ত্রয়োদশ সংসদের যাত্রা শুরু হলো যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছে বৃহস্পতিবার।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছে বৃহস্পতিবার।

২০১৬ সালের মে মাস, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারের পর জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড যখন কার্যকর হয়েছিল, তখন পাকিস্তানের পার্লামেন্টে পাস হয়েছিল শোক ও নিন্দা প্রস্তাব। পাকিস্তানের বন্ধু নিজামীর ফাঁসিতে ক্ষুব্ধ ছিলেন দেশটির আইনপ্রণেতারা। আওয়ামী লীগ সরকার তখন তার তীব্র প্রতিক্রিয়াও জানিয়েছিল।

১০ বছর পর খোদ বাংলাদেশের আইনসভা সংসদেই সেই নিজামীর জন্য শোক প্রস্তাব উঠল এবং তা পাসও হলো। শুধু নিজামীই নয়, ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে বৃহস্পতিবার যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত জামায়াতের নেতাদের এবং একই অপরাধে ফাঁসিতে ঝোলা বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জন্যও শোক প্রকাশ করা হলো।

যে রাষ্ট্র একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার করে তাদের সাজা দিয়েছিল, সেই তাদের জন্য রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ আইনসভায় শোক প্রস্তাব গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার একটি উপলক্ষ হবে। কারণ পরবর্তী প্রজন্মের কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে, তাহলে কোনটি ঠিক ছিল? তাদের বিচার কি তাহলে ঠিক ছিল না? রাষ্ট্রের এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন জটিলতা হিসেবে দেখা দেবে।

একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর হয়ে বাঙালি নিধনের জন্য জামায়াতের বিচারের দাবি স্বাধীনতার পর থেকেই ছিল। তবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গিয়ে সেই বিচারের উদ্যোগ নেয়। তারপর একে একে ফাঁসিতে ঝোলেন জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লা, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, মীর কাসেম আলী, বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। দণ্ড নিয়ে বন্দি অবস্থায় মারা যান গোলাম আযম ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী।

সংসদে শোক প্রস্তাব উত্থাপনের পর তা গ্রহণ করে নীরবতা পালন করা হয়।

২০২২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের রাজনীতির মঞ্চে জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান ঘটে। গত মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলেও প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসে জামায়াত। আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনো সুযোগই রাখা হয়নি।

বৃহস্পতিবার সেই সংসদেরই প্রথম অধিবেশন শুরু হয় নানা নাটকীয়তার মধ্যদিয়ে। স্পিকারের শূন্য চেয়ার নিয়ে অধিবেশন শুরুর পর তা পরিচালনার ভার চাপে বিএনপির প্রবীণ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ওপর। তার নাম প্রস্তাব করেন নতুন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

এরপর স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন যথাক্রমে বিএনপির হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও কায়সার কামাল। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছ থেকে শপথ নিয়ে আসার পর হািফজ উদ্দিন স্পিকারের চেয়ারে বসে অধিবেশন পরিচালনা শুরু করেন।

রেওয়াজ অনুযায়ী শুরুতেই শোক প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। খালেদা জিয়াসহ দেশি-বিদেশি বিশিষ্টজন, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নিহত এবং মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে শোকপ্রস্তাব আনা হয়।

ত্রয়োদশ সংসদের স্পিকার হিসেবে শপথ নেন বিএনপি নেতা হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

এরপর চিফ হুইপ, বিএনপির সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম মনি আরও কয়েকটি নাম যুক্ত করার অনুরোধ জানান। তাতে সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নাম আসে।

এরপর বিরোধীদলীয় নেতা, জাময়াতের আমির শফিকুর রহমান দাঁড়িয়ে বলেন, শোকপ্রস্তাবে কিছু নাম বাদ পড়েছে। বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এরপর সেই নাম পড়ে শোনান। তার মধ্যে জামায়াতের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সোবহান (যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত), শেখ আনছার আলী, রিয়াসাত আলী, আবদুল খালেক মণ্ডলের নামও আসে।

স্পিকারের চেয়ারে থাকা বীরবিক্রম খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ উদ্দিন তখন এই সব নাম অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধী সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ কয়েকজনের নাম শোকপ্রস্তাবে যুক্ত করেন। এরপর জুলাই আন্দোলনে নিহতসহ আরও কিছু নাম যুক্ত হয়ে শোক প্রস্তাবটি পাস হয়। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এক মিনিট নীরবতা পালন করে সংসদ।

শোক প্রস্তাবের উপর যারা আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন জামায়াত নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলাম। যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ছিলেন তিনিও। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার বিচারের রায় উল্টে যায়, তাতে তিনি ছাড়া পেয়ে যান।

আওয়ামী লীগবিহীন এই সংসদে যুদ্ধাপরাধী নিজামী, সাঈদী, মীর কাসেম আলীর ছেলেরাও সংসদ সদস্য হিসেবে রয়েছেন। তাদের পাশাপাশি বিএনপির সংসদ সদস্য হিসেবে রয়েছেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী।

রাষ্ট্রপতির অদ্ভুত ভাষণ

রেওয়াজ অনুযায়ী, সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। তবে তার এই ভাষণটি অদ্ভুত হিসেবেই দেখছে সবাই। কারণ এই ভাষণে তাকে আওয়ামী লীগকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলতে হয়েছে, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে বলতে হয়েছে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’। ভাষণ তিনি শেষ করেছেন ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে।

আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগও করেন। বিচারকের চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর তাকে দুদকের কমিশনার বানানো হয়েছিল। পরে ২০২৩ সালে তিনি রাষ্ট্রপতি হন।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেন।

আওয়ামী লীগ আমলে তিনি ‘জয় বাংলা’ বলেই ভাষণ দিতেন, স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করতেন জাতির পিতা হিসেবে। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানের পর মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে তাকে কোণঠাসা করে রেখেছিল। ভাষণ দেওয়ার সুযোগই তাকে দেওয়া হয়নি।

নির্বাচনে জিতে বিএনপির নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পর গত ৬ মার্চ প্রথম কোনো সরকারি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। জাতীয় পাট দিবসের সেই অনুষ্ঠানেও তিনি ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলেছিলেন। এরপর সংসদেও তাই দিলেন।

রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে বলেন, “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই উদ্বোধনী অধিবেশন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। হাজারো শহীদের রক্তের সিঁড়ি বেয়ে দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর একটি শান্তিপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে এই মহান জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে।”

মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণ করে তিনি বলেন, “স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম, স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সকল নেতার অবদানকেও আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। বাংলাদেশে তিনবারের নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক চেয়ারপার্সন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি, যিনি দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে প্রতিবার সামনের কাতারে থেকে আপসহীন নেতৃত্ব দিয়েছেন।”

জুলাই অভ্যুত্থানে হতাহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, “আমি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের এবং দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুম, খুন, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক দলের সদস্যবৃন্দকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি, যাদের অসামান্য ত্যাগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়ে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে।”

বিএনপির প্রশস্তি গেয়ে তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে ২০০১ সালের জুন মাসে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছিল। ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের দায়িত্ব নিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার দুর্নীতি দমনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।”

রাষ্ট্রপতি কি এই ভাষণ নিজের ইচ্ছায় দিয়েছেন? এই প্রশ্নের উত্তর আসবে, এই ভাষণ মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়ে আসতে হয়। ফলে নিজের দর্শন ও অবস্থান তুলে ধরার খুব বেশি স্বাধীনতা কার্যত রাষ্ট্রপতির থাকে না।

বিরোধীদের ওয়াকআউট

বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে যখন ভাষণ দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সংসদের অধিবেশন কক্ষে প্রবেশের ঘোষণা দেওয়া হল, বিরোধী দলের আসনে থাকা জামায়াত জোটের সংসদ সদস্যরা আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন। এ সময় তারা ‘জুলাইয়ের সাথে গাদ্দারি চলবে না’ লেখা লাল রঙের প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন।

সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রবেশ করলে প্রচলিত রীতিতে সংসদ নেতা ও সরকারি দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানান। তবে বিরোধী দলের সদস্যদের একটি অংশ প্রতিবাদের অংশ হিসেবে নিজেদের আসনে বসে থাকেন।

বিউগলে জাতীয় সংগীত বাজতে শুরু করলে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সংসদের কর্মকর্তারা জাতীয় সংগীতের প্রতি সম্মান জানিয়ে সদস্যদের দাঁড়ানোর অনুরোধ করেন। তখন কেউ কেউ দাঁড়ালেও কয়েকজন সদস্য বসে ছিলেন।

ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে বুধবার রাষ্ট্রপতির ভাষণ ওয়াকআউট করেন জামায়াত জোট থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। 

এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি সংসদে তার ভাষণ শুরু করলে বিরোধী দলের সদস্যরা হট্টগোল করতে থাকেন। একপর্যায়ে তারা স্লোগান দিতে দিতে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।

পরে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এরপর অধিবেশন মুলতবি হয়।

আরও পড়ুন:

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads