আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় নেই, মামলাগুলোর সাজাও বাতিল হয়ে গেছে; তারপরও কেন তারেক রহমান দেশে ফিরছেন না, এই প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছিল বিএনপির কর্মীদের মনেও। বিএনপির নেতারা অবশ্য আশ্বস্ত করছিলেন, যথাসময়ে ফিরবেন তাদের দলের কাণ্ডারী। কিন্তু কেন ফিরছেন না? সেই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন ঠারে ঠোরে।
এবার এনিয়ে মুখ খুললেন তারেক রহমান নিজেই; জানালেন, শঙ্কার কারণ আছে। বললেন, তার ফেরাটি তার ইচ্ছাধীন নয়। কিন্তু কার ইচ্ছাধীন, তার জবাব দিলেন না তিনি। স্পর্শকাতর বিষয় বলে এড়িয়ে গেলেন। কিন্তু তার এই বক্তব্য সবার মনে কৌতূহল তৈরি করেছে, তারেক রহমানের ভয়টা আসলে কোথায়?
খালেদা জিয়ার ছেলের এই কথা বলার ঠিক আগে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ফিরিয়ে আনলেন ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার স্মৃতি। তিনি বললেন, দুই দল থেকে তাদের নেত্রী ও পরিবারকে মাইনাস করার খেলাটি এখনও চলছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে গত বছর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ওয়ান-ইলেভেনের মাইনাস টু ষড়যন্ত্রের কথা সামনে এনেছিলেন। তবে তখন তা অন্য সবাই উড়িয়ে দিচ্ছিল।
২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারি করে সেনা নিয়ন্ত্রণে সরকার প্রতিষ্ঠার পর দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে বাদ দেওয়ার একটি ষড়যন্ত্র হয়েছিল। ‘মাইনাস টু’ নামের সেই ফর্মুলায় দেশের তথাকথিত সুশীল সমাজের একটি অংশের জড়িত থাকার স্পষ্ট ইঙ্গিতও পাওয়া গিয়েছিল।
তখন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পাশাপাশি তার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর হাতে তারা নির্যাতিত হয়েছিলেন, এমন অভিযোগও ওঠে।
পরের বছর সমঝোতার ভিত্তিতে তারেক রহমান কারামুক্ত হওয়ার পরপরই স্ত্রী-মেয়েকে নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান। তারপর আর ফেরেননি। আরাফাতও বিদেশে চলে যান, মালয়েশিয়ায় থাকা অবস্থায় কয়েকবছর পর তার মৃত্যু ঘটে সেখানেই।
বলা হয়, রাজনীতি না করার শর্তে বিদেশ পাড়ি দিয়েছিলেন তারেক রহমান। ভাই মারা যাওয়ার পরও দেশে ফেরেননি তিনি। মা দুর্নীতির মামলায় দণ্ড নিয়ে কারাগারে গেলেও তা তাকে দেশে ফেরাতে পারেনি।
এদিকে আওয়ামী লীগ আমলে কয়েকটি মামলায় তারেকের কারাদণ্ড হয়, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মামলায় হয় যাবজ্জীবনর সাজার। ফলে দেশে ফিরলে তাকে কারাগারে যেতে হত।
গত বছর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর চিত্র পাল্টে যায়। প্রথমেই মুক্তি পান খালেদা জিয়া। এরপর তার ও তারেকের বিরুদ্ধে সাজার সব রায় উচ্চ আদালতে বাতিল হয়ে যায়।
অসুস্থ খালেদা জিয়াকে বিদেশ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার সময় বিএনপি নেতারা বলেছিলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বিদেশে যাবেন, আর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক ফিরবেন।
কিন্তু এবছরের জানুয়ারিতে খালেদা জিয়া লন্ডন গেলেও তারেক ফেরেননি। পাঁচ মাস পর খালেদা ফেরেন পূত্রবধূ জোবাইদা রহমানকে নিয়ে। জোবাইদার নিরাপত্তার জন্য কড়া বন্দোবস্তু নিতে তখন বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছিল।
জোবাইদা লন্ডনে ফিরেও গেছেন। কিন্তু তারেক আসেননি আর। ৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়া গত সপ্তাহে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তির পর শুক্রবার তার অবস্থার বেশ অবনতি ঘটে। অবস্থা সঙ্কটাপন্ন, এমন কথা বিএনপি নেতারা জানানোর পর ধারণা করা হয়েছিল, মাকে দেখতে এবার দেশে ফিরবেন তারেক।
কিন্তু শনিবার ফেইসবুকে এক পোস্টে তিনি ধারণা দেন, তার দেশে ফেরা আপাতত হচ্ছে না। কারণ প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।
তিনি লেখেন, “এমন সংকটকালে মায়ের স্নেহ স্পর্শ পাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যে কোনো সন্তানের মতো আমারও আছে। কিন্তু অন্য আর সকলের মতো সেটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়।”
প্রতিবন্ধতা কোন দিক থেকে সেই বিষয় স্পষ্ট না করে লেখেন, “স্পর্শকাতর সেই বিষয় বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত।”
তবে এর পেছনে রাজনৈতিক বাস্তবতা থাকার কথা বলেন তিনি। আর তা বদলালেই কেবল তার দেশে ফেরা হবে, তাও তিনি জানান।
তারেক রহমান খোলসা না করলেও তার একদিন আগে শেখ হাসিনার ছেলে জয় বিবিসি বাংলাকে বলেন, বাংলাদেশ বড় দুটি দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে একটি অগণতান্ত্রিক তৎপরতা রয়েছে, দুই দলেরই নেতৃত্ব পরিবর্তনে বিদেশ থেকে একটা ‘খেলা’ চলছে।
বড় দুটি দল বলতে তিনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কথা বুঝিয়েছেন। তবে সেই খেলা কারা খেলছে, তা বলেননি জয়।
অভ্যুত্থানের পর ভারতে আশ্রয় নিয়ে থাকা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে ‘মাইনাস’ হয়ে গেছেন। তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। তার ছেলে জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলও এখন দণ্ডিত। আওয়ামী লীগের কাজের ওপরও রয়েছে নিষেধাজ্ঞা।
এখন অসুস্থ খালেদা জিয়ার মৃত্যু হলে তিনিও ‘মাইনাস’ হয়ে যাবেন। তারেক রহমান দেশে ফিরতে না পারলে তিনিও এক প্রকার মাইনাস হয়ে যাবেন। তাহলে ওয়ান-ইলেভেনের সেই অপূর্ণ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়ে যাবে।
কিন্তু খেলাটি খেলছে কে? অন্তর্বর্তী সরকারের তরফে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম স্পষ্ট করেছেন, তারা এই খেলায় নেই। তিনি এক ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, “এ ব্যাপারে (তারেক রহমানের ফেরা) সরকারের তরফ থেকে কোনো বিধি-নিষেধ অথবা কোনো ধরনের আপত্তি নাই।”
তাহলে সেনাবাহিনী কি বাধা? এই ধারণা কেউ কেউ করছেন। কেননা, ২০০১-২০০৬ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় তারেক রহমানের আচরণ রুষ্ঠ করেছিল অনেক সেনা কর্মকর্তাকে। সেই কারণে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার ওপর চলে নির্যাতন। কিন্তু সেটাই কি কারণ, তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ অবশ্য মনে করছেন, তারেকের ফেরার ক্ষেত্রে আপত্তিটি দেশের বাইরে থেকেই হচ্ছে।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “উইকিলিকসের ফাঁস হওয়া প্রতিবেদনে তারেক রহমানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির বিষয়টি সামনে এসেছিল এবং যে যা-ই বলুন না কেন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতির পরিবর্তন না হলে তারেক রহমান দেশে ফিরবেন কোন ভরসায়? বাংলাদেশের রাজনীতি অনেকটাই নির্ভর করে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়ার ওপরে।”
আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে তারেকের যোগাযোগ নিয়ে দিল্লি এক সময় উদ্বিগ্ন ছিল, যে খবরটি ভারতের সংবাদমাধ্যমেও এসেছিল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব এখন সবচেয়ে কম। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এখন বেশি। তাহলে তারেককে নিয়ে আপত্তিটি ওয়াশিংটনের, এমন ভাবার কারণও রয়েছে।
তবে মহিউদ্দিন আরো বলেন, “১/১১ এর সময়ে কিছু ব্যাপার ছিল। তিনি (তারেক) এক ধরনের মুচলেকা দিয়ে দিয়েছিলেন। খালেদা জিয়াও বলেছিলেন যে তারেক লন্ডনে পড়ালেখা করবেন, রাজনীতি করবে না। আমরা জানি না সেই অঙ্গীকারের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে কি না?”
তিনিও মাইনাস টুর কথাটি তুলে বলেন, “মাইনাস টু নিয়ে যত কথা বলি না কেন… তখন আসলে এজেন্ডা ছিল মাইনাস ফোর। সেটা ছিল দুই পরিবারের ধারাবাহিক শাসনের বিরুদ্ধে একটা ব্যবস্থা নেওয়া। এর মধ্যে একটা মাইনাস হয়ে গেছে (শেখ হাসিনা পরিবার)। বাকি অর্ধেকের মধ্যে খালেদা জিয়া অসুস্থতার কারণে নিষ্ক্রিয়। ফলে বাকি থাকলেন তারেক রহমান।”
“তবে তারেক রহমানের দেশে ফেরার অনিশ্চয়তা শেষ পর্যন্ত মাইনাস ফোর-এ গড়ায় কি-না সেটি সময়েই জানা যাবে,” বলেন মহিউদ্দিন।
এ সম্পর্কিত আরও খবর:



