মুহাম্মদ ইউনূস যখন শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর কথা তুললেন, তখন কী বলেছিলেন নরেন্দ্র মোদী? কিংবা মোদী যখন রাজনৈতিক বোলচাল বন্ধ করতে বলেছিলেন, তখন কী উত্তর ছিল ইউনূসের?
শুক্রবার ব্যাংককে তাদের ৪০ মিনিটের বৈঠকে বিষয় দুটি এসেছে, এমনটা জানা গেলেও এই দুটি বিষয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল, তা অজানাই থেকে গেছে।
আলোচিত এই বৈঠকের পর দুই পক্ষের প্রেস ব্রিফিং, বিবৃতি কিংবা সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট এলেও এক পক্ষের বক্তব্যের সঙ্গে অন্য পক্ষের বক্তব্য ঠিক পুরোপুরি মিলছে না। কেমন যেন একটা ছন্দ পতন।
প্রতিবেশী এই দুই দেশের সম্পর্কে ছন্দ পতনের শুরুটা গত বছরের আগস্টে, বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেথ হাসিনার দেড় দশকের শাসন অবসানের পর থেকে।
তার আগে আওয়ামী লীগের শাসনকালে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল অতি নিবিড়। তবে ভারতমুখী এই পররাষ্ট্র নীতিকে ‘দিল্লির দাসত্ব’ বলে সমালোচনা করত হাসিনাবিরোধীরা।
অভ্যুত্থানের পালাবদলের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নাজুেক থেকে নাজুকতর হয়েছে। বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন নিয়ে সরব ছিল ভারত সরকার। এমন এক বিক্ষোভ থেকে ত্রিপুরায় বাংলাদেশের দূতালয়ও হয় আক্রান্ত।
অন্যদিকে ভারতবিরোধী কথা-বার্তা আসতে থাকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের কাছ থেকে। একজন উপদেষ্টা তো ভারতের কিছু অংশ নিয়ে বাংলাদেশের নতুন মানচিত্রও সোশাল মিডিয়ায় প্রকাশ করে দেন।
দিল্লি যখন দূরে সরে যায়, তখন অন্তর্বর্তী সরকার কাছে টেনে নেয় ভারতের বৈরী প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানকে। প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস দুই বার বৈঠক করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে, যান চীন সফরে। এই দুটি বিষয়ই আবার ভারত দেখে সন্দেহের দৃষ্টিতে।
মোদীর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় রীতি মাফিক চিঠি আদান-প্রদান চললেও তার দেখা পাচ্ছিলেন না ইউনূস। শেষে থাইল্যান্ডে বিমসটেক সম্মেলনে মোদীর সঙ্গে ইউনূসের একটি বৈঠক আয়োজনের তোড়জোড় শুরু হয় ঢাকার পক্ষ থেকে।
ঢাকা থেকে অনুরোধ পেলেও দিল্লি থেকে বৈঠকের বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য মিলছিল না; ফলে বৈঠকটি হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় ছিল অনেকের মনে। তবে সম্মেলনের ফাঁকে ব্যাংককের সাংরি লা হোটেলে শুক্রবার বৈঠকটি হওয়ার পর সব সংশয়ের অবসান ঘটেছে।
বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম সাংিবাদিকদের জানান যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি উঠেছিল।
অভ্যুত্থানের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট সামরিক বাহিনীর একটি বিমানে চড়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তাকে ভারত সরকার বিশেষ নিরাপত্তা দিয়ে দিল্লিতে রেখেছে।
শেখ হাসিনাকে ফেরত এনে জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার হত্যাকাণ্ডগুলোর জন্য বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সরকার চিঠি দিয়েছিল দিল্লিতে। কিন্তু দিল্লি থেকে এখনও সেই চিঠির জবাব আসেনি।
বাংলাদেশের সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের অবস্থান জানতে চান প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস।
শেখ হাসিনা যে ভারতে বসে দলের বিভিন্ন সভায় অংশ নিয়ে, বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে নিয়ে বিষোদগার করছেন, তাতে ভারতের আতিথেয়তার অপব্যবহার হচ্ছে বলেও মোদীকে জানান ইউনূস।
কিন্তু মোদী কী বলেছেন? বাসস পরিবেশিত খবরে শুধু বলা হয়েছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে দায়ী করেছেন।
এই বৈঠক নিয়ে বাসসের প্রতিবেদনটিই ইউনূস তার ফেইসবুক পাতায় এবং প্রধান উপদেষ্টার ফেইসবুক পাতায় তুেল দিয়েছেন। ফলে সেখানেও এই কথাই আছে।
শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানো হবে কি হবে না, মোদী এনিয়ে কী বলেছেন, তা বাংলাদেশ সরকারের তরফে কিছু জানানো হয়নি।
অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী তার ফেইসবুক পাতায় এই বৈঠক নিয়ে যে পোস্ট দিয়েছেন, সেখানে শেখ হাসিনাকে নিয়ে আলোচনার কোনো প্রসঙ্গই নেই।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বৈঠকের আলোচনা নিয়ে যে বিবৃতি দিয়েছে, সেখানে ছয়টি বিষয়ে আলোচনার কথা উল্লেখ আছে, কিন্তু শেখ হাসিনার কোনো প্রসঙ্গই নেই।
আবার সম্প্রতি চীন সফরে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য বা ‘সেভেন সিস্টার্স’ এবং বঙ্গোপসাগর নিয়ে ইউনূসের যে বক্তব্য নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনা চলছে, সেকথা বৈঠকে তোলার কথা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে থাকলেও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এনিয়ে চুপ।
চীনে সাম্প্রতিক সফরে গত ২৮ জুন সে দেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এক সংলাপে ইউনূস বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থানের গুরুত্ব বোঝােতে গিয়ে বলেছিলেন, “নেপাল ও ভুটান স্থলবেষ্টিত দেশ, যাদের কোনো সমুদ্র নেই। ভারতের সাতটি উত্তর-পূর্ব রাজ্যও স্থলবেষ্টিত।” একই বক্তৃতায় বাংলাদেশকে বঙ্গোপসাগরের অভিভাবকও বলেছিলেন তিনি।
একে তো কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েন, তার মধ্যে স্পর্শকাতর ‘চিকেন নেক’ নিয়ে কথা বলা; তাও আবার বৈরী দেশ চীনে বসে! ভারতের রাজনীতিকদের মধ্য থেকে আসে তীব্র প্রতিক্রিয়া। বঙ্গোপসাগর নিয়ে কথার প্রতিক্রিয়া আসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের কাছ থেকেও। তিনি শুক্রবার ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকের সময়ও মোদীর সঙ্গে ছিলেন।
বৈঠক শেষে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিস্ত্রি সাংবাদিকদের বলেন, ইউনূসের সঙ্গে আলোচনায় মোদী রাজনৈতিক বোলচাল বন্ধ করতে বলেছেন, কেননা এতে পরিবেশ নষ্ট হয়।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিবৃতিতেও একই কথা রয়েছে। তবে মোদীর এই কথায় ইউনূস কি কিছু বলেছেন, সেই বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে কোনও আওয়াজ নেই। এডিদকে হাসিনার প্রসঙ্গটি যেমন ভারত চেপে গেছে, তেমনি এই প্রসঙ্গটি বাংলাদেশও চেপে গেছে।

বৈঠক নিয়ে মোদী ফেইবুক পোস্টে লিখেছেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক হলো। বাংলাদেশের সঙ্গে গঠনমূলক ও জনগণ-কেন্দ্রিক সম্পর্ক রক্ষায় ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তিনি আরও লিখেছেন, শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রতি ভারতের সমর্থন থাকবে। আলোচনা হয়েছে সীমান্তে অবৈধ পারাপার বন্ধের পদক্ষেপ নিয়ে এবং ভীষণ উদ্বেগ জানিয়েছি বাংলাদেশের হিন্দুসহ সংখ্যালঘু অন্যদের সুরক্ষা নিয়ে।
সোশাল মিডিয়ায় সরব মোদীর ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকের পোস্টটি অত্যন্ত সাদামাটা। অথচ শুক্রবার ব্যাংককেই নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলির সঙ্গে বৈঠকের পর ফেইসবুক পোস্টে ‘গঠনমূলক’ আলোচনা হওয়ার কথা বলেন মোদী। ভুটানের প্রেসিডেন্ট শেরিং তোপগের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে লিখেছেন, চমৎকার আলোচনা হয়েছে। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রাকে তো প্রশংসায় ভাসিয়েছেন।
মোদী-ইউনূস বৈঠক নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফেইসবুক পাতায় যে পোস্ট দেওয়া হয়েছে, সেখানে বিসমটেকের পরবর্তী চেয়ারম্যান হিসাবে বাংলাদেশের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সমর্থন দেওয়ার কথা বলা হয়।
ওই পোস্টেই বলা হয়, মোদী হিন্দু নির্যাতন নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি বাংলাদেশে ধর্মীয় চরমপন্থিদের বাড়-বাড়ন্ত ঠেকাতে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন, কারণ এটা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি। তিনি সেই সঙ্গে বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক চায় ভারত, আর তা হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে প্রথম পয়েন্টে বৈঠকের কথা জানিয়ে দ্বিতীয় পয়েন্টে স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তৃতীয় পয়েন্টে বলা হয়েছে, বোলচাল বন্ধ এবং সীমান্ত কড়াকড়ির কথা। চতুর্থ পয়েন্টে বলা হয়েছে হিন্দু নির্যাতন নিয়ে উদ্বেগের কথা (তবে এখানে উগ্রবাদ নিয়ে কিছু বলা হয়নি)। চতুর্থ পয়েন্টে বলা হয়েছে, বিমসটেকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ায় বাংলাদেশকে অভিনন্দনের কথা। পঞ্চম পয়েন্টে বলা হয়েছে, মোদী আশা রেখেছেন, যে কোনো বিষয়ে সমস্যার সমাধান উভয় পক্ষ দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমেই করবে।
এদিকে মোদী কোনো বিশেষায়ন না করলেও বাংলাদেশের তরফে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল বলেছেন, “বৈঠকটি অত্যন্ত গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ হয়েছে। আমাদের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে।
“শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং ভারতে বসে তিনি উস্কানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন, এসব বিষয় বৈঠকে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া সীমান্তে হত্যা, তিস্তা নদীর পানি বণ্টনসহ পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।”
ঝুলে থাকা তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির নিয়ে আলোচনার কথা বাংলাদেশের তরফে জানানো হলেও ভারত এবিষয়ে নিশ্চুপ।
মোদীর পক্ষ থেকে জনগণ-কেন্দ্রিক সম্পর্কের কথা বলা হলেও বাংলাদেশের তরফে বলা হয়েছে, মোদী বলেছেন যে ভারত বাংলাদেশের কোনো দলকে সমর্থন করে না, সম্পর্ক জনগণের সঙ্গে।
বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে কী জবাব পাওয়া গেছে, সে বিষয়ে ভারতের কোনো কথা নেই। এদিকে বাসস জানিয়েছে, ইউনূস মোদীকে বলেছেন যে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, তা অনেকটাই অতিরঞ্জিত এবং এর বেশিরভাগই ‘ভুয়া খবর’।
যেসব হামলার অভিযোগ এসেছে, তা স্বচক্ষে যাচাই করার জন্য তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে সাংবাদিক পাঠানোর অনুরোধও করেন বলে বাসস জানিয়েছে।
সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি ইউনূস উত্থাপন করেন বলে বাসস জানিয়েছে। কিন্তু এবিষয়ে ভারতের বিবৃতিতে কোনো কথা নেই। বরং বলা হয়েছে অবৈধ পারাপার বন্ধ করতে, যে কথা ভারত বরাবরই বলে থাকে।
বাসস জানায়, মোদী বলেছেন যে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা শুধু আত্মরক্ষার জন্য গুলি চালায় এবং মৃত্যুর ঘটনাগুলো ভারতের ভেতরেই ঘটে।
এ সম্পর্কিত আরও খবর:
‘পরিবেশের ক্ষতি করে’ এমন বক্তব্য এড়িয়ে চলতে ইউনূসকে মোদীর পরামর্শ
ইউনূস-মোদীর প্রথম বৈঠক, শেখ হাসিনার প্রত্যার্পন নিয়ে আলোচনা
দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার: প্রধান উপদেষ্টা