কাবুলের আনাচে কানাচে ‘হাজারো চোখ’?

Kabul

দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রচীন আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল। একটা সময় ভারতবের্ষর রাজধানীও ছিল এই শহর। সম্রাট বাবর, আহমদ শাহ থেকে সামানি, গজনবী, খলজি, দুরানি রাজবংশ শাসন করেছে কাবুল।

দীর্ঘ অপেক্ষা আর লড়াইয়ের পর সেই শহরেরই বর্তমান শাসনভার তালেবানদের হাতে। বলা হয়ে থাকে তালেবানদের নজর নাকি সবখানে। বাসিন্দাদের মুখেই শোনা।

কথা কিন্তু একদম মিথ্যে নয়! গোটা কাবুল জুড়ে তালেবানের ৯০ হাজারের বেশি চোখ আছে, যেগুলো দিয়ে চলে সার্বক্ষণিক নজরদারি। বলছি মূলত সিসিটিভি ক্যামেরার কথা।

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের প্রশাসনিক এলাকার একটি ভবনের ভেতরকার একটি বড় রুমের দৃশ্য। রুমটায় ভিড় অনেক। ভেতরে ডজন খানেক টিভি স্ক্রিন। রুমের ভেতরে থাকা প্রায় সবারই নজর ওই টিভি স্ক্রিনগুলোতে। 

এটি মূলত কাবুল পুলিশের নিয়ন্ত্রণকক্ষ। এখান থেকেই পুরো কাবুলের ওপর নজর রাখেন তারা। নিয়ন্ত্রণকক্ষের টিভি স্ক্রিনগুলোর সামনে পুলিশ সদস্যরা সারিবদ্ধভাবে বসে থাকেন। তাদের সামনে হাজারো ক্যামেরার ফুটেজ। 

প্রায় ৯০ হাজার সিসি ক্যামেরার এই নেটওয়ার্কটি প্রতিদিন ৬০ লাখ আফগানের দৈনন্দিন জীবন পর্যবেক্ষণ করতে ব্যবহৃত হয়। গাড়ির নম্বর প্লেট থেকে মুখের অভিব্যক্তি পর্যন্ত সবকিছু নজরদারির আওতায় থাকে।

তালেবান পুলিশের মুখপাত্র খালিদ জাদরান।

তালেবান পুলিশের মুখপাত্র খালিদ জাদরান জানান, এই রুম থেকেই পুরো কাবুল শহর পর্যবেক্ষণ করা হয়। প্রয়োজনে এখান থেকেই বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

তালেবান কর্তৃপক্ষ বলছে, শহরে অপরাধ দমনে সহায়তা করছে এই নজরদারি। যদিও সমালোচকরা বলছেন, এটি ভিন্নমত দমন এবং তালেবান সরকারের শরিয়া আইন অনুযায়ী কঠোর নৈতিকতা বিধি পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হতে পারে।

জাদরান জানান, টিভি স্ক্রিনে কোনো এলাকায় মানুষের জটলা দেখে মাদক সেবন করছে এমন সন্দেহ হলে দ্রুত স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পুলিশ তৎক্ষণাৎ সেখানে গিয়ে ঘটনা তদন্ত করে।

আফগানিস্তানের আগের সরকারের সময় কাবুল সবসময় তালেবান ও ইসলামিক স্টেটের হামলার ঝুঁকির মধ্যে ছিল। এছাড়া, অপহরণ ও গাড়ি ছিনতাইয়ের ঘটনা ছিল সাধারণ বিষয়। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর অপরাধ দমনে কঠোর হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

রাজধানীতে নজরদারি ক্যামেরার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো  হয়েছে। একে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় তালেবানের প্রযুক্তির ব্যবহার করার চিত্র হিসেবে দেখানো হচ্ছে। আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর এক সাবেক মুখপাত্রের মতে, তালেবান ক্ষমতায় আসার আগে কাবুলে মাত্র ৮৫০টি ক্যামেরা ছিল।

তালেবান কর্তৃপক্ষ গত তিন বছরে কঠোর বিধিনিষেধ চালু করেছে। এতে মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতা, বিশেষ করে নারীদের স্বাধীনতা সীমিত হয়েছে। এখনো কোনো দেশই তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি।

কাবুলে নজরদারিতে যে সিসি ক্যামেরা ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে, তা অন্য অনেক দেশের তুলনায় আধুনিক। অধিকাংশ সিসি ক্যামেরার ফুটেজের স্কিনে থাকা মানুষের কোনো ডেটা বা তথ্য থাকে না। কিন্তু তালেবানের এই ব্যবস্থায় স্ক্রিনের কোণে প্রতিটি মুখের ছবি দেখা যায়। সেখানে ওই ব্যক্তিদের বয়স, লৈঙ্গিক পরিচয় ও দাড়ি বা মুখোশ রয়েছে কি না তার ভিত্তিতে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে। ক্যামেরাগুলো দিয়ে এক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত জুম করা যায়। 

তালেবান তাদের নিজেদের কর্মীদেরও নজরদারি করে। একটি তল্লাসি চৌকিতে যখন সেনারা একটি গাড়ির ট্রাঙ্ক খোলার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল, অপারেটররা তাদের ক্যামেরার লেন্স জুম করে ভেতরের সামগ্রী খতিয়ে দেখছিলেন।

আফগান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, ক্যামেরাগুলো ‘নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে, অপরাধের হার কমাতে এবং অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তারা জানায়, সিসিটিভি ও মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ চালুর ফলে ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অপরাধের হার ৩০ শতাংশ কমেছে। তবে এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো অবশ্য এই নজরদারি নিয়ে উদ্বিগ্ন। কে এবং কতদিন ধরে নজরদারি চলবে, এনিয়ে শঙ্কিত তারা।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, “জাতীয় নিরাপত্তার ছদ্মবেশে ক্যামেরা স্থাপন করা তালেবানের জন্য কঠোর নীতিগুলো অব্যাহত রাখার ভিত্তি তৈরি করছে। এই নীতিগুলো আফগানিস্তানের মানুষের মৌলিক অধিকার, বিশেষ করে জনসমক্ষে নারীদের অধিকার লঙ্ঘন করে।”

তালেবানের আইন অনুযায়ী, নারীদের ঘরের বাইরে কথা বলার অনুমতি নেই। যদিও বাস্তবে এটি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে না। কিশোরী মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে। 

নারীদের অনেক ধরনের কর্মসংস্থানে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। গত ডিসেম্বরে মিডওয়াইফ ও নার্স হিসেবে প্রশিক্ষণরত নারীরা বিবিসিকে জানিয়েছেন যে তাদের ক্লাসে ফিরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। নারীরা কাবুলের মতো শহরের রাস্তায় দৃশ্যমান থাকলেও, তাদের মুখ ঢাকতে হয়।

কাবুলের বাসিন্দা ফারিবা।

কাবুলে বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকেন তরুণ গ্রাজুয়েট ফারিবা। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে কাজ খুঁজতে পারছেন না। তিনি জানান, “নজরদারি ক্যামেরা নারীদের হিজাব পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে, এ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে।”

তালেবান বলেছে, শুধুমাত্র শহর পুলিশ সিসিটিভি ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে পারে। নৈতিকতা রক্ষাকারী পুলিশ এটি ব্যবহার করে না। তবে ফারিবা উদ্বিগ্ন যে ক্যামেরাগুলো তালেবান শাসনের বিরোধীদের আরও বিপন্ন করে তুলবে।

তিনি বলেন, “অনেক মানুষ, বিশেষ করে সাবেক সামরিক সদস্য, মানবাধিকারকর্মী এবং প্রতিবাদী নারীদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। তারা প্রায়ই গোপনে জীবনযাপন করেন।”

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জানায়, আফগানিস্তানে সংগ্রহ করা সিসিটিভি ফুটেজ কীভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা হবে তা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় তথ্য সুরক্ষা আইন নেই।

সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ কেবল তিন মাসের জন্য রাখা হয় বলে জানিয়েছে কাবুল পুলিশ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, ক্যামেরাগুলো গোপনীয়তা জন্য বিপদজনক নয়, কারণ এটি একটি বিশেষ ও সম্পূর্ণ গোপন কক্ষে নির্দিষ্ট ও পেশাদার ব্যক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়।

ক্যামেরাগুলো ও নিয়ন্ত্রণ রুমের ভেতরে থাকা নজরদারি যন্ত্রের গায়ে ‘দাহুয়া’ নামের একটি চীনা কোম্পানির নাম লেখা। তালেবান যে চীনের হুয়াওয়ে টেকনোলজির সঙ্গে ক্যামেরা কেনার আলোচনা করছে, সেই খবরটি কোম্পানিটি অস্বীকার করেছে। এনিয়ে তালেবান কর্মকর্তারা বিবিসির সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

পুরো এই সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবস্থাটি ও স্থাপন ব্যয়ের সিংহভাগই দিতে হয়েছে সাধারণ আফগানদের। অর্থাৎ তাদের টাকা দিয়েই কেনা হয়েছে তাদের ওপরই নজরদারি করার জন্য।

বিবিসির সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলছেন আফগান নারী শীলা।

কাবুলের বাসিন্দা শীলা জানান, প্রতিটি পরিবারের কাছ থেকে হাজার হাজার আফগানি দাবি করা হয়েছে। এটা বেশ বড় অঙ্ক। আফগানি নারীরা মাসে মাত্র ৫ হাজার আফগানি (প্রায় ৬৮ ডলার) উপার্জন করতে পারে।

বছরের পর বছর যুদ্ধের পর আফগানিস্তানে মানবিক পরিস্থিতি এখনও বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। দেশের অর্থনীতি সংকটে আছে। কিন্তু তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর আন্তর্জাতিক সহায়তার তহবিল প্রধানত বন্ধ হয়ে গেছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ মিলিয়ন আফগানের এখন সাহায্যের প্রয়োজন। এরমধ্যেই কোনো পরিবার যদি ক্যামেরা কেনার অর্থ দিতে না পারে, তখন তিন দিনের মধ্যে তাদের পানি ও বিদ্যুৎ কেটে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এজন্য অনেককে ঋণও নিতে হয়।

সাধারণ আফগানরা যেখানে ক্ষুধা নিয়ে ঘুমাতে যায়, সেখানে এই ক্যামেরা কী উপকারে আসবে, এই প্রশ্ন শীলার। অবশ্য তালেবান বলছে, কেউ ক্যামেরার অর্থ দিতে না চাইলে আনুষ্ঠানিকভাবে কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারেন। তালেবান কর্তৃপক্ষ এই অর্থকে দান হিসেবে দেখছে।

কাবুল পুলিশ মুখপাত্র খালিদ জাদরানের দাবি, নাগরিকদের কাছ থেকে কয়েকশ আফগানি করে নেওয়া হয়েছে, হাজার করে নয়।

নজরদারির বিষয়টি নিয়ে তালেবান কর্তৃপক্ষ যতই আশ্বস্ত করার চেষ্টা করুক না কেন, দেশটির ভেতর ও বাইরের মানবাধিকার কর্মীরা এই শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।

কাবুলের সবজি বিক্রেতা জাবের বলেন, “ক্যামেরাগুলো আফগানদের অসহায় বোধ করানোর আরেকটি উপায়। আমাদের সঙ্গে আবর্জনার মতো আচরণ করা হয়। জীবিকা উপার্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। কর্তৃপক্ষ আমাদের মূল্যহীন হিসেবে দেখে। আমরা কিছু করতে পারি না।”

আরও পড়ুন