাষিদের বার্ষিক আয় গড়ে ২৫ থেকে ৩০ লাখ ইয়েন (প্রায় ১৭ থেকে ২০ হাজার ডলার)। তাই চালের দাম বাড়ায় তারা কিছুটা লাভবান হচ্ছেন।
সাধারণত কৃষকরা লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্টদের কাছে চাল বিক্রি করেন। তবে ২০০৪ সালে সরকার তাদের বিক্রির অধিকাংশ বাধ্যবাধকতা তুলে নেয়।
অনলাইনে গুজব ছড়িয়েছে যে কিছু লোক গ্রামাঞ্চলে গিয়ে প্রচুর চাল কিনছে। কিন্তু কৃষকরা জানিয়েছেন, এমন কিছু ঘটছে না।
শিগা প্রদেশের ধান চাষি তাকাকাজু ইয়াগুরা বলেন, “গোপনে কেউ অসৎ উদ্দেশ্যে কাজ করছে না। কিছু মধ্যস্বত্বভোগী হয়তো মজুত রেখে লাভের আশায় চাল জমাচ্ছেন। তবে এতে দোষের কিছু নেই। ব্যবসায় এটাই স্বাভাবিক।”
ভোক্তারা উচ্চ মূল্যের চাপ অনুভব করছেন। ৫ কিলোগ্রামের একটি সাধারণ চালের ব্যাগের দাম বেড়ে গড়ে ৩ হাজার ৯৫২ ইয়েন হয়েছে। এটি এক বছরের ব্যবধানে ৯৫ শতাংশ বেশি। দামের এই ঊর্ধ্বগতির কারণে জাপান জানুয়ারিতে চালের বল ও বেন্টো লাঞ্চ বক্সের দাম বাড়িয়েছে। এর ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে, যা ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ের পর দ্রুততম হারে বাড়ছে।
জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর কাজুয়ো উয়েদা এক বছরে তিনবার সুদের হার বাড়িয়েছেন। দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকলে ভবিষ্যতে আরও সুদের হার বাড়তে পারে।

সোমপো ইনস্টিটিউট প্লাস ইনক-এর অর্থনীতিবিদ মাসাতো কোইকে বলেন, “ভোক্তাদের দৃষ্টিতে পণ্যের দাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই চালের মূল্য উপেক্ষা করা যাবে না।”
খাদ্যের উচ্চ মূল্য নিয়ে জাপানের জনমনে অসন্তোষ ছিল। এটি গত বছরের নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছিল। সেই নির্বাচনে শাসক লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি সংসদে কিছু আসন হারায়।
ভোক্তাদের আর্থিক চাপ কমাতে সরকার চালের মজুদ উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এজেন্টরা এ মজুদ কেনার জন্য দরপত্র জমা দিতে পারে।
টোকিওর তামাচি এলাকায় একটি মুদি দোকানে গিয়ে চাল পাননি স্থানীয় বাসিন্দা ইউতাকা ওজেকি। প্রতি পরিবারকে দিনে শুধু এক ব্যাগ চাল কেনার অনুমতি দেওয়া হচ্ছিল। ফলে ওজেকিকে রুটি কিনতে হয়।
তিনি বলেন, “আমি সম্প্রতি চাল কিনিনি কারণ দাম অনেক বেড়ে গেছে। (প্রধানমন্ত্রী) ইশিবা মূর্খ। উচ্চমূল্যের জন্য সরকারের দায়ী হওয়া উচিত।”
বিশ্বব্যাপী চালের দাম কমছে। সম্প্রতি এশীয় মূল্য সূচক ২০২২ সালের পর সবচেয়ে কমে গেছে। তবে দেশি চালের প্রতি আগ্রহ, বিদেশি চালের উপর উচ্চ শুল্ক ও জটিল সরবরাহ ব্যবস্থা চাল আমদানি করে দাম কমাতে সাহায্য করেনি।
সরবরাহ ব্যবস্থার প্রথম মধ্যস্বত্বভোগী হলেন এজেন্টরা। তারা সরকারকে তাদের চাল কেনার পরিমাণ ও কাকে বিক্রি করেছেন, তা জানায়। জাপানের উৎপাদিত ধানের প্রায় অর্ধেকই কেনে সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী এজেন্ট জেএ গ্রুপ। আরও কয়েক হাজার ছোট স্থানীয় ব্যবসা রয়েছে। তারা কৃষক ও ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক বজায় রেখে ব্যবসা করে।
তচিগি প্রদেশের একটি কৃষি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিদেমাসা এবিহারার মতে, চাল সংগ্রহের প্রতিযোগিতা এখন তীব্র হয়েছে। ছোট এজেন্টরা সাধারণত জেএ থেকে ৬০ কিলোগ্রামের পালিশ না করা চালের ব্যাগে ৩০০ থেকে ৫০০ ইয়েন বেশি দিত। কিন্তু সরবরাহ সঙ্কটের কারণে, এজেন্টরা কৃষকদের জন্য তাদের প্রিমিয়াম বাড়িয়ে ৩-৪ হাজার ইয়েন করেছে।
এবিহারা বলেন, “চালের সরবরাহ কতটা সংকুচিত হয়েছে, তা এটি দেখে বোঝা যায়। এটি আরও স্বাধীন সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করবে। সেখানে উৎপাদকরা সরাসরি ভোক্তা ও রেস্তোরাঁকে চাল বিক্রি করবে।”
কৃষক ও এজেন্টদের মধ্যে ২০২৪ সালের ৭ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন টন চাল উৎপাদন নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। গত গ্রীষ্মে জাপানে তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি ছিল। ফলে অনেক উৎপাদক তাদের ফসলের ফলন কমে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন। তারা মনে করেন অন্য কৃষকরাও একই সমস্যা মোকাবেলা করেছেন।
ওকায়ামা প্রদেশের কৃষক মাসাতো তাকাদা বলেন, “আমি জানি না কে চাল লুকিয়ে রেখেছে। তবে আমার মনে হয় উৎপাদিত চালের পরিমাণ রিপোর্ট করা সংখ্যার চেয়ে কম। তাপমাত্রার কারণে অনেক ক্ষতি হয়েছে।”

৭৭ বছর বয়সী ইয়োশি মাচিদা একই মত প্রকাশ করেন এবং বলেন, “উষ্ণতার কারণে আমি এখন নিগাতা চালের স্বাদ পছন্দ করি না।”
চাল সঙ্কট মোকাবিলায় সরকার বিশেষ গুদামে মজুদ করা জরুরি সরবরাহ থেকে চাল বিক্রির পরিকল্পনা করেছে। ২ লাখ ১০ হাজার টন চাল বিক্রি করা হবে। এর মধ্যে দেড় লাভ টন চাল মার্চ ১০ থেকে ১২ তারিখে দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি হয়েছে। মোট ১ মিলিয়ন টন জরুরি মজুদ রয়েছে সরকারের কাছে।
তবে চাহিদা এত বেশি যে তুহোকু বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বাজার বিশেষজ্ঞ কাতসুহিতো ফুয়ুকি বলেন, “অতিরিক্ত সরবরাহও দাম কমাতে সহায়ক হবে না। এটি দরপত্র পদ্ধতি হওয়ায় দাম খুব একটা পরিবর্তন হবে না। উচিত ছিল খুচরা ও রেস্তোরাঁগুলোর জন্য মূল্য নির্ধারণ করা।”
গ্রামীণ এলাকায় ভোট পেতে আগের সরকারগুলো ছোট কৃষকদের সমর্থন দিয়েছে। আবার জনসংখ্যার হ্রাসের কারণে চালের চাহিদা কমবে, এমন ধারণা থেকে অনেক জমিতে ধান চাষ বাদ দিয়ে অন্য ফসল ফলানো হয়েছে। পাশাপাশি সার ও কীটনাশকের দাম বাড়ায় লাভও সংকুচিত হয়েছে।
বৃহত্তম সাকে প্রস্তুতকারক আসাহি সুজো কোম্পানির চেয়ারম্যান হিরোশি সাকুরাই বলেন, “জাপান এবং বিশেষ করে কৃষি মন্ত্রণালয় এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে যেখানে ধান চাষের জন্য কোনো আশা নেই। ছোট আকারের কৃষি টেকসই নয়। আমাদের বড় আকারের কৃষির দিকে এগোতে হবে।”
চাল জাপানি খাদ্য ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও অনেক বছর ধরেই এর চাষ হ্রাস পাচ্ছে। দেশটির কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ধান চাষিদের গড় বয়স প্রায় ৭১। ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে কৃষকের সংখ্যা ২৫ শতাংশ কমেছে।
হাকুতসুরু সাকে প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যবস্থাপক হিতোশি মিজুতানির মতে, কৃষকদের উপর চাপ অত্যন্ত বেশি। কৃষি দুর্বল হয়ে পড়ছে। কৃষকরা এই শিল্প ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদী ব্যাঘাত হবে। দাম আরও বাড়তে হবে।”
তথ্যসূত্র : ব্লুমবার্গ