গত বছর অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের বিদায়ের পর পরিবর্তিত দেশকে ‘নতুন বাংলাদেশ’ই বলছেন ক্ষমতায় বসা মুহাম্মদ ইউনূস। পাল্টে যাওয়া সেই দেশে এখন বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসই উল্টে দেওয়ার আয়োজনই চলছে।
গত বছর অভ্যুত্থানের পর আক্রান্ত হয়েছিল স্বাধীনতার স্মারকগুলো। সাত মাস পর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি। এরপর এবার শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ও বিজয় দিবসে ফুটে উঠল ইতিহাস পাল্টে দেওয়ার লক্ষণ।
আর তাতে সামনে থাকছে অভ্যুত্থানের পর নিষেধাজ্ঞার খাঁড়া থেকে বেরিয়ে আসা জামায়াতে ইসলামী, যে দলটি ১৯৭১ সালে ঘোষণা দিয়েই বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থানই শুধু নেয়নি, পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হয়ে গণহত্যায়ও নেমেছিল।
জামায়াত এখন প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় চলে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলে গেছে তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের করায়াত্তে, যে সংগঠনটির আগের নেতারা আল বদর বাহিনী গঠন করে একাত্তরে বুদ্ধিজীবীদের হত্যায় নেমেছিল।
কিন্তু গত ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান দাবি করেন, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে পাকিস্তানি বাহিনী জড়িত ছিল না।
তিনি যুক্তি দেখান, “যে সময় আমি (পাকিস্তানি বাহিনী) দেশ থেকে পালানোর জন্য চেষ্টা করছি, আমি জীবিত থাকব না মৃত থাকব, সে বিষয়ে কোনো ফয়সালা হয়নি, সে সময় পাকিস্তানি যোদ্ধারা বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করবে, এটি আমি মনে করি রীতিমতো অবান্তর।”
মুক্তিযুদ্ধে ৩০ শহীদের সংখ্যাটি নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমরা সত্যিকারভাবে বাংলাদেশে কী ঘটেছিল ১৯৭১ সালে, সেই ঘটনায় কারা কারা শহীদ হয়েছেন, সেই তথ্য আমরা জানতে চাই। কারা কারা হত্যা করেছে, সেই তথ্য এখন পর্যন্ত আমাদের জানা হয়নি।”

একই দিন পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের অনুষ্ঠানের কলেজ ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক মামুন আল হাসান যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত জামায়াত নেতা গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামীকে স্বাধীনতাযুদ্ধে এ দেশের সূর্যসন্তান বলে দাবি করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী ও আব্দুল কাদের মোল্লাকে রাজাকার হিসেবে চিত্রিত করে আঁকা ছবি মুছে দেয়া হয়।
সেদিনই জামায়াতের বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া মো. গোলাম পরওয়ার বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠনের প্রস্তাব তোলেন।
একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে পাশে দাঁড়ানো ভারতকে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করে তিনি বলেন, “যাদেরকে হত্যা করা হয়েছিল, তারা স্বাধীনতার স্বপক্ষে হলেও ভারতবিরোধী ছিল।”
এরপর বিজয় দিবসেও ইতিহাস পাল্টে দিতে নানা স্থানে জামায়াতের নানা তৎপরতা দেখতে পাওয়া যায়।
লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে মঞ্চস্থ ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্পে রাজাকারের পাঠ’ নাটকে বাধা দেন জামায়াতের নেতারা। নাটকে নারী নির্যাতনের দৃশ্যে রাজাকারের চরিত্রে পাঞ্জাবি-টুপি পরে অভিনয় কর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা হয়েছে অভিযোগ তুলে আপত্তি জানান তারা।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়ে লেখা ইতিহাসের একটি বড় অংশ ‘মিথ্যা বয়ান দিয়ে লেখা হয়েছে’ বলে মন্তব্য করেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের অনুষ্ঠানে তিনি এই মন্তব্য করেন।
সেই অনুষ্ঠানে ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশের (আপ বাংলাদেশ) প্রধান সমন্বয়কারী রাফে সালমান রিফাত বলেন, “১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত নানা উত্থান–পতনের মধ্য দিয়ে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মাধ্যমে আমরা নতুন বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি পেয়েছি।”
তার মধ্যে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব আবু আল ইউসুফ খান (টিপু) এক অনুষ্ঠানে বলেন, “১৪ ডিসেম্বর তো কোনো আলবদর–আলশামস আমাদের বুদ্ধিজীবীদেরকে হত্যা করেন নাই। পার্শ্ববর্তী কোনো এক দেশের লোকেরা পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যে যুদ্ধ বেঁধেছিল, সেটাকে টার্গেট করে আমাদের বুদ্ধিজীবীদেরকে হত্যা করা হয়েছিল।”
তবে আওয়ামী লীগশূন্য রাজনীতির মাঠে বিএনপি ও জামায়াত এখন বিরোধী শিবিরে। বিএনপি নেতারা এখন জামায়াতের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে কথা বলছেন।
বিজয় দিবসে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, “যারা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল, তারা আজ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চায়।”
কিন্তু মির্জা ফখরুল এ কথাটি বলেননি, কারা তাদের মাথাচাড়া্ দিয়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছে। একাত্তরে পাকিস্তানের পক্ষে সাফাই গাইতে জাতিসংঘে যিনি গিয়েছিলেন, তাকে কে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিল, একাত্তরে আল বদর বাহিনীর দুই শীর্ষনেতার গাড়িতে কে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছিল, বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধী জামায়াতকে কে জোটে রেখে রাজনীতিতে জমিন করে দিয়েছিল, সেই কথাটি ফখরুল বলেননি।
এ সম্পর্কিত আরও খবর:



