শেখ হাসিনা সরকার উৎখাতের আন্দোলনে আহতরা উন্নত চিকিৎসার দাবিতে আবারও রাস্তায় নামেন শনিবার রাতে। তাদের অভিযোগ, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহতদের সুচিকিৎসা দিচ্ছে না ইউনূসের সরকার।
সুচিকিৎসা, পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণের দাবিতে শনিবার রাতে জাতীয় অর্থোপেডিক ইনস্টিটিউট ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের (পঙ্গু হাসপাতালের) সামনে সড়ক অবরোধ করে আহতরা।
শ্যামলীর শিশুমেলা মোড়ে অবস্থান নিলে মিরপুর রোডের উভয় দিকের পাশাপাশি শ্যামলী থেকে আগারগাঁও সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
আন্দোলনকারীদের কারও কারও পা ছিল না, কেউ কেউ তাদের চোখ হারিয়েছেন। অনেকের ক্ষত এখনও শুকায়নি। তারপরও তারা ‘সুচিকিৎসা’র দাবিতে পথে নেমেছেন।
শ্যামলী থেকে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার দিকে এগোতে চাইলে পুলিশ তাদের আটকে দেয়। পরে শাহবাগ এলাকায় হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ দেখান তারা।
রাত ১২টার দিকে পুলিশের সেই ব্যারিকেড ভেঙে যমুনার সামনে অবস্থান গিয়ে অবস্থান নেন বিক্ষোভকারীরা।
ক্ষোভ ঝেড়ে আন্দোলনকারী মোহাম্মদ শরীফ বলেন, “বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহতরা কী করছে, কী খাচ্ছে, কোথায় থাকছে- সেই খবর কেউ নিচ্ছে না। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহতরা বুঝে গেছে সব শালারা বাটপার।”
শরীফ বলেন, “যদি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহতদের সঙ্গে বেঈমানি করা হয়, হাসিনা গেছে যে পথে তারাও যাবে সেই পথে।”
আন্দোলনকারীদের নেতা কোরবান শেখ হিল্লোল বলেন, “আমাদের ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছি, কিন্তু তারা কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না। আমাদের কথা কেউ শুনছে না। আমাদের ভালো চিকিৎসার প্রয়োজন।”
গত ১৩ নভেম্বরও ‘চিকিৎসার দাবিতে’ আন্দোলনে নেমেছিল আহতরা। বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের পদত্যাগের দাবিতে স্লোগানও দিয়েছিল।
আহতরা ‘চিকিৎসার দাবিতে’ আন্দোলনে নামায় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জুলাই-অগাস্ট মাসে আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা নিয়ে এর আগেও কথাবার্তা হয়েছে। তার পারিপ্রেক্ষিতে আহতদের চিকিৎসা ও নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’ গঠন করা হয়।
সরকার থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিলো যে আন্দোলনে আহত সবাইকে সুচিকিৎসা দেওয়া হবে। কিন্তু আহত ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীনদের বড় অভিযোগই হলো— চিকিৎসা হচ্ছে না।
আহতদের প্রধান অভিযোগ, প্রায় ছয় মাস ধরে হাসপাতালে থাকলেও সরকার তাদের খোঁজ নেয়নি। সেইসাথে, প্রতিশ্রুত আর্থিক সহায়তাও তারা পাচ্ছে না।
অথচ গত ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’– এর তখনকার সাধারণ সম্পাদক সারজিস আলম বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, “নভেম্বরের মাঝে ভেরিফিকেশন হবে এবং ডিসেম্বরের মাঝে সবার কাছে ফান্ড পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।”
মাসের পর মাস যায় কিন্তু সরকারের প্রতিশ্রুত সহায়তা পায় না জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের আহতরা।
আহতদের সুচিকিৎসা দিতে না পারায় মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের ব্যর্থতা বলে মনে করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ। তবে এজন্য সরকারের আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতি, সচিব ও আমলাদের দায়ী করেছেন।
রোববার দিবাগত রাত ১২টার দিকে যমুনার সামনে অবস্থান নেয়া আহতদের উদ্দেশে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, “আমাদের হাতে কিছু নেই। আমরা কিছু করতে পারি না। আপনারা যে চিকিৎসা পান না এটা সত্য। এর জন্য দায়ী সরকারের লোকজন। সরকার ভালো মতো তদারকি করতে পারে নি।”
ছয় মাসে কয়েক হাজার আহতদের চিকিৎসা দিতে পারেনা অন্তবর্তী সরকার, তারা কীভাবে সারাদেশের মানুষের স্বাস্থ্য সেবা দিবে?- সেই প্রশ্ন তুলেছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল।
তিনি বলেন, “আহতরা রাস্তায় আন্দোলন করছে। অথচ তাদের সাথে সরকারের কেউ যোগাযোগ করেনি, খোঁজ নেয়নি। উপদেষ্টারা একজনের বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত। বিয়েতে আনন্দ করেন কিন্তু একজন উপদেষ্টা তো আহতদের কাছে যেতে পারতেন।”
বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডে তিনি নিজে হতাশ বলে মন্তব্য করেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাসুদ কামাল।
জুলাই-আগস্টে ঠিক কত মানুষ আহত হয়েছিলেন, তার সঠিক সংখ্যা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। তবে ঠিকানা ও পরিচয় জানা সম্ভব হয়েছে, এমন ১১ হাজার ৫৫১ জনের একটি তালিকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে।
সরকার বলছে, এটি খসড়া তালিকা। এ তালিকায় থাকা আহত ব্যক্তিরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বিনা মূল্যে পাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল অন্তবর্তী সরকার।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল), বিএসএমএমইউ, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) এখনো ১৩০ জনের মতো আহত চিকিৎসাধীন।
আহত ব্যক্তিদের মধ্যে এ পর্যন্ত ৩০ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তাদের দুজন চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরেছেন।
এছাড়া গত ২৭ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১০ জনের একটি চিকিৎসক দল বাংলাদেশে এসেছে আহতদের চিকিৎসা দিতে।



