আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গ্রেপ্তার হয়েছেন বহু সাবেক মন্ত্রী, সাংসদ, রাজনীতিবিদ ছাড়াও সাবেক আমলা ও সাংবাদিক। তাদের মধ্যে অধিকাংশই বিনা বিচারে দিনের পর দিন কারাগারে আছেন। অভিযোগপত্র জমা না পড়লেও জামিনও মিলছে না ‘রহস্যজনক’ কারণে।
সম্প্রতি জার্মানভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম ডয়েচে ভেলে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যাতে কারাবন্দির নানা তথ্য উঠে এসেছে।
ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেছেন, “বিনা বিচারে কেউ কারাগারে বন্দি নেই।”
যাদের বিরুদ্ধে মামলার চার্জশিট এখনও হয়নি তারা কেন এখনও কারাবন্দি আছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “তারা জামিন পেলে মামলায় প্রভাব বিস্তার করতে পারেন এমন অভিযোগ থাকলে আমরা তাদের জামিনের বিরোধিতা করছি। আর যারা জামিন পেলে পালিয়ে যাবেন না, মামলায় প্রভাব বিস্তার করবেন না তাদের জামিনের ক্ষেত্রে আমরা কোনো বিরোধিতা করছি না। তারা জামিনে ছাড়াও পাচ্ছেন।”
সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলেছেন, “গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন পরবর্তী সময়ে জামিনের পরিমাণ বেড়েছে৷ কিন্তু একেকজনের বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলা থাকায় কারাগার থেকে মুক্তি পেতে হয়ত সময় লাগছে, তবে জামিনের এই ধারা অব্যাহত থাকলে বিনা বিচারে যারা কারাগারে আছেন তাদের অনেকেই মুক্তি পাবেন।”
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সহকারী মহাপরিদর্শক মো. জান্নাত উল ফরহাদ বলেন, “১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে সারাদেশে কারাবন্দি ছিলেন ৮৫ হাজার মানুষ৷ আর আজকে (বুধবার) সারাদেশের কারাগারে বন্দির সংখ্যা ৮০ হাজার৷ অর্থাৎ নির্বাচনের পর পাঁচ হাজার মানুষ কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন।”
জামিন হচ্ছে না কেন
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাবেক আমলা শাহ কামাল ৫৬৮ দিন ধরে কারাগারে আটক থাকলেও তার বিরুদ্ধে এখনও অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়নি। সাংবাদিক ফরজানা রুপা ও শাকিল আহমদ চার্জশিট ছাড়াই আটক আছেন ৫৬৫ দিন৷ এছাড়া সাবেক মন্ত্রী টিপু মুনশী ৫৫৭ দিন, সাবেক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ৫৪০ দিন, ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত ও একাত্তর টিভির প্রধান নির্বাহী মোজাম্মেল হক বাবু ৫৩৮ দিন ও সাবেক মেয়র আতিকুল হক ৫১০ দিন ধরে আটক থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে এখনও অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়নি।
সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ২২৮ দিন ধরে কারাগারে আছেন। তার বিরুদ্ধেও চার্জশিট দাখিল করা হয়নি৷ তবে বুধবার তিনি সবগুলো মামলায় জামিন পেয়েছেন। তার আর কারামুক্তিতে কোনো বাধা নেই বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী মোতাহার হোসেন সাজু।
জামিনের আদেশের পর তিনি বলেছেন, “সরকার আসলে কী চাচ্ছে সেটা এখন বোঝা যাবে। সরকারি আইনজীবীরা যদি চেম্বার আদালতে না যান তাহলে বুঝবো সাবেক প্রধান বিচারপতি মুক্তি পেতে পারেন। তবে আমরা শুনছি, অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর চেম্বার আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এখন চেম্বার আদালত যদি জামিন বহাল রাখেন তাহলে সাবেক প্রধান বিচারপতি মুক্তি পেতে পারেন।”
বুধবার জামিন পেয়েছেন সাংবাদিক আনিস আলমগীরও। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় তার জামিন মঞ্জুর করেছেন আদালত৷ বুধবার ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. সাব্বির ফয়েজ শুনানি নিয়ে আনিস আলমগীরের জামিন মঞ্জুর করেন।
এ নিয়ে আনিস আলমগীর তার বিরুদ্ধে থাকা দুটি মামলাতেই জামিন পেলেন। সে ক্ষেত্রে আনিস আলমগীরের কারামুক্তিতে আইনগত বাধা নেই বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী তাসলিমা জাহান পপি৷
সাংবাদিকদের মুক্তি কবে?
কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (সিজেএ) অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গ্রেপ্তার হওয়া সাংবাদিকদের মুক্তির জন্য বিএনপি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটি এক বিবৃতিতে বলেছে, “মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে হত্যাসহ বিভিন্ন ভুয়া অভিযোগে এক বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে থাকা সাংবাদিকদের অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানাই।”
এর আগে সম্পাদক পরিষদ এবং বাংলাদেশে মানবাধিকার রক্ষাকারী ৬৩ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি সাংবাদিকদের নির্বিচারে আটক ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিভি) প্রেসিডেন্ট ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এনেছে তা মিথ্যা৷ এসব মামলা থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়ার আইনি কাঠামো এখনও দেশের মধ্যে তৈরি হয়নি। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে যেন মামলা থেকে বন্দি সাংবাদিকদের দ্রুত মুক্তি দেওয়া হয়। এতে বিশ্বজুড়ে নতুন বার্তা পৌঁছাবে।”
বর্তমানে শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল বাবু, শাকিল আহমেদ, ফারজানা রুপা, শাহরিয়ার কবীর, মাইটিভির চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন সাথী কারাগারে আছেন।
এদের মধ্যে কয়েকজনের পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছে ডয়চে ভেলের পর দ্য সান টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
তাদের মধ্যে একাধিক ব্যক্তি দাবি করেছেন, জামিনের আবেদন করা হলেও সেগুলো শুনানির জন্য আদালতে তোলা হচ্ছে না।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সাইদ আহমেদ রাজা বলেন, “গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বন্দিদের দুইভাবে ভাগ করা হয়েছে৷ একটি ভাগে আছেন রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা এবং অপরভাগে আছেন পেশাজীবীরা। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রে আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি, অত্যন্ত পরিচিত নেতা না হলে বা স্থানীয় পর্যায়ের নেতা হলে তাদের জামিন হচ্ছে এবং নতুন করে শোন অ্যারেস্ট করছে না। তারা জামিনে মুক্তি পাচ্ছেন।
“অন্যদিকে সাংবাদিক, বিচারপতি, শিক্ষক, সচিবসহ পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে সরকারের কাছে প্রত্যাশা ছিল, দ্রুত এই মামলাগুলোর শুনানি হবে এবং যারা বিনা বিচারে কারাগারে আছেন তাদের জামিন হবে। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। আগে আমরা যেটা দেখেছি, বয়স্ক বা অসুস্থ হলে আদালত বিশেষ বিবেচনায় নিতেন, এখন সেটাও হচ্ছে না। সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের বয়স ৮৩ বছর, সাংবাদিক শাহরিয়ার কবীর তো গুরুতর অসুস্থ৷ এটাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।”
আমলাদের আমলনামা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময় কারাগারে থাকা সাবেক শীর্ষ ১০ কর্মকর্তা হলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী, সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব ও নির্বাচন কমিশন সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম, সাবেক যুব ও ক্রীড়া সচিব মেজবা উদ্দিন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও সংসদ সদস্য মো. আবুল কালাম আজাদ, সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব মো. আমিনুল ইসলাম খান, এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দিন, সাবেক সচিব ও নির্বাচন কমিশন সচিব হেলাল উদ্দিন আহম্মদ, সাবেক সমাজ কল্যাণ সচিব ইসমাঈল হোসেন, সাবেক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব শাহ কামাল।
এদের মধ্যে বিস্ফোরক উপাদানাবলী আইন ১৯০৮ এ গ্রেপ্তার করা হয়েছে মেজবা উদ্দিন, আবুল কালাম আজাদ, আমিনুল ইসলাম খান, নজিবুর রহমান, মোস্তফা কামাল উদ্দিনকে৷ হত্যা মামলায় আটক হয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম, কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী, হেলাল উদ্দিন আহম্মদকে৷ হেলাল উদ্দিন আহম্মদের বিরুদ্ধে রয়েছে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ।
দুদকে আইনে আটক রয়েছে ইসমাঈল হোসন৷ অর্থপাচার ও দুর্নীতি মামলায় আটক আছেন শাহ কামাল।
সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের এমন আমলাদের বিরুদ্ধে হত্যা ও বিস্ফোরক উপাদানাবলী আইনে আটক বিষয়টি নতুন সরকারের প্রশাসনযন্ত্রে কেমন প্রভাব ফেলবে কি না জানতে চাইলে সম্প্রতি জেল থেকে মুক্তি পাওয়া সাবেক সচিব আবু আলম শহিদ খান বলেন, “শুধু সরকারি কর্মকর্তা না, সবার ক্ষেত্রেই আমি বলব, এই ধরনের মিথ্যা মামলায় কাউকেই আটকে রাখা উচিত না। আমার বিরুদ্ধেই যে মামলা দিয়েছিল তা শতভাগ মিথ্যা।”
জেলে রাজনৈতিক বন্দি কত?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর রাজধানীতে ৭০৬টি মামলা হয়েছে। হত্যা, দুর্নীতি ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পাঁচ হাজারের বেশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। এদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী-এমপিও আছেন৷ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্যমতে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সংঘাত ও প্রাণহানিসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে করা মামলায় এক বছরে ৫ হাজার ৭৯ জনকে গ্রেপ্তারের পর তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে৷ রাজধানীর ৫০ থানায় মামলা হয়েছে ৭০৬টি৷ সারা দেশে মামলা ১৬০২টি।
গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী ২৩, প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রী, ১১, এমপি ৬৬, সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি ৮ এবং ১৯ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য রয়েছেন।
এ ছাড়া রাজনীতিবিদ, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার রয়েছে ৪৫ জন৷ এর মধ্যে ৭ জন এমপি ও মন্ত্রী জামিন পেয়েছেন।
আর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২৭টির মতো মামলা হয়েছে। যেখানে শেখ হাসিনাসহ ২০৬ জনকে আসামি করা রয়েছে। এদের মধ্যে ৭৩ জনকে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র: ডয়েচে ভেলে



