বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি কি থাকবে?

একাত্তরে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে বাংলাদেশের নারীদের নির্যাতনের চিত্র ফুটিয়ে তুলে এই ম্যুরাল ছিল মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে। ফাইল ছবি।
একাত্তরে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে বাংলাদেশের নারীদের নির্যাতনের চিত্র ফুটিয়ে তুলে এই ম্যুরাল ছিল মুজিবনগর স্মৃতিসৌধে। ফাইল ছবি।

স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়েছিলেন একাত্তরে নির্যাতিত নারীরা; যারা দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজেদের সর্বস্ব হারিয়েও ছিলেন বঞ্চনার স্বীকার।

আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৫ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করে এই বীরাঙ্গনাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে অধিষ্ঠিত করেছিল।

তার এক দশক পর মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসে এখন মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা আবার পরিবর্তন করতে যাচ্ছে। তাতে এই নারীদের বঞ্চনার বৃত্ত আবার ফিরে আসার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নতুন সংজ্ঞায় শুধু যারা অস্ত্র হাতে সরাসরি লড়াই করেছেন, তাদেরই মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা এরই মধ্যে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম, যিনি নিজেও একজন বীর প্রতীক খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধা।

মুক্তিযোদ্ধােদের তালিকায় আসা শব্দ সৈনিক, কণ্ঠ সৈনিক, ক্রীড়া সৈনিক সবাইকে নতুন তালিকায় সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে রাখার কথা বলেছেন তিনি।

তবে বীরাঙ্গনাদের বিষয়ে স্পষ্ট করে তিনি কিছু না বললেও নতুন সংজ্ঞা যেভাবে হচ্ছে, তাতে বীরাঙ্গনারা মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

পরিচয় প্রকাশ না করে সম্প্রতি কালের কণ্ঠে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত খসড়ার সংজ্ঞায় মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী এবং বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে এই বিষয়ে সরকারি কোনো ভাষ্য মেলেনি; মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টার কথায়ও তা স্পষ্ট হওয়া যাচ্ছে না।

১৯৭১ সালে যে সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে, তা জনযুদ্ধ হিসাবেই স্বীকৃতি। অর্থাৎ পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বিপরীতে তা ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আপামর বাঙালির লড়াই।

স্বাধীনতার পর অস্ত্র হাতে লড়াইয়ে থাকাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তখন ২ লাখ মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নারীর সংখ্যা ছিল কেবল ২০৬ জন। ফারুক-ই আজমের মতো খেতাবপ্রাপ্ত ৬৭৬ জন মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে নারী ছিলেন মোটে ৩ জন।

নয় মাসের এই যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনীর হাতে সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন অন্তত ২ লাখ নারী। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই নারীদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে তাদের বীরাঙ্গনা খেতাব দিয়েছিলেন।

সরকারি হিসাবে বীরাঙ্গনার সংখ্যা ২ লাখ হলেও বেসরকারি বিভিন্ন হিসাবে সংখ্যাটি ৬ লাখের মতো বলা হয়। সামাজিকভাবে হেনস্তা হওয়ার ভয়ে অনেকে নিজেদের বেদনা প্রকাশও করতে চাননি।

২ লাখেরও কথা বললেও সবার নাম-ঠিকানা সরকারিভাবে সংরক্ষিত হয়নি। তাদের সমাজেরপ্রতিষ্ঠিত করতে বঙ্গবন্ধু একটি প্রকল্প হাতে নেন, গড়ে তোলেন মহিলা পুনর্বাসন কেন্দ্র। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্র ক্ষমতার পালাবদলে সেই প্রকল্পও বন্ধ হয়ে যায়।

বীরাঙ্গনারা থেকে যান তিমিরেই; সামাজিকভাবে হেয় করা, হেনস্তা করা চলতেই থাকে তাদের নিয়ে, ‘বারাঙ্গনা বা পতিতা’ বলে তাদের অপদস্থও হতে হয়।

একাত্তরে নির্যাতিত এই নারীদের স্বীকৃতির দাবিতে ২০১৪ সালে হাই কোর্টে একটি রিট আবেদন হলে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সরকারেরও তার ওপর নজর পড়ে।

পরের বছর আওয়ামী লীগ সরকার বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধার সম্মান দিতে সংসদে প্রস্তাব পাস করে। এরপর ২০১৬ সালে মুক্তিযোদ্ধার নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করে ২০১৮ সালে ‘মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আইন’ সংশোধনের পর তা সংসদে পাস করা হয়।

২০২২ সালে হওয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ কাউন্সিল (জামুকা) আইনেও মুক্তিযোদ্ধার নতুন সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়। তাতে রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের পাশাপাশি একাত্তরে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী বাংলাদেশি নাগরিক, মুক্তিযুদ্ধকালীন গঠিত বাংলাদেশ সরকারের (মুজিবনগর সরকার) অধীন কর্মকর্তা-কর্মচারী-দূত, মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব এমএনএ বা এমপিএকে মুক্তিযোদ্ধা গণ্য করার কথা বলা হয়।

সেই সঙ্গে নির্যাতিতা সব নারী (বীরাঙ্গনা), স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ও কলাকুশলী, দেশ ও দেশের বাইরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশি সাংবাদিক, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের খেলোয়াড় এবং মুক্তিযুদ্ধকালে আহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা দেওয়া মেডিকেল টিমের চিকিৎসক, নার্স ও সহকারীদেরও মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় আনা হয়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধার তালিকা সব সরকার আমলেই বিতর্কিত একটি বিষয় হয়ে থেকেছে। মুক্তি সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগ সরকার আমলেও এই বিতর্ক সমানভাবেই ছিল।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। আর এই উদ্যোগের অংশ হিসাবেই নতুন সংজ্ঞা ঠিক করতে চাইছে তারা।

সম্প্রতি বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজেদের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম বলেন, সরকার রণাঙ্গনের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ও সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করার কাজ করছে।

দুটি আলাদা করার ক্ষেত্রে তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন, “যেসব কৃষক-শ্রমিক, সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, নৌ কমান্ডো, আনসার, ইপিআর যুদ্ধ করেছে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে তাদের মর্যাদা কখনো সীমান্ত পাড়ি দেওয়া কিংবা বিদেশে বসে আরাম আয়েশে জনমত সৃষ্টির প্রচারণা চালানো, ফুটবল খেলোয়াড়, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গান গাওয়া মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা এক হতে পারে না।

“তাই মন্ত্রণালয় মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়া অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের ‘সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা’ হিসাবে চিহ্নিত করার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছে।”

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনার পরই এবিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে বলে ফারুক-ই-আজম জানান।

নতুন সংজ্ঞায় যারা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধ করেছেন, তারা মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতি পাবেন।

যারা বিদেশে জনমত তৈরির প্রচার চালিয়েছেন, স্বাধীন বাংলা ফুটবল টিমের খেলোয়াড়, স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী, সাংবাদিক, চিকিৎসক, নার্স, চিকিৎসা সহকারীসহ যারা মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় রয়েছেন, তাদের সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতির বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান উপদেষ্টা।

সাক্ষাৎকারে তিনি বীরাঙ্গনাদের নাম উল্লেখ না করলেও ‘সহ’ বলে যা বোঝাতে চেয়েছেন, তাতে নারীদের মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ পড়ার সম্ভাবনােই প্রবল হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন