দালাল ধরে আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলের কোনো দেশ কিংবা ইউরোপের বলকান অঞ্চলে পৌঁছা, তারপর সেখান থেকে ইতালি, গ্রিস, ফ্রান্স বা জার্মানির মতো দেশে অবৈধভাবে পাড়ি দেওয়া। বাংলাদেশের যারা এভাবে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তারা একে বলেন ‘গেম’।
এর শাব্দিক অর্থ খেলা, কিন্তু এই খেলা আসলে এক ধরনের মরণ খেলা। কারণ জল কিংবা স্থল, দুস্তর এক পথ পাড়ি দিতে হয় এই খেলায়। এই গেমে সবাই জেতেন না। কারো কারো সাগরেই সলিল সমাধি হয়। আবার কাঙ্ক্ষিত দেশে পৌঁছনোর পর গ্রেপ্তার হয়ে কারো ভাগ্যে জোটে জেলের ভাত। তবু ইউরোপের স্বপ্নে এই গেম চলছেই।
এমনই এক গেমে গত ২১ মার্চ লিবিয়ার বন্দর শহর তোবরুক থেকে ভূমধ্যসাগরে নৌকা ভাসিয়েছিল ৪৮ জন। কিন্তু যাত্রার পর গভীর সাগরে দিক হারিয়ে ফেলেন তারা। খাবার ও পানি ছাড়া সাগরে ভাসতে ভাসতে ২২ জন মারাই যান। এদের ১৮ জনই বাংলাদেশের, তার ১২ জনই সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। তাদের গেম সমাপ্ত হয়েছে অতল সাগরে।
এদের একজন শায়েক আহমদ (২৩)। তার মৃত্যুর খবর শুনে বাড়ির উঠানে গড়াগড়ি করছিলেন বাবা আখলুছ মিয়া। আর আহাজারি করে বলছিলেন, “আমার পুয়া বিদেশ যাইবার লাগি পাগল আছিল। গেমে খানি নাই, পানি নাই। পুয়াটা ‘পানি পানি’ কইরা মরছে।”
নৌকাটি থেকে গত শুক্রবার যে ২৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছে গ্রিসের উপকূলরক্ষী বাহিনী, তার ২১ জনই বাংলাদেশি। তাদের কাছেই শোনা গেল, খাবার আর পানির অভাবে কীভাবে তাদের ২২ সহযাত্রীর মৃত্যু হয়েছে, কীভাবে তাদের লাশ সাগরে ফেলে দেয়া হয়েছে।
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের আবদুল কাহারের ছেলে রোহান আহমদ (২৫) এই গেমে ছিলেন। তবে তাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। রোহান ফোনে তার স্বজনদের জানিয়েছেন, গেমে খাবার ও পানির সঙ্কটে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে একে একে মারা যান। তখন তাঁদের লাশ সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।
রোহানসহ ২৬ জনের গেমও শেষ হয়েছে, তবে তাদের আশা পূরণ হয়নি। এখন গ্রিসে দৃশ্যত আটক রয়েছেন তারা। গ্রিক উপকূল রক্ষী বাহিনী জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া ২৬ জনের মধ্যে একজন নারী, একটি শিশু রয়েছে। এদের ২১ জন বাংলাদেশের, চারজন দক্ষিণ সুদানের এবং একজন শাদের নাগরিক।
এই গেমে নামার প্রস্তুতিটা্ও কম ঝক্কির নয়। দালালদের হাতে মোটা অঙ্কের টাকা তুলে দেওয়ার পরই এই গেমে নামা যায়। যেমনটা নেমেছিলেন আখলুছ মিয়ার ছেলে শায়েক।
আখলুছ মিয়া বলেন, শায়েক আরও কয়েকজনের সঙ্গে এলাকার দালাল আজিজুল ইসলামের মাধ্যমে গ্রিসে যেতে চার মাস আগে বাড়ি ছাড়েন। এজন্য প্রথমে দালালকে সাড়ে চার লাখ টাকা দিতে হয়। এরপর সৌদি আরব, কুয়েতসহ আরও কয়েক দেশ ঘুরে লিবিয়া পৌঁছান শায়েক।
লিবিয়া থেকে দালাল আজিজুল জানান, এখন গ্রিসের গেমে শায়েককে তোলার আগে আরও সাড়ে ৭ লাখ টাকা দিতে হবে। আখলুছ মিয়া তখন জমি, গরু বিক্রি করে সেই টাকা পাঠান। কিন্তু প্রথম দিন শায়েক নৌকায় উঠতে গিয়ে পায়ে আঘাত পান, তাই রওনা হতে পারেননি। এরপর ২১ মার্চ তার গেম শুরু হয়।

শায়েকের গ্রামের আরেক যুবক সোহেল আহমদ ওই নৌকায় ছিলেন। উদ্ধার হওয়ার পর তিনি দেশে তার স্বজনদের জানান, নৌকায় এক দিন পরই খাবার ও বিশুদ্ধ পানি শেষ হয়ে যায়। ২৪ ঘণ্টার খাবার দিয়ে এসব নৌকা ছাড়া হয়। কিন্তু নৌকাটি পথ হারানোতে খাদ্যসংকটে পড়ে সবাই।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার স্থানীয় সাংবাদিকদের জানান, ভূমধ্যসাগরে যে ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে, তার মধ্যে ১২ জন সুনামগঞ্জের বলে তারা নিশ্চিত হয়েছেন। এর মধ্যে দিরাই উপজেলার ছয়জন, জগন্নাথপুর উপজেলার পাঁচজন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার একজন।
মৃতরা হলেন দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের আবু সরদারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), আবদুল গণির ছেলে সাজিদুর রহমান (২৮), ইসলাম উদ্দিনের ছেলে সাহান এহিয়া (২৫) ও একই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের আবদুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৮), করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের তায়েক মিয়া ও বাসুরি গ্রামের সোহাস; দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে আবু ফাহিম; জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া গ্রামের সোহানুর রহমান, টিয়ারগাঁও গ্রামের শায়েক আহমেদ, চিলাউড়া কবিরপুর গ্রামের মো. নাঈম, পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান, ইছগাঁও গ্রামের মোহাম্মদ আলী।
মারা যাওয়া সাহান এহিয়ার বড় ভাই মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, প্রত্যেকেই ১২ লাখ টাকায় গ্রিসে যাওয়ার জন্য দালালের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন। গত মাসে তাঁরা বাড়ি থেকে রওনা দেন। লিবিয়া যাওয়ার পর অর্ধেক টাকা পরিশোধ করা হয়।
সুনামগঞ্জের মারা যাওয়া ব্যক্তিদের পরিবারে এখন চলছে মাতম। এ ঘটনায় দালালদের বিচার চাইছেন অনেকে। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেছেন, যেসব দালালের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা করবে জেলা প্রশাসন।
নৌকাটি থেকে জীবিত উদ্ধার দুজনকে মানবপাচারকারী সন্দেহে গ্রিক কর্তৃপক্ষ আটক করেছে। তারা দক্ষিণ সুদানের নাগরিক। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্যে দেখা যাচ্ছে, লিবিয়া থেকে নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টাকারীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যাই বেশি।
লিবিয়া থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করে ধরা পড়ে গ্রেপ্তার হয়ে নানা সময় দেশে ফিরেছেন এমন অনেক বাংলাদেশিও রয়েছেন।
তারা বলেছেন, ইতালি বা ইউরোপে যাবার স্বপ্নে তারা এভাবে সাগর পাড়ি দিয়েছিলেন। কারণ তারা ভেবেছিলেন, ইউরোপে গেলেই তাদের জীবনের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে!
মোট নয়টি রুট দিয়ে ইউরোপে মা্নবপাচার হয়ে থাকে। এর মধ্যে বাংলাদেশিরা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে সেন্ট্রাল মেডিটেরিয়ান রুট, মানে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইতালি।
২০০৯ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এই রুট দিয়ে প্রবেশ করতে গিয়ে ৩২ হাজার ৬৭৪ জন বাংলাদেশি গ্রেপ্তার হন বলে ডয়চে ভেলে বাংলার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এই রুটে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি গেছে ২০১৭ সালে, ৯ হাজার জন।
সমুদ্র পথে অবৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ধরতে ভূমধ্যসাগরে কড়াকড়ির মধ্যেও তা থেমে নেই। তবে বাংলাদেশিদের স্থলপথ দিয়েও ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা রয়েছে। এক্ষেত্রে জনপ্রিয় হচ্ছে বলকান রুট।
বলকান দেশগুলোকে ঘিরে বর্তমানে ইউরোপে মানবপাচারের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে৷ পায়ে হেঁটে, ঘন বন-জঙ্গল পাড়ি দিয়ে কিংবা পাহাড় বেয়ে এমনকি খরস্রোতা নদীতে সাঁতার কেটে রাতের অন্ধকারে কাঁটাতারের সীমানা ডিঙিয়ে অনেকে স্বপ্নের ইউরোপে পা রাখতে চান।
আলবেনিয়া, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, মেসিডোনিয়া, মন্টিনিগ্রো, গ্রিস, কসোভো, সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, রোমানিয়া ও হাঙ্গেরির সামান্য অংশ নিয়ে বলকান অঞ্চল। এশিয়া ও ইউরোপের মিলনস্থলে অবস্থিত হওয়ায় এটিকে ইউরোপের প্রবেশদ্বার বলা হয়।
মানব পাচারকারীরা এখন গ্রিস থেকে মেসিডোনিয়া হয়ে কিংবা গ্রিস থেকে আলবেনিয়া- কসোভো, মন্টেনেগ্রো, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা হয়ে সার্বিয়াতে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সার্বিয়া থেকে ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, পর্তুগালসহ শেনজেনের অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্রে অনুপ্রবেশ করার চেষ্টা চলে।
আবার হাঙ্গেরির সঙ্গে সার্বিয়ার সীমান্ত রয়েছে৷। সার্বিয়া থেকে ক্রোয়েশিয়া হয়ে স্লোভেনিয়া যাওয়া যায়৷ এছাড়া বসনিয়া-হার্জেগোভিনা কিংবা মন্টেনেগ্রো থেকে ক্রোয়েশিয়া ও ক্রোয়েশিয়া থেকে স্লোভেনিয়া হয়ে অনেকে শেনজেন রাষ্ট্রে ঢোকার চেষ্টা করেন।
আরও খবর:



