যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ড যখন বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ শোর তুলেছেন, তখন ওই দেশেরই একজন সেনেটরকে দেখা গেল ঢাকায়।
গ্যারি পিটার্স নামে এই সেনেটর এক দিনের সফরে বাংলাদেশে এসে দেখা করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে, বৈঠক করেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের সঙ্গেও।
তুলসি গ্যাবার্ডের ভারত সফরের মধ্যে দেশীয় রাজনীতিতে তার বিপরীত শিবিরের লোক গ্যারি পিটার্সের বাংলাদেশ সফরটি বেশ কৌতূহল উদ্দীপক।
তুলসি যেখানে রিপাবলিকান দলের হয়ে কংগ্রেসে ছিলেন, সেখানে গ্যারি পিটার্স ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা। ডেমোক্রেটিক পার্টির সঙ্গে বিশেষ করে ক্লিনটন পরিবারের সঙ্গে নোবেলজয়ী ইউনূসের ঘনিষ্ঠতা সর্বজনবিদিত।
তার ঢাকায় যাওয়া আরও কৌতূহলের এ কারণে যে তার এই সফর ব্যক্তিগত, না কি আনুষ্ঠানিক তার কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।
ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের ওয়েবসাইট কিংবা তাদের সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডলগুলোতে গ্যারি পিটার্সের সফরের কোনো খবর নেই। এই সেনেটরের নিজের ওয়েবসাইট ও ফেইসবুক-এক্স হ্যান্ডলেও তার বাংলাদেশ সফরের কোনো খবর দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে গ্যারি পিটার্সের এক দিনের সফরে মঙ্গলবার ঢাকায় আসার সংবাদ এসেছে সোমবার। সেই সব প্রতিবেদনে তার পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকসূচি থাকার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে, তবে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাতের সূচিটি ছিল না।
প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়, গ্যারি পিটার্স এক দিনের এই সফরে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন সরকারি সফরে বর্তমানে গ্যারি পিটার্সের দেশ যুক্তরাষ্ট্রেই রয়েছেন। জাতিসংঘে এক কর্মসূচিতে যোগ দিতে গত শনিবার তিনি ঢাকা ছাড়েন। আগামী ২১ মার্চ তিনি ফিরবেন বলে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে।
ঢাকার কয়েকটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকে গ্যারি পিটার্স যুক্তরাষ্ট্রের সমরাস্ত্র কেনার তদ্বির করতে পারেন, আলোচনা হতে পারে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়েও।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভার উচ্চ কক্ষের সদস্য গ্যারি পিটার্স সেনেটের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি অ্যান্ড গভার্নেন্স অ্যাফেয়ার্স কমিটি এবং আর্মড সার্ভিস কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন।
তবে গ্যারি পিটার্সের এই সফরের বিষয়ে আইএসপিআরের কাছ থেকেও কোনো বিবৃতি কিংবা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাওয়া যায়নি। তাদের ওয়েবসাইটেও পিটার্সকে নিয়ে কোনো খবর নেই।
ফলে গ্যারি পিটার্সের এই সফর কার আমন্ত্রণে, তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ড ভারতে গেছেন বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের এক সম্মেলন এবং রাইসিনা সংলাপে যোগ দিতে।
ভারত সফরে তুলসি গত রোববার এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বাংলাদেশে গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার উৎখাত হওয়ার পর হিন্দুসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ঘটনায় ট্রাম্প প্রশাসনের বেশ উদ্বেগ রয়েছে।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ইসলামী খিলাফত কায়েমের লক্ষ্য নিয়ে যারা চলছে, তাদের দমন করা ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে।
তার ওই বক্তব্য প্রকাশের পরপরই প্রতিক্রিয়া আসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে। তাতে বলা হয়, গ্যাবার্ডের মন্তব্য সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণের ভিত্তিতে করা হয়নি। এতে বাংলাদেশকে অযৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
রিপাবলিকান নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প গত জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট পদে ফেরার পর তুলসি গ্যাবার্ডকে এই পদে নিয়োগ দেন।
এই ধরনের স্পর্শকাতর কোনো বিষয়ে মন্তব্যের আগে তুলসি গ্যাবার্ডের মতো দায়িত্বশীলদের আরও খোঁজ-খবর নেওয়া উচিৎ ছিল বলেও মন্তব্য করা হয় বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতিতে।

তার একদিন বাদেই মঙ্গলবার ঢাকায় আসা গ্যারি পিটার্সের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতিন নিয়ে ‘অপপ্রচারের’ বিষয়টি তোলেন ইউনূস ও তৌহিদ।
বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্যারি পিটার্স রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তখন তিনি বাংলাদেশ নিয়ে ভুল তথ্য বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে বলে প্রধান উপদেষ্টাকে জানান।
সেনেটর পিটার্স বলেন, তার রাজ্য মিশিগানে, বিশেষত ডেট্রয়ট শহরে, অনেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষ বসবাস করেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা নিয়ে প্রচুর ভুল তথ্য ছড়িয়েছে। এই ভুল তথ্যের কিছু অংশ যুক্তরাষ্ট্রেও পৌঁছেছে, যা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
তখন ইউনূস বলেন, গত বছরের আগস্টে ক্ষমতার পালাবদলের পর সংখ্যালঘুদের, বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর যে হামলা হয়েছিল, তা ধর্মীয় কারণে নয়, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। তবে তার সরকার দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীদের পরিস্থিতি সরেজমিন দেখতে বাংলাদেশ সফরে আসার আমন্ত্রণ জানান।
তিনি বলেন, “এখানে ভ্রমনের মাধ্যমে তারা ধর্মীয় সম্প্রীতি সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য জানতে পারবেন। আমরা আপনাদের সাহায্য চাই। দয়া করে আপনার বন্ধুদের বলুন বাংলাদেশ ভ্রমণ করতে। তাহলে আমরা এই ভুল তথ্য প্রচারের বিরুদ্ধে লড়তে পারব।”
৬৬ বছর বয়সী সাবেক সেনা কর্মকর্তা গ্যারি পিটার্স ২০১৫ সাল থেকে মিশিগান থেকে সেনেটর নির্বাচিত হয়ে আসছেন। তার আগে ওই রাজ্য থেকে প্রতিনিধি পরিষদেনর সদস্য ছিলেন তিনি। সর্বশেষ নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি জানিয়েছেন, আর ভোট করবেন না তিনি।
ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর গণহারে সরকারি কর্মী ছাঁটাইয়ের যে পদক্ষেপ নিয়েছেন, তার বিরোধিতা করে আলোচনায় রয়েছেন গ্যারি পিটার্স। ২০১৭ সালে ইসরায়েল কিংবা ইসরায়েলি পণ্য বয়কটের ্আহ্বান জানানোকে অপরাধ হিসাবে গ্রহণ করতে যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণয়নের উদ্যোক্তাদের একজন ছিলেন তিনি।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনও বাংলাদেশ নিয়ে বহির্বিশ্বে অপপ্রচার ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনেটর গ্যারি পিটার্সের সহযোগিতা চেয়েছেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার শাসনকালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বেশ নাজুক হয়ে পড়েছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতায় ছিল পিটার্সের দল ডেমোক্রেটিক পার্টি, প্রেসিডেন্ট ছিলেন জো বাইডেন।
যুক্তরাষ্ট্র তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে চাইছে বলে দুই বছর আগেই অভিযোগ করেছিলেন শেখ হাসিনা। ছাত্র-জনতার যে অভ্যুত্থানে গত বছরের আগস্টে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন, তার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রশাসনের ষড়যন্ত্র ছিল বলে আওয়ামী লীগ নেতারা বিশ্বাস করেন।
বাংলাদেশে অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পালাবদলের তিন মাস পরেই যুক্তরাষ্ট্রে ভোটে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। তাতে প্রেসিডেন্ট পদে ফিরে আসেন ট্রাম্প।
সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতায় পরিবর্তন হলেও বৈদেশিক নীতি খুব একটা বদলায় না। তবে ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসের মধ্যে সেই ধারণা উল্টে দিয়েছেন। বাংলাদেশ নিয়ে তার প্রশাসনের নীতিও বাইডেন আমলের নীতি থেকে আলাদা হবে বলেই ধারণা করা হচ্ছিল, তুলসি গ্যাবার্ডের কথায় তার ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে।
তাহলে বাংলাদেশে ডেমোক্রেটঘনিষ্ঠ ইউনূসের সরকারের কাজ চালানো কঠিন হবে বলে মনে করছে ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগের নেতারা।