গেল ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সংকটময় সময়ে ঈদুল ফিতর উদযাপন করছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার নেতৃত্ব দেওয়া দল আওয়ামী লীগ। বেশিরভাগ নেতৃত্ব দেশছাড়া, কেউ আছেন কারাগারে। আর যারা দেশে আছেন তারাও রয়েছেন আত্মগোপনে। তৃণমূলের কিছু নেতা এলাকায় ফিরলেও তারা এমন ‘মানবেতর’ ঈদ কখনও দেখেননি।
বেশির ভাগ নেতা দেশের বাইরে
গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ভারতে চলে যান আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। তখন থেকে তিনি দিল্লিতে অবস্থান করছেন। এবার তার ঈদ কাটছে প্রতিবেশি দেশে। যদিও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর দীর্ঘদিন ভারতে ছিলেন। তখনও তার ঈদ কেটেছিল ভারতে।
এছাড়া দেশের বাইরে অবস্থান করছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসিম কুমার উকিল, সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, সুজিত রায় নন্দী, অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ, প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, সাবেক এমপি পংকজ দেবনাথ, আওলাদ হোসেন প্রমুখ।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতে অবস্থান করছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল।
তিনি বলেন, “এবারের ঈদ শুধু আমাদের জন্য নয়, গোটা বাংলাদেশের মানুষের জন্য ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এসেছে। এতো নিরানন্দের পরিবেশে বাংলাদেশের মানুষ ঈদ উদযাপন করেছে কিনা সন্দেহ! যদি নিরাপত্তার কথা বলি, তাহলে বলতে হবে শুধু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী নয়, দেশের কারোরই নিরাপত্তা নেই। এবারের অবস্থা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বিপরীতমুখী। অর্থনৈতিক চাপে সাধারণ মানুষের অবস্থা শোচনীয়। খবরের কাগজে দেখছি নিম্ন আয়ের মানুষজন ঈদ উদযাপনের জন্য বাড়ি যেতে পারেনি। এক কথায় বললে, একটা মানবেতর ঈদ পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ।”
আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক নৌ-প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “আজ আওয়ামী লীগ নেই, বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে কোনো ঈদ আনন্দ নেই। শেখ হাসিনা নেই, দেশের মানুষের মনে শান্তি নেই। ঢাকা শহরের মানুষ আতংকের মধ্যে আছে। নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে গ্রামে যেতেও সাহস করছে না। শ্রমিকরাও ন্যায্য মজুরি পায়নি। ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা হচ্ছে। কর্মকর্তা কর্মচারীরাও আতংকে।”
জেলবন্দি নেতাদের ঈদ
গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষ নেতা। এবার তারা ঈদ কাটাচ্ছেন কারাগারে।
এখন কারাগারে রয়েছেন —আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুর রাজ্জাক, লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান, শাজাহান খান, কাজী জাফরউল্লাহ, ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, জাতীয় কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট বলরাম পোদ্দার, সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, সাবেক এমপি হাজী মোহাম্মদ সেলিম আরও অনেকে।
দেশে আওয়ামী লীগের ‘মানবেতর’ ঈদ
টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। তার আগে আরও ৫ বছর সরকার চালিয়েছে দলটি। এতদিন ক্ষমতায় থাকার পর এবার ‘মানবেতর’ ঈদ কাটাচ্ছেন দেশে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের বেশির ভাগ এখনও আত্মগোপনে রয়েছেন। যে সমস্ত কর্মীরা এলাকায় ফিরেছেন, তারাও আছেন কষ্টে। অথচ সাত মাস আগেও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের জীবন ছিল রীতিমতো রাজকীয়, ঈদ ছিল জমজমাট।
নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ খাইরুল আনাম চৌধুরী (সেলিম চেয়ারম্যান) বলেন, “আমরাই তো আত্মগোপনে। হামলা-মামলায় জর্জরিত। এত কষ্টের মধ্যে ঈদ কীভাবে হয়! নেতাকর্মীরা তাদের দুঃখ-দুর্দশা নানাভাবে আমাদের কাছে পৌঁছায়। অনেকে আমাদের পর্যন্ত পৌঁছাতেও পারছে না। যোগাযোগটা পর্যন্ত করা যাচ্ছে না। প্রত্যেকের ঘাড়ে মামলা, হামলা ও গ্রেপ্তারের ভয়।”
কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার ঝলম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি খায়রুল আনাম ইয়াকুব বলেন, “আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতা-কর্মীরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন পরিবার নিয়ে। তাদের খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য অনেক কম নেতাই এগিয়ে এসেছে। শেখ হাসিনাকে ছাড়া নিরানন্দ আমাদের ঈদ আনন্দ। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীর আনন্দ নেই। মামলা-হামলার ভয়ে অনেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছে।”
চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলা পরিষদের ভাইস-চেয়ারম্যান ইমদাদুল হক মিলন বলেন, “এই কষ্ট বর্ণনা করার মতো ক্ষমতা আমার নেই। বাবা-মা না থাকলে একরকম আর অসুস্থ মাকে রেখে দূরে ঈদ করা, এটা হয়তো ঈদ বলা যাবে না। সেটা কষ্টের সমুদ্র।”