একটি ভিডিও চিত্র তৈরির জন্য নির্মাতাকে অর্থ দিতে শিল্পকলা একাডেমির সদ্য সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদকে ফোন করেছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। এসময় উপদেষ্টার কাছে কয়েকটি বিষয় জানতে চেয়েছিলেন শিল্পকলা একাডেমির সদ্য সাবেক মহাপরিচালক।
উপদেষ্টার কাছে সৈয়দ জামিল প্রশ্ন রাখেন – কীসের ভিডিও? কবে করা হয়েছে? এভাবে মৌখিক নির্দেশে কি টাকা দেওয়া যায়? এরপর দু’জনের মধ্যে রীতিমত তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। বাগ্বিতণ্ডার এক পর্যায়ে মহাপরিচালক জানিয়ে দেন ‘আমি চিঠি না পেলে টাকা দিতে পারব না’।
সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বিভিন্ন সময় শিল্পকলা একামেডির কাজে এভাবে অযাচিত হস্তক্ষেপ করতেন বলে বর্ণনা দিয়েছেন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্য ও সংগীত বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদ।
প্রথম আলোর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে শিল্পকলা একাডেমির সদ্য সাবেক মহাপরিচালক বলেন, “অনেকবার বলেছি, আমি যদি কাজ করতে না পারি পদ আঁকড়ে থাকব না। মাথা নত করে থাকব না। আমাকে বহিষ্কার করেন। তারা সেটি করেনি। কিন্তু পরিস্থিতিটি এমন তৈরি হয়েছিল যে স্বাধীন কাজ করা যাচ্ছিল না। সম্মানের সঙ্গে, মাথা তুলে থাকা যাচ্ছিল না।“
শুক্রবার নাট্যোৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে সৈয়দ জামিল আহমেদ আচকা পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে উপস্থিত সবাইকে চমকে দেন। মঞ্চে থাকাকালে শিল্পকলার সচিব মোহাম্মদ ওয়ারেছ হোসেনের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। মহাপরিচালক তাঁর বক্তব্যে সরাসরি সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বিরুদ্ধে শিল্পকলা একাডেমিতে ‘অযাচিত হস্তক্ষেপের’ অভিযোগ তোলেন। পরে তিনি পদত্যাগের কারণ উল্লেখ করে সংবাদ মাধ্যমে লিখিত বক্তব্যে দেন।
প্রথম আলোর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্য ও সংগীত বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদ বলেন, ‘আমি নিজে যে অঙ্গীকার ও দায়িত্ববোধ থেকে শিল্পকলার মহাপরিচালকের পদ গ্রহণ করেছিলাম, তা বেশ কিছুদিন ধরেই পালন করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হচ্ছিলাম।’
তিনি বলেন, “উপদেষ্টার সঙ্গে ‘টক্সিক রিলেশন’ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের ঘটনা—সব মিলিয়ে আমাকে পদত্যাগেরই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রতিটি মুহূর্তই আমার কাছে মূল্যবান। সারা জীবন আমি প্রতিটি সেকেন্ডকে মূল্য দিয়ে কাজ করে এসেছি। আমি যে সংবেদনশীলতা নিয়ে পদত্যাগ করেছি, এ মুহূর্তে একই সংবেদনশীলতা থাকলে উপদেষ্টার পদ থেকে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীরও পদত্যাগ করা উচিত।”
‘এখানে মনে হতে পারে আমি আরেকজনকে ইঙ্গিত করে কথা বলছি। আমার পদত্যাগের কারণ হলো সেই রাজনৈতিক নীতিবোধ, যার অর্থ হলো, ক্ষমতা যদি জনকল্যাণে চর্চা না করা যায়, তা দুটি ফলাফল তৈরি করে। এক হলো ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রেখে মানব থেকে দানব হয়ে ওঠা। নতুবা ক্ষমতার চেয়ারে আসীন থাকতে আত্মমর্যাদা জলাঞ্জলি দিয়ে দাসে পরিণত হওয়া। আর এতে সেই প্রতিষ্ঠানের ও জনগণের কোনো উপকারই হয় না। আমার পদত্যাগের কারণ আমি বিস্তারিত বলেছি। এর সঙ্গে যুক্ত করে বলা যায়, যে পদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে প্রয়োগ করতে বাধার মুখে পড়তে হয়, সেই পদ ত্যাগ করাই ভালো।’ যোগ করেন সৈয়দ জামিল আহমেদ।
সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টার ফেসবুক পোস্টের জবাবে সৈয়দ জামিল বলেন, “পরিস্থিতি আমি ডিল করতে পারিনি বলে হতাশ হয়েছি, এই যদি হয় তাঁর বক্তব্য, তাহলে তিনি পরিস্থিতিও বোঝেননি, হতাশাও চিনতে পারেননি। আর ‘ডিল করা’ বলতে যা বোঝায়, তা-ও তিনি বোঝেননি। বরং সংস্কৃতি উপদেষ্টাই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেননি। বাংলা একাডেমির সাহিত্য পুরস্কার নিয়ে যে ঘটনা ঘটেছে, সেটি তার বড় প্রমাণ। তিনি উপদেষ্টার পদে থেকে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে গৌরবময় ওই প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ক্ষুণ্ন করেছেন।”
শিল্পকলার ডিজির পদত্যাগের পরপরই ফেসবুকে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেন, ‘আপাতত বলে রাখি, উনার (সৈয়দ জামিল আহমেদ) বলা অনেকগুলা কথা পুরো সত্য নয়, অনেকগুলা কথা ডাহা মিথ্যা এবং কিছু কথা পরিস্থিতি ডিল (মোকাবিলা) না করতে পারাজনিত হতাশা থেকে বের হয়ে আসা বলে মনে হচ্ছে।’
এখানেই শেষ নয়। সৈয়দ জামিলের অভিযোগের জবাব দিয়ে রোববার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। সেখানে বলা হয়, “মন্ত্রণালয় শিল্পকলা একাডেমির কোনো কাজে হস্তক্ষেপ করেনি। একাডেমির কোনো কাজ মন্ত্রণালয় বন্ধ করতে বলেছে এ রকম কোনো নজির নেই। বরং সব সময় শিল্পকলার কাজকে উৎসাহিত করা হয়েছে।”
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় উল্টো দোষ চাপিয়েছেন সৈয়দ জামিল আহমেদের বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ বা প্রটোকলের তোয়াক্কা না করার অভিযোগ তোলা হয়েছে। মন্ত্রণালয় তাদের লিখিত বক্তব্যে জানিয়েছে, “বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আইন অনুযায়ী প্রতি তিন মাস অন্তর একাডেমির সভা করার বিধান থাকা সত্ত্বেও পরিষদ সভার কার্যবিবরণী অনুমোদন করতে উপদেষ্টা ৫ সপ্তাহ অহেতুক সময় নেন। অথচ একাডেমির আইন অনুযায়ী প্রতি তিন মাস অন্তর সভা করার বিধান রয়েছে “
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, “গত ১৯ ফেব্রুয়ারি একুশে পদক বিতরণ অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত মহড়ায় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় সংগীত ও আবহ সংগীত পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে মহড়ায় আসতে না দিয়ে মিটিংয়ের নামে আটকে রাখেন সৈয়দ জামিল আহমেদ, যে মিটিং তিনি সকালে বা পরদিন বিকেলে করতে পারতেন।“
ছাত্র–জনতার আন্দোলনের সময় ফেসবুকে স্ট্যাটাস লেখার মাধ্যমে আন্দোলনের পক্ষে থাকা চলচ্চিত্র ও নাট্য নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী গত ১০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। পরে তিনি সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পান।
আড়াই দশকের বেশি সময় ধরে চলচ্চিত্র ও নাটক নির্মাণ করেছেন ফারুকী। তাঁর মালিকানাধীন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘ছবিয়াল’–এর ব্যানারে তিনি বহু বিজ্ঞাপন, নাটক ও সিনেমা নির্মাণ করা হয়েছে। ‘ব্যাচেলর’, ‘টেলিভিশন’, থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’সহ চলচ্চিত্র ও নাটক নির্মাণে যেমন সুখ্যাতি পেয়েছেন ফারুকী তেমনি তাঁর নাটক-সিনামা নিয়ে বির্তক আছে। অশ্লীলতা ও বাংলা ভাষার বিকৃতি করার অভিযোগ আছে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বিরুদ্ধে।
উপদেষ্টা ফারুকীর স্ত্রী অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা ‘মুজিব : একটি জাতির রূপকার’ চলচ্চিত্রে শেখ মুজিবুর রহমানের স্ত্রী ফজিলাতুন্নেসা মুজিব ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। এই বঙ্গমাতার চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে নানা পরামর্শ এবং গল্প শুনেছিলেন তিশা। এজন্য প্রায় যেতেন গণভবনে। ছবি মুক্তির পর তিশা বলেছিলেন, বঙ্গমাতার চরিত্রে অভিনয় করা চ্যালেঞ্জং ছিল কিন্তু তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা যেভাবে পুরো চরিত্রের বর্ণনা করেছেন, তাতে তার অভিনয় করা সহজ হয়েছে।
তবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যখন উপদেষ্টা হওয়ার পর সাংবাদিকরা ফারুকীর কাছে একটি প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়েছিলেন। ফজিলাতুন্নেসা মুজিব ভূমিকা তিশার অভিনয়ের এ বিষয়ে আত্মগ্লানিতে ভুগছেন কি না? ফারুকীর জবাব ছিল, “আমি উস্কানিমূলক কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই না। নরমাল প্রশ্ন থাকলে, যে প্রশ্নই আপনি জানতে চান “
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় যখন দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সিংহভাগ অভিভাবক নীরবতা পালন করেছিলেন, সেসময় সৈয়দ জামিল আহমেদ রাজপথে নেমে ছাত্রদের সাহস জুগিয়েছিলেন।
পরবর্তীতে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত ৯ সেপ্টেম্বর দুই বছরের জন্য বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে নিয়োগ পেয়েছেন নাট্যনির্দেশক সৈয়দ জামিল আহমেদ।



