কারাগারে সাংবাদিকদের ঈদ: বন্দী বাবা-মা’কে পেতে সন্তানের আর্তি

মোজাম্মেল বাবু, শ্যামল দত্ত, শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রূপা (বাম থেকে)।
মোজাম্মেল বাবু, শ্যামল দত্ত, শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রূপা (বাম থেকে)।

ছোট্ট জীবনে এই প্রথম বাবা-মা ছাড়া ঈদ কাটছে মনফুলের। সাত মাস হলো দেখা হয়নি; শেষবার কথা হয়েছে সেও চার মাস হলো। বাবার জন্মদিনে দেখা হবে- এমন আশা নিয়ে অপেক্ষায় থাকলেও তা পূরণ হয়নি। ভেবেছিল অন্তত ঈদের আগে বাবা-মা ফিরবে। এক সঙ্গে কাটবে ঈদের দিন!

মনফুল সাংবাদিক দম্পতি শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রুপার একমাত্র মেয়ে। সতের বছর বয়সে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে এক নিগূঢ় বাস্তবতা।

দ্য সান ২৪-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় মেলে ধরে সেই কঠিন বাস্তবতার দিনলিপি।  

সে জানায়, ঈদের দিন বাবা-মার সঙ্গে দেখা করতে কাশিমপুর কারাগারে গিয়েছিল। কিন্তু নিয়মের বেড়াজালে আর দেখা হয়নি; অশ্রু বিসর্জনই কেবল এ যাত্রায় তার অর্জন; শূন্য হৃদয়ে ফিরতে হয়েছে খালার বাসায়।

শাকিল আহমেদ জনপ্রিয় সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন স্টেশন একাত্তরের হেড অব নিউজ ছিলেন। আর ফারজানা রুপা ছিলেন স্পেশাল করসপন্ডেন্ট। দু’জনই সাংবাদিকতায় আছেন তিন দশকের বেশি সময় ধরে। রয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কাজের অভিজ্ঞতা।

বাবা-মা যেন অন্তত জামিনে মুক্তি পান সে চেষ্টায় শুভাকাঙ্খীদের সঙ্গে নানাভাবে যোগযোগ করে যাচ্ছে মনফুল। তবে তাতে খুব একটা যে কাজ হচ্ছে না সে কথাই ফুটে ওঠেছে তার কণ্ঠে।

দ্য সান ২৪কে মনফুল বলে, “বাবা-মা’র সঙ্গে দেখা হয়নি দীর্ঘদিন, কথাও বন্ধ কয়েক মাস হলো। বাবা-মার মুক্তির জন্য পরিচিতদের ফোন দিয়েছিলাম। বেশিরভাগই বলেছে- ‘দেখছি’। কিন্তু কাউকে প্রতিবাদ করতে দেখলাম না। সাবই যেন আমাদের কথা ভুলেই গেছে।”

বাবা-মা গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে খালার বাসায় থাকছে বলে জানিয়েছে সে।

মনফুলের প্রশ্ন, “কাগজে পড়লাম কতো সন্ত্রাসী ছাড়া পেয়েছে অথচ আমার পাপা-মাকে কারাগারে রাখা হয়েছে। মাকে কনডেম সেলে রাখা হয়েছিল। তারা কী অনেক বিশাল অপরাধী? তাদের জামিন হবে না? আইনজীবী পাবে না?”

গত ৫ মার্চ হ্যান্ডকাপ পরিয়ে আদালতে তোলা হয়েছিল শাকিল আহমেদ ও ফারজানা রূপাকে। সেসময় রোজা রাখা নিয়ে শাকিল আহমেদের বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর কেউ কেউ সরব হয়েছেন। অন্তত ফেসবুকে লিখছেন। কেউ কেউ দাবি তুলেছেন- অপরাধী হলেও যেন তাদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়।

এই সাংবাদিক দম্পতি ছাড়াও আরও দুই সাংবাদিকের এবারের ঈদ কাটছে কারাগারে। একাত্তর টেলিভিশনের এমডি ও প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু এবং দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক ও জাতীয় প্রেসক্লাবে সাবেক সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্ত।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইতোমধ্যে শতাধিক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আনা হয়েছে। কেড়ে নেওয়া হয়েছে অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড। করা হয়েছে চাকরিচ্যুত। এদের মধ্যে যে চার জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন তাদের তিন জনই বেসরকারি টেলিভিশন স্টেশন একাত্তরের সাংবাদিক।

সাংবাদিকদের লাঞ্ছনা ও হয়রানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরের দিনগুলোতে। শুধু ঢাকায় মোট আটটি টেলিভিশন স্টেশন ও সংবাদপত্র কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। কারওয়ান বাজারে এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজের কার্যালয় ছাড়াও বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়কে সময় টেলিভিশনের কার্যালয়ে হামলা হয়েছে।

ভাঙচুর করা হয়েছে তেজগাঁওয়ে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের কার্যালয়ের নিচে রাখা গাড়ি। একাত্তর টেলিভিশনের বারিধারার কার্যালয়ের ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি ‘রাজনৈতিক বিচারে’ গণহারে ছাঁটাই করা হয়েছে বহু সংবাদকর্মীকে। হয়েছে খুন, অর্থপাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তাদের সবাইকে প্রথমত ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। এরপর ওই তালিকা ধরে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, যিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (একাংশ) নেতা, দ্য সান ২৪কে বলেন, “খোঁজ নিয়ে দেখবেন, শাকিল আহমেদ কিন্তু ছাত্র জীবনে ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। আর ফারজানা রুপা বাম রাজনীতিতে। এ কারণে তারা কিন্তু গণভবনেও নিষিদ্ধ ছিলেন। তবে হ্যাঁ, শ্যামল দত্তের বিষয়ে বলতে পারি, আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার এক ধরনের সখ্যতা ছিল। তাই বলে মামলা হওয়ার মতো তিনি কোনো অপরাধ করেছেন বলে কেউ প্রমাণ করতে পারবে না।”

ওই সাংবাদিক আরও বলেন, একাত্তর টিভির প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত থাকলেও, তার মালিকানাধীন একাত্তর টেলিভিশনে বিএনপি-জামায়াত মতাদর্শের সাংবাদিকদের সংখ্যা গুণে শেষ করা যাবে না। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছর তারা দাপটের সঙ্গেই কাজ করেছেন।

মূলত যুদ্ধাপরাধীর বিচার, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সাজা কার্যকর, জামায়াতের ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের ‘নানা ষড়যন্ত্রের’ বিষয়ে সরব থাকায় একাত্তর টেলিভিশনকে লক্ষ্যে পরিণত করা হয়েছে বলেই এই সাংবাদিকের ধারণা।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, শাপলা চত্বর অভিযানে বহু মাদ্রাসা ছাত্রের নিহতের তালিকা প্রকাশ করেছিল হেফাজতে ইসলাম। সেসময় একাত্তর টিভি সেই তালিকা ধরে খুঁজে বের করেছিল- নিহতদের তালিকায় নাম থাকা বেশির ভাগ জীবিত।

একাত্তর টিভির একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলেছে দ্য সান ২৪। যদিও এই সাংবাদিকের নাম কোনো তালিকায় আসেনি, বা মামলার অভিযোগ নেই, তবে ৫ আগস্টের পর চাকরি হারিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, “এখন যদি প্রধান উপদেষ্টা সংবাদ সম্মেলন করেন, আর তখন সাংবাদিকরা মুহাম্মদ ইউনূসের প্রশংসা করে প্রশ্ন করে তবে কী সাংবাদিকের দোষ হবে? রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রশংসা করা তো কোনো অপরাধ নয়। যদি এসব সাংবাদিক দুর্নীতি করে অনিয়ম করে তাহলে সেই মামলায় তাদের বিচার হতে পারে। হত্যা মামলা দিয়ে কেন হয়রানি?”

“যখন সরকারের কাছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো প্রমাণ নেই, তখনই মিথ্যা মামলা দিয়ে নির্যাতন করা হয়। এমন নজির আগেও ছিল, এখনও আছে,” যোগ করেন তিনি।

‘ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের’ একজন শীর্ষ নেতা কথা বলেছেন দ্য সান ২৪ এর সঙ্গে। তিনিও নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।

তার ভাষ্য, “অনেক দিন আত্মগোপনে থাকার পর প্রকাশ্যে এসেছি। এখন যদি স্বনামে সমালোচনা করি তাহলে মব অথবা মামলার আসামি হয়ে কারাগারে বন্দী থাকতে হবে।”

ওই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বলেন, “অন্তবর্তী সরকারের প্রশাসনে বড় হাত রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর। এই দলের পরামর্শে বা নির্দেশে সচিব থেকে জেলা প্রশাসক-এসপি পদায়ন করা হয় বলে আলোচনা রয়েছে। জামায়াতের গ্রিন সিগন্যাল না পেলে কেউ বড় পদে বসতে পারে না। এটি যে সত্য তা বারবার বলে আসছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে এমন সুসময় আর পায়নি জামায়াত।”

তিনি আরও বলেন, “নারী সাংবাদিক ফারজানা রুপাকে কনডেম সেলে বন্দী রাখা হয়েছিল। অথচ মৃত্যুদণ্ডাদেশ চূড়ান্ত হওয়ার আগে আসামিদের কনডেম সেলে বন্দি রাখা অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করেছিলেন হাইকোর্ট। সেটিও মানা হচ্ছে না। কতোটা প্রতিহিংসা থাকলে সাংবাদিককে কনডেম সেলে রাখা হয়।”

দেশে আইনের শাসন থাকলে এমনটি হওয়ার কথা ছিল না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

“যদি তারা অপরাধীও হয় তবুও তাদের আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার আছে,” বলেন তিনি।

আরও পড়ুন