মৃত স্ত্রী-সন্তানকে দেখতে প্যারোল না দেওয়ায় অন্তর্জালে তীব্র সমালোচনা

স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যু ঘিরে ছাত্রলীগ নেতাকে প্যারোল না দেওয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা।
স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যু ঘিরে ছাত্রলীগ নেতাকে প্যারোল না দেওয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা।

স্ত্রী ও ৯ মাসের শিশু সন্তানের মৃত্যুতেও এক ছাত্রলীগ নেতাকে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়ায় সমালোচনার ঝড় বইছে সোশাল মিডিয়ায়। অনেকেই এ ঘটনাকে নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের অমানবিক আচরণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও অ্যাক্কিভিস্ট জুলকারনাইন সায়ের প্যারোলের আবেদনের একটি কপি শেয়ার করে লিখেছেন, “মানবিকতা বিবর্জিত কতিপয় গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করছে কারাবন্দি জুয়েল হোসেন সাদ্দামকে, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানের জানাজার নামাজ ও দাফনে অংশগ্রহণ করতে পরিবারের পক্ষ থেকে কোন আবেদন করা হয়নি।

“সাদ্দামের পরিবার এই প্যারোলের আবেদনটি নিয়ে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসন হতে যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয় পর্যন্ত ছুটে গেছে। কিন্তু ব‍্যুরোক্রেসির মারপ্যাঁচ আর সাপ্তাহিক ছুটির দিনের ছুতোয় কেউই তাঁদের সহায়তা করতে শক্ত পদক্ষেপ নেননি। বরং স্থানীয় পুলিশের ডিএসবি প্রতিবেদন দেয় যে সাদ্দামকে নিয়ে আসা হলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতে পারে, সেই আশঙ্কা থেকে জেলা প্রশাসনকে জানানো হয় তাঁদের আবেদনটি পজেটিভ ভাবে না নেওয়ার জন‍্যে।”

লেখার শেষে তিনি যোগ করেন, “ধিক্কার জানাই সংশ্লিষ্ট সকলকে, শেইম অন ইউ।”

‘স্বামীর জামিন করাতে না পেরে’ অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়া কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী নামে এক নারী তার ৯ মাসের শিশু সন্তানকে নিয়ে আত্মহত্যা করেন শুক্রবার।

তার স্বামী জুয়েল হাসান সাদ্দাম বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন, যিনি গত এক বছরের বেশি সময় ধরে কারান্তরীণ।

স্ত্রী ও সন্তানের জানাজা ও দাফনে অংশ নিতে সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার আবেদন জানানো হলেও তা নাকচ করে দেয় প্রশাসন। পরে তাদের লাশ যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে কারাফটকে সাদ্দামকে স্ত্রী ও সন্তানকে শেষবারের মতো দেখতে মিনিট পাঁচেক সময় দেওয়া হয়।

অভিনেত্রী ও অ্যাক্টিভিস্ট মেহের আফরোজ শাওন স্ত্রীর কাছে কারাগার থেকে পাঠানো চিরকুট শেয়ার করে লিখেছেন, “সাদ্দামের চিঠির শেষ দু’লাইনে লেখা ছিল “মায়ের দিকে খেয়াল রাখিস। আমার ছেলেটাকে কোলে নিতে পারলাম না এটাই কষ্ট”।

“ছেলেটা আজ তার বাবার কোলে উঠেছে…। কারা ফটকে সাদ্দাম আজ তার নয় মাস বয়সী ছেলেটাকে প্রথমবারের মতো কোলে নিয়েছে। ও দুঃখিত, ভুল বললাম- কারা ফটকে সাদ্দাম আজ তার নয় মাস বয়সী ‘মৃত’ ছেলেটাকে প্রথমবারের মতো কোলে নিয়েছে। খবরে দেখেছি মৃত ছেলেকে কোলে নিয়ে স্ত্রীর মরদেহ ছুঁয়ে কেঁদেছেন তিনি।

“সাদ্দাম আপনি কাঁদেন, অনেক কাঁদেন, চিৎকার করে কাঁদেন। তারপর অভিশাপ দেন সেই মানুষরূপী অমানুষগুলোকে- যাদের কারণে আজ আপনার এইদিন দেখতে হলো।”

ওই পোস্টের শেষ লাইনে তিনি বর্তমান সরকারের প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে লিখেছেন, “কোনো জাদুঘরে কি এই চিঠির স্থান হবে মাননীয় উপদেষ্টাদের দল?”

এ ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়ায় রীতিমতো সয়লাব সামাজিক মাধ্যম। বেশিরভাগই অন্তর্বর্তী সরকারের ‘একচোখা’ আইনকে কাঠগড়ায় তুলেছেন তাদের প্রতিক্রিয়ায়।

কেউ কেউ বিগত সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণের প্রতি ইঙ্গিত করে লিখেছেন, একটি অন্যায়ের পাল্টা হিসেবে আরেকটি অন্যায় কখনও ন্যায্যতা নিশ্চিত করে না।

অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আরিফ জেবতিক ফেইসবুকে শেয়ার করা একটি পোস্টে মুহাম্মদ ইউনূসকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন।

একটি সংবাদের ফটোকার্ড শেয়ার দিয়ে তিনি লিখেছেন, “হয়তো কোন একদিন আওয়ামী লীগ ফিরবে। তারপর বুলডোজার দিয়ে ইউনূসের বাড়ি, গ্রামীণ ব্যাংকের ভবন সব গুড়িয়ে দিবে। তখন আমরা বলব, এসব মববাজি বন্ধ করেন। তাঁরা বলবে, সেদিন কোথায় ছিলেন, যেদিন ছাত্রলীগ নেতা তাঁর ছোট্ট বাচ্চাকে জড়িয়ে ধরে কবর দিতে পারেনি, প্রিয়তমা স্ত্রীর জানাজা পড়তে পারেনি?

“সেদিন যাতে কথা বলতে পারি, শুধু এজন্য আজকের এই খবর শেয়ার করে রাখলাম। আর কিছু না।”

সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম লিখেছেন, “এমন অমানবিক ঘটনা আর মেনে নেওয়া যায় না! আর কত? কেনো এই নেতা তার স্ত্রী ও সন্তানের জানাযায় অংশ নিতে পারবে না? তাহলে প্যারোলে মুক্তির বিধান কার জন্য?

“একটি অন্যায়কে আরেকটি অন্যায় দিয়ে ন্যায্যতা দেওয়া যায় না। আমরা তখনও লিখেছি, প্রতিবাদ করেছি: এখনও করে যাবো।”

সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া চারটি ছবি যুক্ত করে দিয়ে সাংবাদিক জ ই মামুন লিখেছেন, “ঘুমাও বাংলাদেশ, কবরে নিস্তব্ধতায় ঘুমাও!”

“কথা ছিলো নতুন বাংলাদেশ এমন দিন আসবেনা। ফেইসবুকে ঢুকলেই হৃদয়টা ভারি হয়ে আসছে। আপনাদেরও কি হচ্ছে? চোখ ভিজে উঠছে না? যদি না হয় ধরে নিবেন আপনাদের কান্নাও বিভক্ত,” অনলাইনে বিভিন্ন ইস্যুতে সরব ভূমিকা রাখা, অ্যাক্টিভিস্ট লীনা পারভিন তার ফেইসবুক ওয়ালে এভাবে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন।

সাংবাদিক প্রদীপ কুমার চৌধুরী ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের প্রসঙ্গ টেনে লিখেছেন, “কুড়ি বছর আগে এক সাদ্দামের জন্য বিশ্বের কোটি মানুষের মন কেঁদে ছিল। ২০০৬ সালে ঈদের দিন তার ফাঁসি হয়েছিল। তিনি ছিলেন ইরাকের প্রেসিডেন্ট।

“আর আজ বিশ বছর পর যার জন্য এ দেশের কোটি মানুষের মন খারাপ, তিনি বাংলাদেশের সাদ্দাম। কী জানি, হয়তো ইরাকের বীর সাদ্দাম হোসেনের নামেই তার নাম রাখা হয়েছিল।”

পোস্টের শেষাংশে মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের সমালোচনা করে প্রশ্ন রেখেছেন, “আচ্ছা, বাগেরহাটের এই ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম কত বড় অপরাধী? যাকে তার স্ত্রী-পুত্রের শেষযাত্রায় অংশ নিতে দেওয়া হলো না? সরকারের নির্মমতার শিকার হয়ে শিশুপুত্রসহ মরতে হয়েছে তার স্ত্রীকে। অথচ খুনি, জঙ্গিরা ঘুরে বেড়াচ্ছে বুক ফুলিয়ে!

“সাদ্দামরা জামিন পাবে না, প্যারোল পাবে না- এই সরকার সেটা বুঝিয়ে দিল। এখানে আইন নেই, মানবাধিকার তো দূরের কথা!”

কাজী মিলন নামে একজন পাঠক দ্য সান টোয়েন্টিফোর ডটকম পেজের প্রতিবেদনের নিচে মন্তব্যের ঘরে লিখেছেন, “জীবনে প্রথম দেখলাম, জীবিত মানুষের সাথে দেখা করতে যায় মৃত মানুষ! মনে রেখো বাংলাদেশ।”

গত ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হন বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম। তিনি বর্তমানে যশোর কারাগারে বন্দি রয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যে ঘটনায় সাদ্দামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সেসময় তিনি দেশের বাইরে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

এ সম্পর্কিত আরও খবর:

 

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads