ইউনূস সরকারের পতনের ডাক শেখ হাসিনার, বললেন, ‘সে বিশ্বাসঘাতক’

ভারতে নির্বাসিত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: রয়টার্স
ভারতে নির্বাসিত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: রয়টার্স

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের পতনের ডাক দিয়ে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বিদেশি শক্তির এই সেবাদাস পুতুল সরকারকে’ অবশ্যই উৎখাত করতে হবে।

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রায় দেড় বছর পর প্রথমবারের মতো শুক্রবার ২৩ জানুয়ারি কোনো অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিলেন তিনি। শুক্রবার দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহেরও কম সময় আগে শেখ হাসিনার এই বক্তব্য এলো।

“বাংলাদেশে গণতন্ত্র রক্ষা করুন” শীর্ষক ওই অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। তবে তার রেকর্ড করা অডিও বার্তা প্রচার করা হয়, যাতে মুহাম্মদ ইউনূসকে রীতিমতো ‘তুলোধুনো’ করতে শোনা যায়।

শেখ হাসিনা বলেন, দেশে চলমান সহিংসতা ও আইনহীনতার অবসান ঘটাতে হবে এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নারী ও সমাজের সবচেয়ে দুর্বল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে তিনি তার সরকারের পতনের পর থেকে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর বিষয়ে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি ‘নতুন ও নিরপেক্ষ তদন্ত’ পরিচালনার দাবি জানান।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্রনেতৃত্বাধীন ব্যাপক আন্দোলনের মুখে বাংলাদেশ ছাড়ার পর থেকে ভারতে স্বেচ্ছানির্বাসনে রয়েছেন।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তাতে আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। বৃহস্পতিবার নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর এক দিন পর তার সেই পরিচিত ঝাঁজালো বক্তব্য শুনলো বাংলাদেশে থাকা তার অনুসারীরা।

বক্তব্যে মুহাম্মদ ইউনূসকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী।

ইউনূসকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত, ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যায়িত করে শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে ইউনূস সরাসরি জড়িত ছিলেন।

“এই জাতীয় শত্রুর বিদেশি প্রভুদের সেবাদাস পুতুল সরকারকে যেকোনো মূল্যে উৎখাত করতে হবে। লাখো শহীদের রক্তে লেখা সংবিধান রক্ষা ও পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এই মুহূর্তে সবাইকে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

দেশকে সংকট থেকে উত্তরণে আপামর জনসাধারণকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

বিদেশে অবস্থানরত দলীয় সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোর মতো এবারও শেখ হাসিনা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।

বক্তব্যে গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে একত্র হয়ে একটি কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার আহ্বান জানান। একইসঙ্গে আহ্বান জানান “খুনি ফ্যাসিস্ট ও তার সহযোগীদের বিশ্বাসঘাতক চক্রান্তের” বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার।

এদিনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনা পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেন। এর মধ্যে প্রধান দাবি হলো, ‘অবৈধ ইউনূস প্রশাসন অপসারণের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা’।

তার ভাষায়, ইউনূস চক্রের ছায়া যতদিন জনগণের ওপর থাকবে, বাংলাদেশ কখনোই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে পাবে না।

দেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার পাশাপাশি অর্থনীতিকে গতিশীল করতে সহিংসতা প্রতিরোধ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান তিনি।

পাশাপাশি ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নারী ও কন্যাশিশু এবং সমাজের দুর্বল জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর নিশ্চয়তার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, সাংবাদিক, আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ভয় দেখানো, চুপ করানো ও কারাবন্দি করার জন্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আইনি হয়রানি চালানো হচ্ছে। এসব বন্ধ করে বিচারব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, জাতীয় পুনর্মিলন ও ক্ষত নিরাময়ের স্বার্থে এবং প্রতিশোধপরায়ণতার রাজনীতি পরিহার করে গত এক বছরের ঘটনাবলির ওপর জাতিসংঘের অধীনে একটি নতুন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি।

শেখ হাসিনার এই বক্তব্য মূলত আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে জিইয়ে রাখার একটি মরিয়া প্রচেষ্টা বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন।

ধারণা করা হচ্ছে, নির্বাচনে বিএনপি সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে এবং কট্টরপন্থী জামায়াতে ইসলামীরও উল্লেখযোগ্য উত্থান ঘটতে পারে। যদিও আওয়ামী লীগের এখনো বড় একটি সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে, তবে দলের অধিকাংশ শীর্ষ নেতা বর্তমানে ভারত ও ইউরোপে নির্বাসনে রয়েছেন।

ইউনূসের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি ও বিদেশি চক্রের ‘নৃশংস আক্রমণ’ ঠেকাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন।

তার ভাষায়, ইউনূস একজন সুদখোর, অর্থপাচারকারী, লুটেরা, দুর্নীতিগ্রস্ত ও ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক, যিনি তার সর্বগ্রাসী নীতির মাধ্যমে জাতিকে নিঃস্ব করে দিয়েছেন এবং দেশের আত্মাকে কলুষিত করেছেন।

শেখ হাসিনা দাবি করেন, ২০২৪ সালের আগস্টে ইউনূস ও তার রাষ্ট্রবিরোধী সশস্ত্র সহযোগীরা সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তার সরকার উৎখাত করে দেশকে ‘সন্ত্রাসের যুগে’ ঠেলে দিয়েছে। যদিও বক্তব্যে এই দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।

তার ভাষায়, বর্তমানে গণতন্ত্র নির্বাসনে, মানবাধিকার পদদলিত, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ধ্বংসপ্রাপ্ত, নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা ও যৌন নিপীড়ন নিয়ন্ত্রণহীন এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নিয়মিত নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে।

অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের আরও কয়েকজন নেতা বক্তব্য দেন। তাদের মধ্যে ছিলেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।

তারাও ইউনূসের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ধরে বলেন, আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়া আসন্ন নির্বাচন কোনোভাবেই অবাধ ও সুষ্ঠু হতে পারে না।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে শেখ হাসিনা একাধিকবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিও বার্তার মাধ্যমে ইউনূস সরকারের সমালোচনা করে আসছেন।

এদিকে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের একটি আদালত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার তার প্রত্যর্পণের জন্য দেনদরবার চালিয়ে গেলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি ভারত সরকার।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads