টানছে জামায়াত, এনসিপি কি ভাঙছে

জাতীয় নাগরিক পার্টির শীর্ষনেতারা। ফাইল ছবি
জাতীয় নাগরিক পার্টির শীর্ষনেতারা। ফাইল ছবি

জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) গৃহদাহ এখন দলটির ভেঙেচুরে পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এরই মধ্যে শীর্ষ স্তরের দুজন নেতা পদত্যাগ করেছেন, যাদের শাপলা কলির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। পদত্যাগ করেছেন আরো কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা।

এসবই মোটামুটি একটি বিষয় নিয়ে। তা হলো জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠনের আলোচনা। এই আলোচনা যতই এগোচ্ছে, এনসিপি ততই পিছিয়ে পড়ছে। ওয়ান-ইলেভেনের পর বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল গড়ে তোলা হয়েছিল, কিন্তু কোনোটিই টেকেনি, নতুন ‘কিংস পার্টি’ এনসিপিরও কি একই দশা হয় কিনা, এখন সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে অনেকের মনে।

শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে গত বছর যে অভ্যুত্থান হয়েছিল, তাতে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণরা এবছরের ফেব্রুয়ারিতে এনসিপি নামে নতুন দল গঠন করে। এরপর অনেকটা চাপাচাপি করেই শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন আদায় করে।

কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এনসিপিতে দেখা যায় চাঞ্চল্য। আসন সমঝোতা নিয়ে বিএনপি ও জামায়াত উভয়ের সঙ্গে দেন-দরবারে নামে দলটি। কিন্তু জামায়াতের প্রতিই টান বেশি দেখা যাচ্ছে। আর তাতেই বেঁধেছে গোল।

অভ্যুত্থানের সময় যারা নেতৃত্বে ভূমিকায় ছিলেন, পরে দেখা গেছে যে তাঁদের অনেকেই ইসলামী ছাত্রশিবিরে যুক্ত। পরিচয় গোপন করে নানা সংগঠনে এমনকি ছাত্রলীগেও তারা ছিলেন। কৌশল হিসেবে এনসিপির মধ্যেও অনেকে এখনও রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এনসিপিকে কেউ কেউ জামায়াতের ‘বি টিম’ বলেও ডাকেন।

এরমধ্যে তিনজন কেন্দ্রীয় নেতা অনিক রায়, তুহিন খান ও অলিক মৃ এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন। জামায়াতের সঙ্গে আসন বণ্টনের আলোচনা শুরুর পর দলটির যুগ্ম সদস্যসচিব মীর আরশাদুল হক। এরপর জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারাও পদত্যাগ করলেন।

আরশাদুল ও জারা দুজনকেই আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছিল এনসিপি। তাদের পর আরও অনেকে পদত্যাগ করতে পারেন বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে।

দলটির মধ্যে পদত্যাগের হিড়িক এবারই প্রথম নয়। গত কয়েক মাস ধরেই একে একে অনেকেই দল ছেড়ে নেতৃত্বের সমালোচনায় মুখর হয়েছেন, যা দেখে তখন কেউ কেউ বলেছেন- তাহলে কি এনসিপির দম ফুরিয়ে এল?

বিএনপির কাছে প্রত্যাশিত আসন ছাড় পাচ্ছে না বলেই এনসিপির জামায়াতমুখিতা বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। যদিও এনসিপির শীর্ষনেতারা মুখে বলছেন, আসন জেতা তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু তাদের কথা ও কাজে মিল না পাওয়ার কথাই বলছেন বিশ্লেষকরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ সাহান বিবিসি বাংলাকে বলেন, “বিভিন্ন জায়গা থেকে শুনে যেটা বোঝা যাচ্ছে যে তারা ভোটের হিসাব করছেন। আসন বেশি পাওয়া যাবে জামায়াতের কাছ থেকে সেই হিসাবটা করছেন।”

তার মতে, এনসিপির বিরুদ্ধে জামায়াতের ‘বি টিম’ হওয়ার যে অভিযোগ উঠেছিল, আসন সমঝোতায় গেলে সেটাই সত্যি প্রমাণিত হবে।

গত ফেব্রুয়ারিতে এনসিপির আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে যতটা সাড়া দেখা গিয়েছিল, দিন যত গড়াচ্ছে, ততই ম্রিয়মান হচ্ছে দলটি। ফাইল ছবি

এনসিপিতে বহু পথের, বহু মতের মানুষ এক হলেও এখন নেতাদের জামায়াতের প্রতি পক্ষপাত প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে বলেই দলছাড়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, কিছু লোক নিজেদের স্বার্থ আদায় করার জন্য, নিজেদের আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য এনসিপির ফোরামটাকে ব্যবহার করছে। এখন যাদের মত-পথ মিলছে না, তারা দল থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন।

এনসিপির সদস্য সচিব আখতার আহমেদের কথায়ও জামায়াতের প্রতি পক্ষপাত ফুটে ওঠে। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ঐকমত্য কমিশনে সংস্কার প্রশ্নে বিএনপির সাথেই অন্য দলগুলোর মতভিন্নতা পরিলক্ষিত হতো। সেখানে সংস্কারের পয়েন্টগুলোতে নেচারালি (স্বাভাবিকভাবেই) এনসিপি, জামায়াত এবং অন্য দলগুলো একমত হয়েছে।”

কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি নিয়ে আপত্তি তুলেছেন এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির ৩০ জন সদস্য। তারা শনিবার দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে একটি স্মারকলিপিও দিয়েছেন।

তাতে বলা হয়, “সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীসহ আট দলীয় জোটের সঙ্গে রাজনৈতিক জোট বা আসন সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে যে আলোচনা সামনে এসেছে, সে বিষয়ে আমরা স্পষ্টভাবে আমাদের আপত্তি জানাচ্ছি।”

জামায়াতের বিরুদ্ধে বিভাজনমূলক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, অন্যান্য দলের ভেতরে গুপ্তচরবৃত্তি ও স্যাবোটেজ, এনসিপির ওপর বিভিন্ন অপকর্মের দায় চাপানোর অপচেষ্টার অভিযোগ তুলেছেন তারা।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা, গণহত্যায় সহযোগিতা এবং সে সময় সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ প্রশ্নে তাদের অবস্থান বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও এনসিপির মূল্যবোধের সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক বলেও এনসিপির এই নেতারা মনে করেন।

তারা বলেন, “জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কোনো ধরনের জোট এই নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করবে এবং আমাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচনী সমীকরণ থেকে ক্ষমতার রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতেই এনসিপি জামায়াতের দিকে ঝুঁকছে।

এনসিপি যে জোট সম্প্রতি গঠন করেছে, জামায়াতের দিকে ঝুঁকে পড়লে তার ভবিষ্যৎও প্রশ্নের মুখে পড়বে। এই জোটের দল রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন এরই মধ্যে সেই কথা তুলেছে। সব মিলিয়ে এনসিপি এক ধরনের অস্তিত্বের সঙ্কটেই পড়েছে।

এ সম্পর্কিত আরও খবর:

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads