প্রতিদিনই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মিডিয়ার শিরোনাম হচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আলাপের মধ্যেই আবার ফিরে এসেছে শুল্ক সংক্রান্ত ঘটনা। ট্রাম্প ১২ মার্চ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা সব স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। একে তার বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতিমালা পরিবর্তনের পক্ষে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের ফলে অন্যান্য দেশও প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ফলে শেয়ারবাজারে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। নাসডাক ১০০ ও এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর মতো প্রধান সূচকগুলোর মান কমেছে। পাশপাশি এই বাণিজ্য সংঘাত দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে।
এর আগে ট্রাম্প গত ৪ মার্চ কানাডা ও মেক্সিকো থেকে আসা পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। তবে তিনি কিছু পণ্যের জন্য সাময়িক ছাড় দেন। এছাড়া চীনের পণ্যের ওপর শুল্ক দ্বিগুণ করে ২০ শতাংশ নির্ধারণ করেন।
নতুন পরিকল্পনাটি ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের সময় চালু করা শুল্ক নীতির পরিবর্তন। তখন স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানির ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। কারণ আমেরিকান কোম্পানি ও শ্রমিক সংগঠনগুলো বিদেশি প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিল।

নতুন শুল্ক ঘোষণা
ট্রাম্পের নতুন পদক্ষেপ বিদ্যমান ধাতব শুল্ক নীতিকে আরও সম্প্রসারিত করেছে। আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা স্টিলের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক ছিল। তবে আগে যে কয়েকটি দেশ শুল্ক ছাড় পেত, তাদের সেই সুবিধা এখন বাতিল করা হয়েছে। অ্যালুমিনিয়ামের ক্ষেত্রে শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে।
এখন এই শুল্ক কেবল প্রক্রিয়াজাত ধাতব পণ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি বিভিন্ন পণ্যকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে। যেমন—গাড়ি, জানালার ফ্রেম এবং বহুতল ভবন নির্মাণের উপকরণ। ফলে এই শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে।
স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক কেন
প্রায় এক দশক আগে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের পতন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। চীনের উত্থানের কারণে উৎপাদন কমে যাওয়া ও কর্মসংস্থান হ্রাস পাওয়ায় এসব শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর, ট্রাম্প বিদেশি পণ্যের দাম বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক আরোপ করেন। তবে কানাডা, মেক্সিকো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ কয়েকটি দেশ তখন শুল্ক ছাড় পেয়েছিল। কিন্তু আজও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক শিল্প আমদানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে কঠিন সময় পার করছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বব্যাপী স্টিল ও অ্যালুমিনিয়াম বাণিজ্যে বিরোধ বেড়েছে। চীন থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য বাজারে আসায় এই সঙ্কট আরও তীব্র হয়েছে। ফলে ভিয়েতনাম, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ চীনা আমদানির বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নিয়েছে।

ধাতব শুল্কের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কারা
মরগান স্ট্যানলি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালুমিনিয়াম চাহিদার ৮০ শতাংশেরও বেশি এবং স্টিল চাহিদার প্রায় ১৭ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়।
কানাডা সম্ভবত শুল্কের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করবে। কারণ এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ধাতব সরবরাহকারী দেশ। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অ্যালুমিনিয়াম আমদানির ৫৮ শতাংশ কানাডা থেকে আসে। এরপর ৬ শতাংশ আসে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ৪ শতাংশ আসে চীন থেকে। স্টিলের ক্ষেত্রে, কানাডা আবার শীর্ষ সরবরাহকারী দেশ। এটি ২৩ শতাংশ সরবরাহ করে। এরপর ব্রাজিল ১৬ শতাংশ, মেক্সিকো ১২ শতাংশ ও দক্ষিণ কোরিয়া ১০ শতাংশ সরবরাহ করে।
এরপর কী
ট্রাম্পের প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদের অভিজ্ঞতা বলছে, আলোচনার সুযোগ থাকতে পারে। তার প্রথম মেয়াদে অনেক দেশ ও অঞ্চল ধাতব শুল্ক থেকে ছাড় পেয়েছিল। কিছু তেল কোম্পানিও বিশেষ পণ্যের প্রয়োজনীয়তার কারণে ছাড় পেয়েছিল।
তবে এবার ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের শুল্ক নিয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। অস্ট্রেলিয়া শেষ মুহূর্তে ছাড় পাওয়ার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়েছে। এতে দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ট্রাম্প কানাডার শুল্ক দ্বিগুণ করে ৫০ শতাংশ করার হুমকি দিলেও শেষ পর্যন্ত আগের পরিকল্পনায় ফিরে আসেন।
ট্রাম্প তামা আমদানির ওপরও শুল্ক আরোপ করতে চান। তবে এটি কার্যকর হতে অ্যালুমিনিয়াম ও স্টিলের শুল্কের তুলনায় কিছুটা বেশি সময় লাগবে।
লাভ-ক্ষতি
ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসন স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রকে এসব ধাতুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা। তবে ২০২৪ সালে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের স্টিল উৎপাদন ২০১৭ সালের তুলনায় ১ শতাংশ কমে গেছে। একই সময়ে অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন প্রায় ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
শ্রম ও জ্বালানির উচ্চ খরচ দীর্ঘমেয়াদে এই শিল্পগুলোর পতনের একটি বড় কারণ। কানাডা যুক্তরাষ্ট্রে অ্যালুমিনিয়াম সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ তাদের কারখানাগুলো তুলনামূলকভাবে সস্তা জলবিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে।

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, ট্রাম্পের ব্যাপক শুল্ক নীতি পরিবারগুলোর দৈনন্দিন ব্যয় যেমন খাবার ও জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে। অথচ এই চাপ নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়েই তিনি নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছিলেন।
তবে প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, এই শুল্ক তাদের বৃহত্তর অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ। এতে কর হ্রাস ও দেশীয় জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে খরচ কমাতে সাহায্য করবে।
কিন্তু সাম্প্রতিক শেয়ারবাজারের পতন ‘ট্রাম্পসেশন’ নামে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। ওয়াল স্ট্রিটের বিশেষজ্ঞরা, বিশেষ করে জেপি মর্গান চেজ ও আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটস, ২০২৫ সালের বাজার প্রবৃদ্ধি নিয়ে এখন আরও সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। কারণ ট্রাম্পের শুল্ক নীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতির প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
ইয়েল ইউনিভার্সিটির বাজেট ল্যাবের অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ট্রাম্পের শুল্ক নীতি এবং অন্যান্য দেশের পাল্টা প্রতিক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ কমিয়ে দেবে। আর এর অর্থ, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি স্থায়ীভাবে বছরে ৮০ থেকে ১১০ বিলিয়ন ডলার ছোট হয়ে যেতে পারে।
তথ্যসূত্র : ব্লুমবার্গ, ফাইনান্সিয়্যাল টাইমস।