আততায়ীর গুলিতে এক যুবকের মৃত্যুকে ঘিরে ইসলামী চরমপন্থী ও উগ্রগোষ্ঠীর অনলে যখন জ্বলছিল ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, ঠিক তার আশেপাশের কোন এক সময়ে বৃহস্পতিবার রাতে ময়মনসিংহের ভালুকায় গাছে ঝুলিয়ে পোড়ানো হচ্ছিল অর্ধমৃত এক হিন্দু যুবককে।
দীপু চন্দ্র দাস নামের ওই যুবককে হত্যার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সোশাল মিডিয়ায়। যা নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা।
সীমানার ওপারে ভারতেও ঘটনার আঁচ লেগেছে; দেশটির সংবাদপত্রে তুলে ধরা হয়েছে সচিত্র প্রতিবেদন। শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে।
গত বছরের আগস্টে আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর অতি সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতারা ‘ইনক্লুসিভ (অন্তর্ভুক্তিমূলক)’ বাংলাদেশের যে কথা বলেছেন, তার ফাঁক গলে আগস্টের পর মাজারে হামলা হয়েছে সারাদেশে, হাসন রাজার জেলা সুনামগঞ্জে গান-বাজনা বন্ধ করতে বলা হয়েছে, নাটক বন্ধের ঘটনা ঘটেছে খোদ রাজধানীতে।
জয়পুরহাটে মেয়েদের প্রীতি ফুটবল ম্যাচেও ‘নারীদের বেপর্দা হয়ে ফুটবল খেলা চলবে না’ ঘোষণা দিয়ে হামলা হয়েছে বছরের শুরুতে।
আর গতকাল তো নজিরবিহীন হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে ক্ষতবিক্ষত হলো দুটি নামকরা সংবাদপত্র কার্যালয়, বাঙলা সংস্কৃতি চর্চার কেন্দ্র ছায়ানট, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ধানমন্ডি ৩২ এর অবশিষ্ট স্থাপনা এবং শুক্রবার উদীচীর কার্যালয়।
এর আগে পাঠ্যবই পরিমার্জনের কমিটি গঠনের পর তা আবার বাতিল করাকে ‘মৌলবাদী হুমকির কাছে অন্তর্বর্তী সরকার আপস’ হিসাবে দেখিয়ে তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। বাংলাদেশে উগ্র ইসলামি গোষ্ঠীর মাথা চাড়া দেওয়া নিয়ে বিদেশি বিভিন্ন সংগঠনও উদ্বেগ জানাচ্ছে।
প্রতিক্ষেত্রেই বিবৃতি দিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল সরকারের কার্যক্রম, যা দৃশ্যত কোনো কাজে আসেনি বলে বলা যায়।
ভালুকার ঘটনায়ও বিবৃতি এসেছে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের, যেখানে বিচ্ছিন্ন উগ্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সবাইকে সতর্ক থাকার ‘নসিহত’ করা হয়েছে।

ঘটনার নিন্দা জানিয়ে সরকার বলেছে, “নতুন বাংলাদেশে এ ধরনের সহিংসতার কোনো স্থান নেই। এই জঘন্য অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।”
ঘটনায় নতুন মোড়
দীপু চন্দ্র দাসের চাচাতো ভাই কার্তিক চন্দ্র দাস জানিয়েছেন, দীপুরা তিন ভাই। দীপু সাত বছর ধরে ভালুকায় গার্মেন্টসে কাজ করছিলেন। দুই বছর আগে বিয়ে করেছিল। তার এক বছরের একটি কন্যাসন্তান আছে।
তিনি যে গার্মেন্টসে বর্তমানে কাজ করছিলেন সেটির নাম জামিরদিয়া পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস বিডি লিমিটেড।
শোনা যাচ্ছে, সেখানে তিনি মুসলমানদের একজন নবীকে নিয়ে কটূক্তিপূর্ণ কথা বলেছিলেন। কিন্তু কার কাছে এবং কীভাবে তিনি কটূক্তি করলেন তা অজানা রয়ে গেছে।
বরং মিলেছে ভিন্ন ভাষ্য, যেখানে কর্মস্থলে প্রতিযোগিতার বিষয় সামনে এসেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কারখানার একজন শ্রমিক জানিয়েছেন, দীপু চন্দ্র দাস সস্প্রতি পদোন্নতি পেয়েছিলেন। একই পদের দাবিদার ছিলেন আরও তিনজন। পরবর্তিতে তারাই তার প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। এর মধ্যেই গার্মেন্টসে পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে সহকর্মীরা তার নামে ধর্ম অবমাননার গল্প ছড়িয়ে দেয়।
অবমাননার ওই অভিযোগ কথিত ‘তৌহিদি জনতার’ কানে পৌঁছালে রাত ৯টার দিকে তারাই দীপু চন্দ্র দাসকে সেখান থেকে ধরে নিয়ে যায়।

তথ্যের সত্যতা আইনশৃঙ্খলাবাহিনী বা কারাখানা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করতে পারেনি দ্য সান টোয়েন্টিফোর ডটকমের এই প্রতিবেদক। কারখানার অন্তত দু’জন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এ বিষয়ে কথা বলতে তারা রাজি হননি।
তবে নিহতের বোনের বক্তব্যে ওই তথ্যের কিছুটা সত্যতা পাওয়া যায়। উৎপাদন বৃদ্ধি নিয়ে শ্রমিক ও মালিকদের সঙ্গে তার বিরোধ থাকার কথা শুনেছেন জানিয়ে বোন চম্পা দাস বলেছেন, “সেই কারণেই হয়তো থাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।”
“কোম্পানির লোকজন ভাইকে জনতার হাতে তুলে না দিয়ে পুলিশের কাছে দিতে পারতো। তাহলে তার এমন নির্মম মৃত্যু হতো না,” বিলাপ করতে করতে বলছিলেন চম্পা।
কারখানার নিরাপত্তাকর্মী ফিরোজ মিয়া কথা প্রসঙ্গে বলেন, “ভেতরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ নিয়া ওনার সঙ্গে কোম্পানির কয়েকজন কথা বলছিলেন।
“বিষয়ডা বাইরে জানাজানি হইয়া গেলে লোকজন গেইটের সামনে আইসা জড়ো হয়। পরে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে তাকে জনতার হাতে তুলে দেয়।”
দীপু ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা উপজেলার মোকামিয়া কান্দা গ্রামের রবি চন্দ্র দাসের ছেলে।
তার বাবা বলেন, “আমার পোলা বাটন মোবাইল ব্যবহার করত। হেয় মূর্খ না যে নবীকে নিয়ে কটূক্তি করবো। বিএ পাস। আমাগো আয়-রোজগার হেয়ই করত।”

বাবা হিসেবে ছেলের এমন মৃত্য মনে নিতে পারছেন না রবি চন্দ্র দাস। তিনি বলেন, “আমার ছেলের কী দোষ ছিল বলেন? ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করলে দেশে তো আইন ছিল। সেই আইনে তো বিচার হতো। আমরা গরিব তাই ছেলের জীবন রক্ষা করতে পারিনি।”
নিহতের স্ত্রী মেঘনা রানী বলেন, “আমার একমাত্র সন্তান বাবা হারাইছে। অভাবের সংসারে কোথায় গিয়ে দাঁড়ামু ভাইবা পাইতাছি না। হত্যার বিচার চাই।”
কারখানার এক শ্রমিক এবং দীপুর বোনের কথার সারমর্ম থেকে এটি খানিকটা ধারণা করা যায় ধর্ম অবমাননার বাইরে এ ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়।
মামলা দায়ের, পোস্টমর্টেম
শুক্রবার দুপুরে দীপু চন্দ্রের ছোট ভাই অকু চন্দ্র দাস বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে ভালুকা মডেল থানায় অভিযোগ দায়ের করলেও সেটি এখনও মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়নি।
বিকালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে পোড়া মরদেহের অবশিষ্টাংশ তুলে দেওয়া হয়।
মামলা ও আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে কোনো অগ্রগতি আছে কিনা জানতে চাইলে ভালুকা মডেল থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম বলেন, দীপু চন্দ্র দাসের ছোট ভাই অকু চন্দ্র দাস অজ্ঞতনামাদের আসামি করে থানায় একটি অভিযোগ দিয়েছেন। সেটিকে মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করা হবে।
ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেন তিনি।
বিজেপির প্রতিবাদ
এক বিবৃতিতে বিজেপির ত্রিপুরা শাখা জানিয়েছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুরা দীর্ঘদিন ধরে এই মুসলিম মৌলবাদের অত্যাচারের শিকার হয়ে আসছে।
আজ সেই সোনার বাংলার নাম কেবল ইতিহাসে, বর্তমানে তা মৌলবাদীদের দখলে, যেখানে সংখ্যালঘু হিন্দুরা প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
হিন্দু নিধনের পরিকল্পিত রাজনীতি! এই নৃশংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।



