আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সারাদেশে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ধ্বংস করা হয়েছে। সরকারি অফিস এমনকি রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে নামানো হয়েছে শেখ মুজিবুর রমহানের ছবি। শুধু তাই নয়, যেসব স্থাপনায় তার নাম জড়িয়ে ছিল সেগুলোর নামও পরিবর্তন করা হয়েছে। ভেঙে ফেলা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি স্মারক ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটিও।
১৫ আগস্ট ও ১৭ মার্চ সরকারি বাতিল করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু অথবা জয় বাংলা’র স্লোগান দিলে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। মোটাদাগে বললে শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগের কোন চিহ্ন রাখতে চায় না ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পাওয়া ‘নতুন বাংলাদেশ’।
এই যখন পরিস্থিতি তখন বঙ্গবন্ধুর পরামর্শে করা একটি আদেশের প্রতি একমত বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এমনকি সদ্য আত্মপ্রকাশ পাওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় থেকেই যুক্ত হয়েছিল ৭০ অনুচ্ছেদ। আর এটি যুক্ত হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের পরামর্শে। এখন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি’র কেউ-ই এই ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল চায় না, যেখানে জাতীয় সংসদে স্বাধীন ভোটাধিকার সীমিত করা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর পরামর্শে ৭০ অনুচ্ছেদ
৭০ নং অনুচ্ছেদটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী কর্তৃক প্রবর্তিত ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ ১৯৭২’-এর ফলস্বরূপ সংবিধানে লিপিবদ্ধ হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের পরামর্শে আদেশটি জারি করেন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।
১৯৭২ সালে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কীভাবে যুক্ত হয়েছিল, তার বর্ণনা পাওয়া যায় প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের বিপুলা পৃথিবী বইয়ে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের বাংলা অনুবাদ করার দায়িত্ব ছিল অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের।
তিনি লিখেছেন, “সংবিধানের বিষয়ে পরামর্শ দিতে বঙ্গবন্ধু দুইবার ডেকে পাঠিয়েছিলেন কামালকে—সঙ্গে আমিও ছিলাম। …তিনি বলেছিলেন, পাকিস্তান আমলে সরকার অস্থিতিশীল হয়েছিল মূলত পরিষদ-সদস্যদের দল বদলের ফলে কিংবা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে দলের বিপক্ষে ভোটদানের ফলে। এটা বন্ধ করা দরকার। নির্বাচিত সদস্য যদি দলের কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত না হন কিংবা কোনো ক্ষেত্রে দলের বিরুদ্ধে ভোট দেন, তাহলে তার পদত্যাগ করা উচিত হবে কিংবা তার সদস্যপদ চলে যাবে—এমন একটা নিয়ম করা দরকার। তবে এমন ক্ষেত্রে তিনি উপনির্বাচন বা পরবর্তী কোনো নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য হবেন না, সে ব্যবস্থাও থাকতে হবে। এই অভিপ্রায়ই সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে প্রকাশ পেয়েছিল।”
৭০ অনুচ্ছেদে কী আছে
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ নং অনুচ্ছেদে জাতীয় সংসদে স্বাধীন ভোটাধিকার সীমিত করা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদটি সংসদ সদস্যদের তাদের নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখে।
তাতে বলা আছে, কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি যদি ওই দল থেকে পদত্যাগ করেন বা সংসদে ওই দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তাহলে সংসদে তার আসন শূন্য হবে।
এই বিধানের ফলে সরকারের চাওয়ার বাইরে কোনো আইন বা প্রস্তাব সংসদে পাস হওয়ার সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী বা অন্য কারও বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাস হওয়ারও সুযোগ নেই।
৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে বিতর্ক
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময় থেকেই অনুচ্ছেদটি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। যারা এর বিপক্ষে তারা বলছেন, এই অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতা খর্ব করে এবং প্রধানমন্ত্রীকে একচ্ছত্রভাবে ক্ষমতা দেয়। অন্যদিকে এটা রাখার পক্ষে যারা, তাদের যুক্তি—এই বিধান বাদ দিলে সরকারের স্থিতিশীলতা থাকবে না।
তবে স্বাধীনতার পর কোনো সরকারই ৭০ অনুচ্ছেদ পরির্বতনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। সব সরকারই বঙ্গবন্ধুর পরামর্শে করা ৭০ অনুচ্ছেদ মিনে নিয়েছে, বিশেষ করে তার দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি। এই দলগুলো দীর্ঘ সময় দেশ চালিয়েছে।
৭০ অনুচ্ছেদের ৩ বার সংশোধন
৭০ অনুচ্ছেদটিকে তিনবার সংশোধন করা হয়েছে। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদে উপস্থিত থেকে দলের পক্ষে ভোটদানে বিরত থাকা এবং দলের নির্দেশ উপেক্ষা করে সংসদে অনুপস্থিত থাকা দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার শামিল বলে গণ্য করার বিধান যোগ করা হয়েছিল।
১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনী দ্বারা রাজনৈতিক দলের কোনো গ্রুপ তৈরি করা অথবা অন্য রাজনৈতিক দলে যোগদান করলে সংসদ সদস্যপদ বাতিলের বিধান করা হয়েছিল।
সর্বশেষ পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে চতুর্থ আর দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যোগ করা শর্তগুলো বাদ দিয়ে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে প্রত্যাবর্তন করা হয়েছে। এখন শুধু দল থেকে পদত্যাগ করলে বা দলের বিপক্ষে ভোট দিলে সংসদ সদস্যপদ হারাতে হবে।
নতুন করে আলোচনায় ৭০ অনুচ্ছেদ
গেল ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য কমিশন গঠন করে। সংবিধান সংস্কারের জন্য করা হয় কমিশন।
অধ্যাপক আলী রীয়াজের নেতৃত্বাধীন সংবিধান সংস্কার কমিশন সংবিধানের এই অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করেছে। তাতে বলা হয়েছে, আইনসভা হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার বিষয়ে তাদের সুপারিশ হলো অর্থবিল ছাড়া নিম্নকক্ষের সদস্যদের তাদের মনোনয়নকারী দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে।
এই সুপারিশসহ পাঁচটি সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ১৬৬টি সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নিয়েছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। ইতিমধ্যে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) অনেকগুলো দল তাদের মতামত জানিয়েছে।
সংস্কার কমিশনের যুক্তি
সংসদ সদস্যদের দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করার পেছনে যৌক্তিকতা নিজেদের প্রতিবেদনে তুলে ধরে বলা হয়েছে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংসদ সদস্যদের নিজ দলের প্রস্তাবিত যেকোনো নীতি বা সিদ্ধান্ত অকপটে মেনে নিতে বাধ্য করে। যদিও তাদের মতামত দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে; কিন্তু দলের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়নি। সংবিধান দলের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের নামে সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করতে বাধা দেয়।
কমিশন বলেছে, যদিও দলত্যাগ (ফ্লোর ক্রসিং) আটকানো ছিল এই অনুচ্ছেদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য, কার্যত এর প্রভাব এই উদ্দেশ্য ছাপিয়ে গেছে। ৭০ অনুচ্ছেদে ফ্লোর ক্রসিংয়ের বিরুদ্ধে যে বিধান, তা গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী। স্থিতিশীলতার উদ্দেশ্যে এ বিধান রাখা হলেও এটি রাজনৈতিক আলোচনা এবং দলীয় জবাবদিহিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এটি সংসদ সদস্যদের তাদের নির্বাচনী এলাকার স্বার্থ প্রতিনিধিত্ব করা ও স্বাধীন ইচ্ছা প্রয়োগের ক্ষমতাকে সীমিত করে ফেলে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান
দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার ক্ষমতা প্রশ্নে ঐকমত্য কমিশনে দেওয়া লিখিত মতামত দিয়েছে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি। বঙ্গবন্ধুর পরামর্শে যেভাবে ৭০ অনুচ্ছেদ করা হয়েছিল, যেভাবেই চায় এই তিনটি দল।
বিএনপির বলছে, সংসদে আস্থা ভোট, অর্থবিল, সংবিধান সংশোধনী বিল এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত, এমন সব বিষয়ে দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়া যাবে না। এসবের বাইরে অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে মতামত দিতে পারবেন।
সংবিধান সংস্কার কমিশন যখন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে মতামত চেয়েছিল, তখন জামায়াতে ইসলামী কমিশনকে দেওয়া প্রস্তাবে বলেছিল, ফ্লোর ক্রসিং এখনই বন্ধ করা উচিত নয়। এটি সংসদীয় সরকারব্যবস্থা স্থিতিশীল করতে যুক্ত করা হয়েছিল। তারা এটি আরও দুই মেয়াদ পর্যন্ত রাখার পক্ষে।
জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারীদের দল এনসিপিও অর্থবিলের পাশাপাশি দলের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোটের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছে।
আস্থা ভোটে স্বাধীনতা দেওয়ার বিপক্ষে যুক্তি দিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, “দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো আস্থা ভোটের স্বাধীনতা দেওয়ার মতো উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি, আস্থা ভোটে স্বাধীনতা দেওয়া হলে কোনো সরকার এক থেকে দুই মাসের বেশি টিকবে না। সরকারে স্থিতিশীলতা থাকবে না।”
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রথম আলোকে বলেন, “আস্থা ভোট দলের পলিসির (নীতি) বিষয়। একজন সংসদ সদস্য দলকে প্রতিনিধিত্ব করেন। দলের পলিসির সঙ্গে সংসদ সদস্যদের একই অবস্থান থাকতে হবে। সংসদ সদস্যরা যদি প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির প্রতি অনাস্থা প্রস্তাবে দলীয় পলিসির অনুসরণ না করেন, তাহলে শৃঙ্খলা থাকবে না।”
এ বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংস্কার সমন্বয় কমিটির কো-অর্ডিনেটর সারোয়ার তুষার প্রথম আলোকে বলেন, “সংসদ ও সরকারের স্থিতিশীলতার জন্য তারা অর্থবিল ও আস্থা ভোট ছাড়া অন্য যেকোনো ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মত দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলেছেন।”
ভারতীয় সংবিধানে কী আছে
স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে ভারত, ইসরায়েল, পর্তুগালসহ পাঁচ-ছয়টি দেশে দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার নিষেধাজ্ঞাসংবলিত বিধান আছে।
ভারতীয় সংবিধানের দশম তফসিলে কোন কোন ক্ষেত্রে দল থেকে পদত্যাগ বা দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সংসদ সদস্যপদ বাতিল হবে, তার লম্বা তালিকা আছে।
ভারতীয় সংবিধানে কড়াকড়িটা বাংলাদেশের ৭০ অনুচ্ছেদ থেকে বেশি। ভারতে ভোটদানে বিরত থাকাকে দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া হিসেবে গণ্য করা হয়। কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর যদি কোনো দলে যোগ দেন, তাহলেও সেই ব্যক্তি দল থেকে পদত্যাগ করেছেন—এই বিবেচনায় সংসদ সদস্যপদ হারাবেন। তবে কোনো সংসদীয় দলের এক-তৃতীয়াংশ সাংসদ যদি পুরোনো দল থেকে বেরিয়ে নতুন দল গঠন করেন, তাহলে তা দল থেকে পদত্যাগের শামিল হবে না এবং সদস্যপদও হারাবেন না।
৪১টি দেশে প্রায় একই নিয়ম
বিশ্বের ১৯৩টি দেশের মধ্যে ৪১টি দেশে দল থেকে পদত্যাগ করলে বা দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সংসদ সদস্যপদ হারানোর বিধান আছে। তবে যেসব দেশে এ ধরনের বিধান আছে, সেসব দেশে গণতন্ত্রের চর্চা ও ঐতিহ্য বা দীর্ঘস্থায়িত্ব ততটা গভীর নয়। যেসব দেশে গণতন্ত্রের চর্চা বলতে গেলে নেই, সেসব দেশে দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া বা দল থেকে পদত্যাগ করার কোনো সুযোগ নেই এবং এ-সংক্রান্ত বিধানও নেই। যেমন মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশে রাজতন্ত্র বিদ্যমান এবং বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনুপস্থিত, সেসব দেশে এ ধরনের বিধানের কোনো প্রয়োজন নেই।
অন্যদিকে স্থিতিশীল বা পুরোনো গণতান্ত্রিক দেশেও যে সাংসদেরা দল পাল্টান না, এমনটি সব দেশের বেলায় প্রযোজ্য নয়। যেমন ইতালির পার্লামেন্টের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সদস্য ১৯৯৫ থেকে ২০০২ সালের মধ্যে অন্তত একবার দল বদল করেছেন। অবশ্য ইতালিতে গত ৫০ বছরে সরকার বদল হয়েছে প্রায় ৪০ বার। ইতালিতে দল বদলালে সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয় না এবং সে দেশে এত ঘন ঘন সরকার বদল হলেও গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয়নি।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও গত ৫০ বছরে ২০ জন কংগ্রেসম্যান ও সিনেটর দল বদল করেছেন।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ যা বলছেন
৭০ অনুচ্ছেদের ঢালাও নিষেধাজ্ঞা অর্থাৎ কোনো ইস্যুতেই দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়া যাবে না—এই বিধানটার পরিবর্তন দরকার বলে মনে করেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক।
তিনি বলেন, “আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো, যেগুলো তিন দশকের বেশি সময় ধরে একই ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন থাকার কারণে একনায়কতন্ত্রী দল হিসেবে পর্যবসিত হয়েছে, সেখানে গণতন্ত্রচর্চা ফিরিয়ে আনতে হলে এবং সেই সঙ্গে সংসদে কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে সাংসদদের নিজস্ব মতামত প্রকাশের সুযোগ দিতে ৭০ অনুচ্ছেদকে আরও নমনীয় করতে হবে।”
তার ভাষ্য, “সংসদে দলীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যেমন অনাস্থা প্রস্তাব, বাজেট, গুরুত্বপূর্ণ আইন ইত্যাদি বা আনুষঙ্গিক বিষয়ে ৭০ অনুচ্ছেদের খড়্গ বহাল রেখে অন্যান্য বিষয়ে দলের বিরুদ্ধে সংসদে ভোট দেওয়ার বিধান চালু করা যায়। বলাবাহুল্য, দল থেকে পদত্যাগ করলে বা অন্য দলে যোগ দিলে সংসদ সদস্যপদ বাতিলের বিধান বহাল রাখতে হবে। তবে নমনীয়তা আনা যায় সংসদে ভোট দেওয়ার ব্যাপারে।”
শাহদীন মালিক বলেন, “বর্তমান ব্যবস্থায় বা ৭০ অনুচ্ছেদের বিধানের কারণে সাংসদদের তোতাপাখির মতো সর্বক্ষণ দলীয় বুলি আওড়াতে হয়। সাংসদদের মত-চিন্তা ও ধ্যান-ধারণা সংসদে প্রকাশ এবং সে অনুযায়ী অগুরুত্বপূর্ণ আইন সরকারের নির্বাহী বিষয়ে কোনো প্রস্তাব বা পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার স্বাধীনতা দিতে হবে। এতে সংসদের সঙ্গে সঙ্গে দলের ভেতরও গণতন্ত্রচর্চার পথ সুগম হবে।”
“যেসব কম গণতান্ত্রিক দেশে আমাদের ৭০ অনুচ্ছেদের মতো বিধান আছে, আর যেসব দেশে নেই—এ দুই ধরনের দেশের সাংসদদের দলত্যাগ, দল থেকে পদত্যাগ বা দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার ব্যাপারে বাস্তবিক ফারাক কম। অর্থাৎ বিধান থাকুক বা না থাকুক, দলত্যাগের বা দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার হার প্রায় সমান” যোগ করেন শাহদীন মালিক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান তার লেখা পুরনো একটি কলামে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে লিখেছিলেন, “কোনো পরিবর্তন ছাড়া ৭০ অনুচ্ছেদ থাকা এ সংসদকে অকার্যকর করে ফেলেছে। সরকারি দল যা চাইবে তার বাইরে কিছু করার সাধ্য থাকবে না কারও। অনেকেই ৭০ অনুচ্ছেদ পুরোপুরি তুলে দেয়ার কথা বললেও এর পক্ষে নই আমি।
“অনাস্থা ভোটের ক্ষেত্রে দলের বিপক্ষে ভোট দেয়া গেলে কী হতে পারে, সেটা আমরা এমনকি আমাদের পাশের দেশ ভারতেও দেখেছি। তাই ‘হর্স ট্রেডিং’ বন্ধ করার জন্য ৭০ অনুচ্ছেদ থাকা উচিত। তবে, তাতে বিপক্ষে ভোট দিলে সংসদ সদস্যপদ হারানোর ক্ষেত্রে শুধু অনাস্থা ভোট এবং সেই সঙ্গে ট্রেজারি বিল থাকতে পারে। এছাড়া, আর সব ক্ষেত্রে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ হারাতে হবে না, এ বিধান থাকতে হবে।”