রাজনীতির কাছে ক্রিকেট হচ্ছে ভীষণ জব্দ

মুস্তাফিজুর রহমান। ফাইল ছবি।
মুস্তাফিজুর রহমান। ফাইল ছবি।

গত দেড় বছর ধরে বাংলাদেশ-ভারত রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েন এবার ক্রীড়াঙ্গনেও লেগেছে। হুট করেই ভারতে উগ্রপন্থিদের হুমকিতে মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেয়ার নির্দেশ দেয় ভারতের ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড-বিসিসিআই। তার জেরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড-বিসিবিও আসন্ন টি-২০ খেলতে ভারতে দল না পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিসিবি কিংবা বিসিসিআই কেউই নিজ সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নেয়নি। বিজেপির রাজত্বে বিসিসিআই সিদ্ধান্তটি নিয়েছে উগ্র হিন্দু নেতাদের চাপে। আর বাংলাদেশে বিসিবি সিদ্ধান্তটি নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের চাপে।

২০২৪ সালের আগস্টে অভ্যুত্থানে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে ঢাকা ও নয়া দিল্লির সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয়। ভিসা বন্ধ, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, কূটনীতিক তলবের ঘটনা একের পর এক ঘটছে। প্রতিবেশী দেশ দুটির মধ্যে এমন নাজুক সম্পর্ক এর আগে দেখা যায়নি। এর মধ্যে ভারতের বৈরী প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গাঢ় হতে শুরু করে।

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অস্বাভাবিকতা এতদিন ধরে চললেও খেলায় তার কোনো ছাপ পড়ছিল না। এর শুরুটা হয় আইপিএল থেকে মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়াকে কেন্দ্র করে। এই ‘কাটার মাস্টার’ শাহরুখ খানের দল কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে খেলতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল।

গত ডিসেম্বরে আবুধাবিতে আইপিএল নিলামে মোস্তাফিজকে কিনতে কাড়াকাড়ি চলে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর), চেন্নাই সুপার কিংস, দিল্লি ক্যাপিটালসের। শেষে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে তাকে পায় শাহরুখ খানের দল। এরপর বিসিসিআইর অনুরোধে মোস্তাফিজকে আইপিএলে খেলার অনাপত্তিপত্র দেয় বিসিবি।

কিন্তু গোল বাধে ডিসেম্বরের শেষ দিকে। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে হিন্দু ধর্মের যুবক দীপু চন্দ্র দাসকে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় যখন ভারতে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো সরব হওয়ার পর মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার দাবি ওঠে।

মোস্তাফিজকে দলে নেওয়ায় শাহরুখ খানকে ‘গাদ্দার’ বা দেশদ্রোহী আখ্যা দেন উত্তর প্রদেশের শাসক দল বিজেপির নেতা সঙ্গীত সোম। গত ৩০ ডিসেম্বর তিনি বলেন, “মোস্তাফিজের মতো খেলোয়াড় যদি ভারতে খেলতে আসেন, তাহলে বিমানবন্দরের বাইরে পা রাখতে পারবেন না। আমি প্রতিজ্ঞা করে বলছি। এই কথাটা শাহরুখ খানের মতো গাদ্দারদের বুঝে নেওয়া উচিৎ।”

এরপর আধ্যাত্মিক গুরু দেবকীনন্দন ঠাকুরও এক অনুষ্ঠানে বলেন, মোস্তাফিজকে যেন না খেলানো হয়। তার মতো আরো কেউ কেউ একই আওয়াজ তোলেন। ভারতের সাবেক কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার সদস্য শশী থারুরসহ কেউ কেউ এর বিরোধিতা করলেও উগ্র হিন্দু সংগঠনগুলোর চাপ বাড়তে থাকে।

সেই চাপে নত হয়ে মোস্তাফিজকে স্কোয়াড থেকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য কলকাতা নাইট রাইডার্সকে গত ৩ জানুয়ারি নির্দেশ দেয় বিসিসিআই। তার পরপরই কলকাতা নাইট রাইডার্সের কাছ থেকে মোস্তাফিজকে বাদ দেয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে।

এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশে ক্ষোভের সঞ্চার হলেও কেউ টি-২০ বিশ্বকাপ বাতিলের কথা ভাবেনি। বিসিবির পরিচালকরা ৩ নভেম্বর রাতে অনলাইনে বৈঠকে বসেন। তাদের বেশিরভাগই কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়ার বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়। কিন্তু এর মধ্যে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ফেইসবুকে এক পোস্টে উত্তাপ ছড়ান। 

বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশের ক্রিকেট, ক্রিকেটার ও বাংলাদেশকে অবমাননা মেনে নেব না। গোলামির দিন শেষ।”

ভারতে ক্রিকেট দল না পাঠাতে নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, “ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে আমি ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডকে (বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে) বলেছি, তারা যেন আইসিসির কাছে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করে লিখে। বোর্ড যেন জানিয়ে দেয় যে যেখানে বাংলাদেশের একজন ক্রিকেটার চুক্তিবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ভারতে খেলতে পারেন না, সেখানে বাংলাদেশের গোটা ক্রিকেট টিম বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া নিরাপদ মনে করতে পারে না। বোর্ড থেকে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলাগুলো শ্রীলঙ্কায় করার অনুরোধ জানানোর নির্দেশনাও আমি দিয়েছি।”

এরপর বিসিবি ভারতে ক্রিকেট দল না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে টি-২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরিয়ে অন্য কোনো দেশে আয়োজনের জন্য আইসিসিকে চিঠি দেয়। চিঠিতে বলা হয়, ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা নিয়ে জোরালো সংশয় তৈরি হয়েছে। সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ এবং বাংলাদেশ সরকারের পরামর্শ আমলে নিয়ে বোর্ড এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।

২০২৬ আইসিসি টি–২০ বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক ভারত ও শ্রীলঙ্কা। ৭ ফেব্রুয়ারি আসরের উদ্বোধনী দিনেই কলকাতায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের মুখোমুখি হওয়ার কথা বাংলাদেশের। লিগ পর্বে বাংলাদেশের চারটি খেলাই ভারত, তিনটি কলকাতায়, একটি মুম্বাইয়ে।

বাংলাদেশ সিদ্ধান্ত জানালেও এক অল্প সময়ের নোটিসে ভেন্যু পরিবর্তন অসম্ভব বলে মনে করছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই। বিসিসিআইয়ের একটি সূত্র এনডিটিভিকে বলেছে, “কারও খামখেয়ালিপনার বশে হুট করে ম্যাচ বদলে দেওয়া যায় না। এটা একেবারেই লজিস্টিক দুঃস্বপ্ন। প্রতিপক্ষ দলগুলোর কথা ভাবুন, তাদের বিমান টিকিট, হোটেল সবই বুক করা। প্রতিদিনই তিনটি করে ম্যাচ রয়েছে, যার অর্থ একটি ম্যাচ হবে শ্রীলঙ্কায়। সেখানে সম্প্রচার টিমও রয়েছে। ফলে বিষয়টা বলা যত সহজ, করা ততটা নয়।”

ফলে টি-২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ হবে কি না, তা অনিশ্চয়তায় পড়ল। তবে আসিফ নজরুল ফেসবুকে লিখেছেন, “যেখানে বাংলাদেশের একজন ক্রিকেটার চুক্তিবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ভারতে খেলতে পারেন না, সেখানে বাংলাদেশের গোটা ক্রিকেট টিম বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া নিরাপদ মনে করতে পারে না।”

অন্যদিকে মুস্তাফিজকে ঠেকিয়ে দিয়ে জয়ী ভাবছেন ভারতের বিজেপি নেতা সঙ্গীত সোম। তিনি বার্তা সংস্থা এএনআইকে বলেন, ১০০ কোটি সনাতনী ভারতীয়দের আবেগকে সম্মান জানিয়ে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত গোটা দেশের হিন্দুদের জয়।

উত্তর প্রদেশের মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা নরেন্দ্র কাশ্যপ বলেন, “আমরা বিসিসিআইয়ের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই, কারণ তারা দেশের আবেগ-অনুভূতি বুঝেছেন এবং বাংলাদেশি খেলোয়াড়টিকে সরিয়ে দিয়েছেন।”

তবে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক প্রশাসক রামচন্দ্র গুহা পুরো বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘অবিবেচনাপ্রসূত’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক ফিরিয়ে আনতে ক্রিকেটীয় সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিসিসিআইর সিদ্ধান্ত উল্টো ফল ডেকে আনতে পারে। তাতে ঢাকা আরও বেশি করে ইসলামাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।

কংগ্রেস নেতা শশী থারুরও বলেন, ক্রীড়াকে রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা ঠিক নয়। যদি ভারত এমন অবস্থানে যায়, যেখানে সব প্রতিবেশীর সঙ্গে খেলাধুলার সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়, তাতে কারও উপকার হবে না।

খেলাধুলাকে রাজনৈতিক রঙে রাঙালে এর পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সে প্রশ্নও রাখেন শশী থারুর।

এ সম্পর্কিত আরও খবর:

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads