মাস্কের স্টারলিঙ্কে কতোটা সুফল, ঝুঁকি কতোটা

Starlink

পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্ক গবেষণার আঁতুড়ঘর বলা হয় ফিনল্যান্ডের অউলু বিশ্ববিদ্যালয়কে। বর্তমানে ষষ্ঠ প্রজন্ম নিয়ে কাজ করছে তাদের ‘সিক্স-জি ফ্ল্যাগশিপ’। সম্প্রতি স্টারলিঙ্কের ইন্টারনেট সক্ষমতা যাচাইয়ে গবেষণা চালিয়ে জানায় এটি দেশটির প্রত্যন্ত অঞ্চলের জন্য বেশ কার্যকর সমাধান হতে পারে।

তাদের ফলাফল অনুযায়ী, বাধাহীন স্থানে ডাউনলিংক ডেটা রেট ১০০ এমবিপিএসের বেশি; যা বনভূমিতে প্রায় ৬৫ ​​এমবিপিএসের কাছাকাছি। আপলিংকের গতি পাওয়া যায় ১৫ থেকে ৪০ এমবিপিএসের মধ্যে। সংযোগে সময় নেয় ১০ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট।

অবশ্য রাশিয়া সীমান্তে সংযোগ স্থাপনে ব্যর্থ হন তারা। কারণ রাশিয়া স্টারলিঙ্ককে তাদের ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দেয়নি; আশেপাশেও তরঙ্গ আটকে দেওয়া হয়েছে।

গবেষণার এই ফল থেকে এতটুকু আশাবাদী হওয়া যায় যে, এটি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জন্য সুফল বয়ে আনতেও পারে! অবশ্য এক্ষেত্রে তুলে রাখতে হবে খরচের ‘আলাপ’, কিংবা জঙ্গি ও পার্বত্য অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ে ঝুঁকি।  

বাংলাদেশ ও স্টারলিঙ্ক

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গত বছর তিনেক ধরেই চলছে স্টারলিঙ্কের পরিষেবা নিয়ে আলোচনা। ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠানটি কয়েক দফা করেছে সম্ভাব্যতা যাচাই।

২০২৩ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে স্টারলিঙ্কের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রথম পরীক্ষাটি হয়েছিল। সে সময় তৎকালীন মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিদের।

২০২৪ সালের অক্টোবরে দ্বিতীয় দফায় বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিদল এসে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করে যায়।

মূলত বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করতে হলে লাইসেন্স নিতে হবে স্টারলিঙ্কে, আর সেই লাইসেন্সের শর্তাবলী নির্দেশিকা আকারে প্রস্তুত করার কাজ করছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। গত তিন বছরে যা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

খরচ কেমন পড়ে

সম্প্রতি ভুটানও স্টারলিঙ্কের পরিষেবা গ্রহণ করেছে। ভারতও এই সেবার নানাদিক খতিয়ে দেখছে। কিন্তু কতোটা লাভজনক এই উপগ্রহভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা? কতোটা নাগালে থাকবে সাধারণ মানুষের?

তা জানতে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যায় ফিনল্যান্ডে কত খরচ হয় এই পরিষেবায়।    

ফিনল্যান্ডে বাসাবাড়িতে স্টারলিঙ্কের সেবা পেতে খরচ করতে হয় মাসিক ৫০ ইউরো বা ৬ হাজার ৩৫৯ টাকা, যার সঙ্গে যোগ হবে স্টারলিঙ্কের স্ট্যান্ডার্ড কিটের দাম, যা ছাড়কৃত মূল্যে বর্তমানে মিলছে ৩৪৯ ইউরোতে, যা ৪৪ হাজার ৩৯০ টাকার সমান।

এছাড়া রোমিং সুবিধাসহ রয়েছে দুই ধরনের প্ল্যান, মাসিক ৫০ গিগাবাইট ব্যবহারের জন্য ৪০ ইউরো বা ৫ হাজার ৮৮ টাকা অথবা ‘আনলিমিটেড’ ব্যবহারের জন্য ৭২ ইউরো বা ৯ হাজার ১৫৮ টাকা।

ফিনল্যান্ডের পুওলাঙ্কায় স্টারলিঙ্কের গতি পরিমাপ করছেন গবেষক তিমো ব্রায়োসু।

গত ডিসেম্বরে ভুটানে চালু হওয়া স্টারলিঙ্ক ইন্টারনেট পরিষেবায়ও দুই ধরনের প্ল্যান রয়েছে। প্রথমটি বাসাবাড়ির জন্য (লাইট), যার দাম প্রতি মাসে টাকায় ৪ হাজার ১৯৫। এই প্ল্যানটি ২৩ এমবিপিএস থেকে ১০০ এমবিপিএস পর্যন্ত গতি সম্পন্ন। তবে ডেটার ব্যবহার সীমিত।

দ্বিতীয়টি হল স্ট্যান্ডার্ড রেসিডেন্সিয়াল প্ল্যান, যা ২৫ এমবিপিএস থেকে ১১০ এমবিপিএস গতি সম্পন্ন এবং মাসপ্রতি খরচ পড়বে ৫ হাজার ৮৭৩ টাকা। এই প্ল্যানের অধীনে ব্যবহারকারী সীমাহীন ডেটা ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।

এর সঙ্গে কিট কেনার জন্য পরিশোধ করতে হবে এককালীন রকমভেদে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা, যা বিশ্বের সব দেশেই প্রায় সমান।

স্পেসএক্স ২০১৫ সালে স্টারলিঙ্ক প্রকল্প শুরু করে এবং ২০১৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এটি চালু হয়। বর্তমানে এটি বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দক্ষিণ এশিয়ায় স্টারলিঙ্কের প্রথম কার্যক্রম শুরু হলো ভুটানে।

এদিকে, ২০২৪ সালের শেষের দিকে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মণিপুর এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের মতো অঞ্চল থেকে স্টারলিঙ্কের সরঞ্জাম জব্দ করার পর এ বিষয়ে দেশটি বেশ সতর্ক। কারণ এর সহজলভ্যতা জঙ্গি ও চোরাকারবারীদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিতে পারে বলে দেশটির টেলিকমিউনিকেশন্স সংশ্লিষ্টরা আশাঙ্কা করছেন।

বাংলাদেশ উপকার পাবে?

এ বিষয়ে দ্য সান ২৪ কথা বলেছে বেল ল্যাবসের সাবেক রিসার্চ সায়েন্টিস্ট যিনি বর্তমানে ফিনল্যান্ডে ইন্টেল করপোরেশনে জিপিইউ চিপ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন, ফছিহুল আজমের সঙ্গে।

তিনি বলেন, “আপনি জেনে থাকবেন বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম বা সীমান্তবর্তী এলাকায় বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম রয়েছে। স্টারলিঙ্কের বিকেন্দ্রীভূত ইন্টারনেট ব্যবস্থা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে তারা সহজেই সাংগঠনিক যোগাযোগ কিংবা অপপ্রচার চালাতে পারবে।

“আর তাছাড়া স্টারলিঙ্ক সরাসরি ব্যবহারকারীদের সেবা দেয়, ফলে বাংলাদেশ সরকার স্থানীয় আইএসপি বা বিটিআরসি’র মাধ্যমে এটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। এতে জাতীয় নিরাপত্তা ও সাইবার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।”

এর বাইরে স্থানীয় ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হলে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও মনে করে তিনি।

ফছিহুল বলেন, “স্টারলিঙ্ক বাংলাদেশে চালু হলে এটি অনেক সুবিধা এনে দিতে পারে, তবে একইসাথে জাতীয় নিরাপত্তা ও টেলিকম শিল্পের জন্য চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করতে পারে। সরকার যদি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি করতে পারে, তাহলে এটি আশীর্বাদ হয়ে উঠবে; নইলে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।”  

মোবাইল অপারেটর রবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সারাবিশ্বে স্টারলিঙ্কের ইন্টারনেটের যে খরচ তা থেকে অনুমেয় এটা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকবে। তাহলে উপকার পাবে কে? উপকার পাবে অবৈধ কার্যক্রমে যুক্ত লোকজন।

“জাতীয় ডেটা সিকিউরিটি ও সার্বভৌমত্ব নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হবে। আর না হলে ভারত অনেক আগেই স্টারলিঙ্ক সেবা গ্রহণ করতো,” যোগ করেন তিনি।

আরও পড়ুন