‘মবের মুল্লুকে’ আক্রান্ত লতিফ সিদ্দিকীরা কারাগারে, আক্রমণকারীরা বাইরে

শুক্রবার আদালতে তোলা হয় লতিফ সিদ্দিকীকে।
শুক্রবার আদালতে তোলা হয় লতিফ সিদ্দিকীকে।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পর সরকারশূন্য হয়ে পড়ে বাংলাদেশ; সেই সঙ্গে পুলিশশূন্যতা পরিস্থিতি আরও ভীতিকর করে তুলছিল। তিন দিন পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলেও ‘মব’ সৃষ্টি করে একের পর এক আক্রমণের ঘটনায় রসিকতা করে অনেকে দেশকে ‘মবের মুল্লুক’ বলছিলেন।

প্রথমে আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়ি, ঘর, অফিসে এই ধরনের হামলা হচ্ছিল; পরে তা মাজারে হামলা, নারীদের খেলতে দিতে বাধা, গানের অনুষ্ঠানে বাধার দিকে গড়ায়। ইউনূস সরকার বিবৃতি দিয়ে নিন্দা জানিয়েই তার দায়িত্ব সারছিল, যার ফলে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়িটিও রেহাই পায়নি মবের হাত থেকে।

এই ধরনের ঘটনা কিছুটা কমে এলেও বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বর্ষীয়ান রাজনীতিক লতিফ সিদ্দিকীসহ মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলার পর ‘মবের মুল্লুক’ কথাটি সোশাল মিডিয়ায় অনেকের লেখায় আবার ফিরে এসেছে।

ওই ঘটনার যারা আক্রান্ত হয়েছিলেন, লাঞ্ছিত হয়েছিলেন, সেই লতিফ সিদ্দিকীসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে তাদের শুক্রবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অথচ যারা হামলা চালাল, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি পুলিশ। ফলে অভিযোগ উঠছে, অন্তর্বর্তী সরকার যে মবকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, তা ফুটে উঠল এই ঘটনায়।

লতিফ সিদ্দিকী তার রাজনৈতিক জীবনের বড় সময়টাজুড়ে আওয়ামী লীগে ছিলেন, এই দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন তিনি। মন্ত্রীও হয়েছিলেন শেখ হাসিনার সরকারে।

২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে মন্ত্রিত্ব খোয়ানোর পর রাজনীতিতে খুব বেশি সক্রিয় তিনি ছিলেন না। ২০১৮ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে হেরে গিয়েছিলেন, তবে গত বছর স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জিতে যান।

কিন্তু তার এই পঞ্চম বারের সংসদ সদস্যপদ টিকে ছিল মাত্র সাত মাস; কারণ গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানের পর সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর আওয়ামী লীগের অনেকে আক্রান্ত হলেও লতিফ সিদ্দিকী অক্ষতই ছিলেন।

বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠন ‘মঞ্চ ৭১’ আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিতে গিয়েছিলেন তিনি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান রক্ষার দাবি তুলে এই সংগঠনটি গড়ে তুলেছেন গণফোরামের নেতা আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বীর প্রতীক এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না।

ওই অনুষ্ঠানে লতিফ সিদ্দিকী ছাড়াও ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন, সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান, সাবেক ছাত্রনেতা আব্দুল্লাহিল কাইয়ুমসহ বেশ কয়েকজন।

সভা চলার মধ্যেই ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয় দিয়ে একদল ঢুকে পড়ে অনুষ্ঠানস্থল রিপোর্টার্স ইউনিটির মিলনায়তনে। তারা ‘জুলাইয়ের হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার’, ‘লীগ ধর, জেলে ভর’ স্লোগান দিয়ে ওই অনুষ্ঠানের অতিথিদের ঘিরে ফেলে। এসময় লতিফ সিদ্দিকীসহ কয়েকজনের গায়ে হাত দিয়ে আঘাতও করা হয়।

লাঞ্ছিত লতিফ সিদ্দিকীসহ ১৬ জনকে পুলিশ গিয়ে উদ্ধার করে নিয়ে যায় মিন্টো রোডে গোয়েন্দা পুলিশের দপ্তরে। দুপুরে তাদের নেওয়ার পর রাতে তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী ্আইনে মামলার খবর জানায় পুলিশ।

শুক্রবার তাদের সবাইকে ঢাকার আদালতে নেওয়া হলে তাদের কারাগারে পাঠিয়ে দেন বিচারক। লতিফ সিদ্দিকী জামিনের আবেদন করতেই রাজি হননি বলে জানান আইনজীবীরা। তিনি বলেছেন, আদালতের এখন জামিন দেওয়ার ক্ষমতাই নেই। অধ্যাপক কার্জনসহ অন্যরা জামিনের আবেদন করলেও তা নাকচ হয়ে যায়।

এই ঘটনার পর থেকে সোশাল মিডিয়ায় তুমুল আলোচনা চলছে যে আক্রান্ত লতিফ সিদ্দিকীদের মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হলো; অথচ আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কোথায়?

লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে মামলার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “লতিফ সাহেবের বক্তৃতা দেখলাম, যেই ব্যানারে আসছে, সেই ব্যানারটা দেখলাম। এছাড়া তাদের কলাম-বই এসব অ্যানালাইসিস করে দেখলাম, একটা নির্দিষ্ট দিকে যাচ্ছে। তারা যে সমস্ত বক্তৃতা-বিবৃতি দিচ্ছে, তা রাষ্ট্রের অবস্থানের সাথে কন্ট্রাডিক্টরি।”

মামলায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে বলা হয়েছে, “আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী মঞ্চ ৭১ এর ব্যানারকে পুঁজি করে প্রকৃতপক্ষে দেশকে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অস্থিতিশীল করে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্র ও উপস্থিত অন্যদের প্ররোচিত করে বক্তব্য প্রদান করছিলেন।”

যদিও লতিফ সিদ্দিকী এই সভায় কথা বলারই সুযোগ পাননি। অধ্যাপক কার্জনের বক্তব্য শেষ হওয়ার পরপরই চড়াও হয় ওই ব্যক্তিরা। তারা আলোচনায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের গালাগালির পাশাপাশি টানা-হেঁচড়া, মারধর, এমনকি গলাও চেপে ধরেন।

লতিফ সিদ্দিকীসহ অন্যদের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছেন শাহবাগ থানার এসআই আমিরুল ইসলাম।

তাহলে মব সৃষ্টি করে লতিফ সিদ্দিকীদের যারা হেনস্থা করল, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন- বিবিসি বাংলা জানতে চাইলে শাহবাগ থানার ওসি মো. খালিদ মনসুর বলেন, “পাবলিক বা কেউ একজন অভিযোগ করলে তাকে বাদী হয়ে মামলা করতে হবে।”

বিক্ষোভকারীরা নিজেদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে পরিচয় দিলেও সেখানে জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় এক নেতাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় দেখা গেছে। তার নাম শামীম হোসেন।

তবে জামায়াতের পল্টন থানার আমির শাহীন আহমেদ খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, “সেখানে জামায়াতের কেউ থাকতে পারেন। তবে তারা কেউ জামায়াতের কর্মী হিসেবে নয়, বরং জুলাইকে ধারণ করে গেছেন।”

মব সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেন ‘মঞ্চ ৭১’ এর উদ্যোক্তাদের একজন আইনজীবী জেড আই খান পান্না।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক মন্ত্রী-এমপি এবং বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকীর সঙ্গে যে আচরণ করেছে, সেটা অচিন্তনীয়।

“আমি ফুটেজ দিয়ে দেখাইতে পারব, যে লোকটা এটা লিড দিছে, সে জামায়াতের আমিরের পেছনে আরেকটা ছবিতে আছে। যারা স্বাধীনতাবিরোধী, যারা একাত্তরকে সহ্য করতে পারে না, যারা একাত্তরের পরাজয় মেনে নিতে পারেনি, যারা স্বাধীনতা মেনে নিতে পারেনি, তারাই এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।”

পুলিশের দীর্ঘ সময় নেওয়ার দিকটি দেখিয়ে অ্যাডভোকেট পান্না বলেন, মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলাপ করে পুলিশ মামলা করেছে। তার মানে রাষ্ট্রব্যবস্থার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাও চায় না ৭১’র নামে কিছু হোক।

আগে যেমন পুলিশকে রাজনৈতিভাবে ব্যবহার করা হতো, অভ্যুত্থানেও পরও পরিস্থিতি কিছুই বদলায়নি বলে মত দিচ্ছেন অনেকে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ পুলিশ বাহিনীর ভঙ্গুর হয়ে পড়ার দিকটিও দেখিয়ে বিবিসি বাংলােক বলেন, “৫ই অগাস্ট ঘিরে পুলিশের ওপর হামলা হলো, থানায় হামলা হলো, মেরে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো, এগুলোর ব্যাপারে আপনি ইনডেমনিটি দিয়ে বলে দিলেন বিচার হবে না, পুলিশের মনোবল তো ওখানেই ভেঙে গেছে।”

এই ঘটনায় ‘অতীতের ফ্যাসিস্ট শাসনের পুনরাবৃত্তি’ দেখার কথা বলছেন ওই অনুষ্ঠানে থাকা সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান।

তিনি বলেন, “৫ই অগাস্টের পরে আমি একটা প্রবণতা লক্ষ্য করছি- মুক্তিযুদ্ধ, ৭১, মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ, জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা- এগুলোকে কোনো একটা পক্ষ থেকে এবং বেশ শক্তিশালী পক্ষ– তারা এটাকে ম্লান করে দেয়ার চেষ্টা করছেন।”

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিকও একই সুরে বলেন, “মুক্তিযুদ্ধ এবং সংবিধানকে সব মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দলীয়ভাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। এগুলো এসব কিছুরই বহিঃপ্রকাশ।”

“সার্বিকভাবে বিচারব্যবস্থা যে ভঙ্গুর হয়ে গেছে, এই ঘটনা সেটারই প্রতিফলন। আগে যেমন কিছু হলেও বিএনপির বিরুদ্ধে মামলা হতো, এখন বিএনপির জায়গায় আওয়ামীপন্থি হিসেবে আখ্যায়িত করে মামলা হচ্ছে। এখন সেটা আরও বেশি হচ্ছে,” বলেন তিনি।

মব যারা তৈরি করল, তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে যারা হেনস্থার শিকার হলেন, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়ায় ‘ভুল বার্তা যাচ্ছে’ বলে মন্তব্য করেন মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে যে মামলা-মোকদ্দমা বা যে বয়ান আমরা শুনতাম, একই বয়ান আজকে শোনা দুঃখজনক। গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিটের সাথে এটা যায় না।”

এ সম্পর্কিত আরও খবর:

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads