বাংলাদেশে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মত প্রকাশের কারণে গ্রেপ্তার, সহিংসতা, হেনস্তার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা নয়টি আন্তর্জাতিক সংগঠন।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষায় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছে তারা।
শুক্রবার মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইটে ওই যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়, যাতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ছাড়াও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, আর্টিকেল নাইনটিন, এশিয়ান ফোরাম ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, সিভিকাস: ওয়ার্ল্ড অ্যালায়েন্স ফর সিটিজেন পার্টিসিপেশন, ফর্টিফাই রাইটস, ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্স, পেন আমেরিকা ও দ্য কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টের (সিপিজে) নাম উল্লেখ করা হয়।
চার পৃষ্ঠার ওই বিবৃতিতে সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীসহ সাধারণ নাগরিকদের উপর হওয়া বেশ কিছু হামলার ঘটনা তুলে ধরা হয়।
পাশাপাশি এসব ঘটনা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ ও দোষীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারি মাসে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের কারণে মানবাধিকারকর্মী ও সাধারণ নাগরিকেরা গ্রেপ্তার, হেনস্তা ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, গত ৩ ফেব্রুয়ারি শরীয়তপুরে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন করার পর একজন সাংবাদিককে হাতুড়ি ও ছুরি দিয়ে আক্রমণ করা হয়। ওই ঘটনায় আরও তিনজন সাংবাদিক আহত হন।
৩ ফেব্রুয়ারি লক্ষ্মীপুরে মুখোশধারী ব্যক্তিরা চার সাংবাদিকের ওপর গুলি চালিয়েছে। ৫ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে তিনজন সাংবাদিকের উপর হামলা চালানো হয়, যারা কিনা ১৯৯৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রেনে হামলার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত ৪৬ জনকে খালাস দেওয়ার ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করছিলেন।
৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এক বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করার সময় পাঁচ সাংবাদিককে পুলিশের মারধর, ২৫ ফেব্রুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপি সদস্যের হাতে একজন সাংবাদিক লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও তুলে ধরা হয় ওই বিবৃতিতে।
কেবল সাংবাদিকরাই নয়, লেখক, কবি এবং মানবাধিকার কর্মীরাও আক্রমণের শিকার হয়েছেন বলে এতে উল্লেখ করা হয়।
এর মধ্যে ১০ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে বইমেলায় বইয়ের স্টলে তসলিমা নাসরিনের লেখা বই বিক্রির দায়ে হামলার ঘটনা তুলে ধরে বলা হয়, প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস হামলার তদন্তের নির্দেশ দিলেও অপরাধীদের জবাবদিহি করার কোনও ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
ধর্ম বা ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষার নামে মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর ক্রমবর্ধমান বিধিনিষেধের পটভূমিতে ওই ঘটনাটি ঘটেছিল বলে উল্লেখ রয়েছে ওই বিবৃতিতে।
ওই বিবৃতিতে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার’ অভিযোগে ১৩ ফেব্রুয়ারি সোহেল গালিব নামে এক কবিকে গ্রেপ্তার এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়টিও তুলে ধরা হয় বিবৃতিতে।
এ ছাড়া ৩ মার্চ পাঠ্যপুস্তক সংশোধন কমিটির সদস্য রাখাল রাহার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি বিবৃতিতে উঠে এসেছে।
এতে বলা হয়, রাখাল রাহা কবি সোহেল গালিবের গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলে একটি ব্যঙ্গাত্মক কবিতা লিখেছিলেন।
বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে লঙ্ঘনের কথা তুলে ধরে বলা হয়, মতপ্রকাশের অধিকারের প্রতি সম্মান বজায় রাখার অনুশীলনের মাধ্যমে অতীতের ধারা থেকে বাংলাদেশের বেরিয়ে আসা উচিত।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলেছে, সাম্প্রতিক হামলার সব ঘটনায় রাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরাই কেবল জড়িত না থাকলেও স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকার সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা সরকারের।
স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের কারণে রাষ্ট্রবহির্ভূত কোনো পক্ষের হামলা থেকে জনগণকে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি সরকারের ওপরই বর্তায়।
বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ওই বিবৃতিতে বলা হয়, মতপ্রকাশের কারণে বিভিন্ন ব্যক্তি ও মানবাধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার চর্চা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
সংগঠনগুলো বলেছে, ক্ষমতায় আসার পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকার বিতর্কিত সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিলে অনেকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এর মধ্যে যে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, তা–ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবিষয়ক মানদণ্ডের সঙ্গে সংগতি রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। খসড়া এই আইনেও আগের আইনের বিতর্কিত বিষয়গুলোই রয়ে গেছে।
বিবৃতিতে যেকোনো আইনের খসড়া প্রণয়নে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং মানদণ্ড মেনে চলতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
এ ছাড়া মত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার আদায়ের দাবি জানানোর দায়ে আটক ব্যক্তি এবং মানবাধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে হওয়া সকল অভিযোগ প্রত্যাহারের দাবি এসেছে বিবৃতিতে।
সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল বা সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত মত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার লঙ্ঘনকারী বিধানের অধীনে কাউকে গ্রেপ্তার বা আটক না করার আহ্বানও জানিয়েছে তারা।
এতে আরও বলা হয়, মানবাধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার জন্য অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড ব্যতিরেকে ন্যায্য ও নিরপেক্ষ বিচারের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া রাষ্ট্রীয় বা রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর হয়রানি, ভয় দেখানো বা সহিংসতা থেকে সাংবাদিক, অন্যান্য গণমাধ্যমকর্মী, সুশীল সমাজের কর্মী এবং মানবাধিকারকর্মীদের সুরক্ষা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয় ওই বিবৃতিতে।



