বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলে ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার চিঠি

ভারতে নির্বাসিত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: রয়টার্স
ভারতে নির্বাসিত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: রয়টার্স

জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা রয়েছেন ভারতে। আওয়ামী লীগ সভাপতির অনুপস্থিতিতে তার বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় হয় মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। সেই বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলে এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চিঠি দিয়েছেন তিনি।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ল ফার্ম কিংসলি ন্যাপলি গত ৩০ মার্চ এই চিঠি পাঠায় বলে দাবি করেছে আওয়ামী লীগ। দলটির কেন্দ্রীয় নেতা, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত এই চিঠি পাঠানোর কথা বিবিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেছেন।

চিঠিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিলের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠন করেছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এই আদালতে যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষনেতাদের পাশাপাশি বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীরও ফাঁসির রায় হয়েছিল।

২০২৪ সালে অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার এই ট্রাইব্যুনালে করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে প্রধান প্রসিকিউটর নিয়োগ করা হয় তাজুল ইসলামকে, যিনি এই ট্রাইব্যুনালেই দশককাল আগে জামায়াত নেতাদের আইনজীবী ছিলেন।

গণহত্যার অভিযোগে করা প্রথম মামলায় ২০২৫ সালের নভেম্বরে ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে রায় দেয়। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদার নেতৃত্বাধীন সেই আদালতের রায়ে শেখ হাসিনাকে দেওয়া হয় মৃত্যুদণ্ড।

ইউনূস সরকারের আমল থেকে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এই রায়কে সাজানো বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তারপর নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর চার মাস বাদে এই বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলে চিঠি পাঠালেন শেখ হাসিনা।

লন্ডনের আইনি প্রতিষ্ঠান কিংসলি ন্যাপলির ইমেইলে পাঠানো ১০ পৃষ্ঠার এই চিঠিতে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতে দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনার বিচার প্রক্রিয়াটি ছিল অবৈধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি।

শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার মাধ্যমে ন্যায্য বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। প্রসিকিউশন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ছিল বলেও তার অভিযোগ।

২০২৪ সালের ঘটনাবলিকে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে আওতায় নেওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শেখ হাসিনা।

ট্রাইব্যুনালকে ১৪ দিনের মধ্যে এই চিঠির জবাব দেওয়ার অনুরোধও জানিয়েছে ব্রিটিশ ল’ ফার্মটি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এখনও এই চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। তবে ট্রাইব্যুনালের বর্তমান প্রধান প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, চিঠির খবরটি তিনি সংবাদ মাধ্যমে দেখেছেন।

এই চিঠির গুরুত্ব কতটা?

শেখ হাসিনার পক্ষে যুক্তরাজ্যের ল ফার্মের পাঠানো এই চিঠির আইনি গুরুত্ব নিয়েও পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত রয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া মনে করেন, এই চিঠির কোনো আইনি ভিত্তি নেই।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, এমন চিঠি যে কেউ পাঠাতেই পারেন। কিন্তু বিচার নিয়ে চ্যালেঞ্জ করতে হলে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই করতে হবে। এক্ষেত্রে আপিলের সুযোগ রয়েছে। তবে পলাতক থাকা অবস্থায় আপিলের কোনো সুযোগ নেই।

তিনি আরো বলেন, “একজন পর্যবেক্ষক যদি মনে করে যে বিচারের ক্ষেত্রে কাউকে পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়নি, এটি বলাতে তো কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু এখানে লিগাল ইমপ্লিকেশনের কিছু নেই।”

তবে সরকার পরিবর্তনের পর এই চিঠি পাঠানোর মধ্যে নানা ইঙ্গিত দেখতে পাচ্ছেন অনেকে। আইনজ্ঞ কেউ কেউ মনে করছেন, এর মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আইনি প্রশ্ন তুলে রাখলেন শেখ হাসিনা, যা পরবর্তী সময়ে কাজে লাগতে পারে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads