শুল্ক কী, যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক কে দেয়, কীভাবে সংগ্রহ হয়, আয় কত

Trade War

যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসেছেন রিপাবলিকান ব্যবসায়ি ডোনাল্ড ট্রাম্প। শপথ গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই তিনি তার প্রথম মেয়াদের অনুরূপ বাণিজ্য যুদ্ধের সূচনা করেন।

ট্রাম্প প্রথমবার ‘শত্রু রাষ্ট্র’ বিবেচনায় বাণিজ্যযুদ্ধ করলেও, এবার শত্রু-মিত্র সবার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ শুরু করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। এতে অর্থনীতি ও বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। 

ট্রাম্প চীনের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছেন। মেক্সিকো ও কানাডার জন্য ২৫ শতাংশ শুল্ক বসানোর পরিকল্পনা এক মাসের জন্য পিছিয়ে দিলেও ৪ মার্চ মঙ্গলবার থেকে তা কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছেন। প্রথম দিনেই তিনি কলমের এক খোচায় কলম্বিয়ার ওপর শুল্ক বসান। পরে অবশ্য উভয় পক্ষের আলোচনার ভিত্তিতে শুল্ক স্থগিত করা হয়।

ট্রাম্পের নজর এবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিকে। তবে শুধু ঘোষণার মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিনের মিত্র ইউরোপের দেশগুলোর ওপর কীভাবে শুল্ক আরোপ করা যায়, সেবিষয়ে আলোচনা পর‌্যালোচনা শুরু করেছে তার প্রশাসন।

কিন্তু শুল্ক কীভাবে কাজ করে, কে এটি পরিশোধ করে এবং রাজস্ব কীভাবে সংগ্রহ করা হয়—তা অনেকেরই অজানা। এসব প্রশ্ন খোলাসা করতেই এই প্রতিবেদন।

শুল্ক সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশে সাক্ষর করার পর ট্রাম্প।

শুল্ক কী, এর উদ্দেশ্য কী

শুল্ক হলো আমদানি করা পণ্যের ওপর সরকার নির্ধারিত কর। এটি সরকারের আয় বাড়ানোর একটি উপায়। অনেক দেশ শুল্ক ব্যবহার করে বিদেশি পণ্যের দাম বাড়ায় দেশিয় শিল্পের সুরক্ষার জন্য। বিদেশী পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ভারসাম্যও রক্ষা করা হয় দেশীয় অর্থনীতি শক্তিশালী করার মাধ্যমে।

কখনও কখনও শুল্ক ব্যবহৃত হয় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কৌশল হিসেবে, যেমন অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করা।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুল্ককে কূটনৈতিক উদ্দেশ্যেও ব্যবহার করছেন। তিনি মেক্সিকো ও কানাডার ওপর শুল্ক বসানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে এই দুটি দেশ সীমান্তে অভিবাসন ও মাদক চোরাচালান রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে রাজি হলে ট্রাম্প শুল্ক আরোপ ১ মার্চ পর্যন্ত স্থগিত করেন।

যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে শুল্ক আদায় ও কার্যকর করে

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী শুল্ক আদায়ের নিয়ম ঠিক করে দেন। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস ও বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি) এই শুল্ক আদায় ও কার্যকর করার দায়িত্বে থাকে। তারা দেশজুড়ে প্রায় ৩৩০টি প্রবেশস্থলে শুল্ক আদায় করে। এসব জায়গার মধ্যে সড়ক ও রেলপথের সীমান্ত, সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর অন্তর্ভুক্ত।

সিবিপি কর্মকর্তারা কাগজপত্র পরীক্ষা করেন, নিরীক্ষা চালান এবং শুল্ক ও জরিমানা সংগ্রহ করেন। শুল্ক আদায়ের সময় এটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাধারণ তহবিলে জমা করা হয়। যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বা ভুলবশত পণ্যের পরিমাণ, ধরন বা উৎস ভুলভাবে উল্লেখ করে, তবে তাকে জরিমানা দিতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস ও বর্ডার প্রোটেকশনের এক সদস্য গাড়ির পণ্যের তালিকা পরীক্ষা করছেন।

অনেক পণ্য ও উপকরণ একাধিকবার সীমান্ত পার হওয়ার পর চূড়ান্ত পণ্য তৈরি হয়। যেমন—যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি যন্ত্রাংশ মেক্সিকোতে গিয়ে গাড়ি হিসেবে তৈরি হয়, তারপর আবার যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা হয়।

সিবিপির নিয়ম অনুযায়ী, যদি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি কোনো পণ্য বিদেশ থেকে ফের আমদানি করা হয় এবং সেটির মূল্য বা গুণগত মান বাড়ানো না হয়, তাহলে তা শুল্কমুক্ত থাকে।

আরেকটি উদাহরণ হলো স্বর্ণ রপ্তানি। যুক্তরাষ্ট্র যদি ভারতকে স্বর্ণ রপ্তানি করে এবং তা দিয়ে সেখানে কানের দুল তৈরি হয়। তাহলে সেই দুল যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনা হলে শুল্ক দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে, শুধু দুলের নয়, স্বর্ণের মূল্যও শুল্কের আওতায় আসবে।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক থেকে আয় কত

একসময় শুল্ক ছিল যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রধান আয়ের উৎস। তবে গত শতকের বেশিরভাগ সময় ধরে শুল্ক থেকে আয় মোট রাজস্বের খুব সামান্য অংশ হয়েছে।

সেন্ট লুইসের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শুল্ক থেকে সরকারের আয় মোট ফেডারেল রাজস্বের ৩ শতাংশেরও কম ছিল।

কানাডা, মেক্সিকো ও চীনের ওপর প্রস্তাবিত শুল্ক স্থায়ীভাবে কার্যকর হলে পরবর্তী দশ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকদের জন্য অতিরিক্ত ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। অরাজনৈতিক গবেষণা সংস্থা ট্যাক্স ফাউন্ডেশন এই হিসাব দিয়েছে। তাদের মতে, শুধু ২০২৫ সালেই এই নীতি শুল্কের পরিমাণ ১১০ বিলিয়ন ডলার বাড়িয়ে দিতে পারে।

ট্যাক্স ফাউন্ডেশন ধারণা করছে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে চীনের ওপর আরোপিত শুল্ক ও প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়ে সম্প্রসারিত শুল্ক বর্তমানে বছরে ৭৭ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব সৃষ্টি করছে।

ফেডারেল রিজার্ভ দপ্তর।

ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসন ২০১৮ ও ২০১৯ সালে প্রায় ৩৮০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের হাজার হাজার পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে। এটি কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম বৃহৎ কর বৃদ্ধি।

বাইডেন প্রশাসন ট্রাম্পের অধিকাংশ শুল্ক বহাল রাখে। ২০২৪ সালের মে মাসে, তারা চীনের অতিরিক্ত ১৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। এর মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর ও বৈদ্যুতিক গাড়ি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

শুল্কের মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধির পূর্বাভাস

ট্যাক্স ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, কানাডার ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক (জ্বালানি বাদে, যা ১০ শতাংশ) ও মেক্সিকোর ওপর শুল্ক ২০২৫ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ফেডারেল রাজস্ব ৮৮০ বিলিয়ন ডলার বাড়বে। একই সময়ে, চীনের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক ফেডারেল রাজস্ব ২৪১ বিলিয়ন ডলার বাড়াবে। চীনা আমদানিকে বিদ্যমান ও নতুন শুল্কের আওতায় নিয়ে আসলে আরও ৫৫ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব যুক্ত হবে।

স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের শুল্ক ২০২৫ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ১০৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি করবে। মোটর যান ও মোটর যান যন্ত্রাংশের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক ৩১০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব বাড়াবে।

তবে শুল্ক আরোপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি সংকুচিত হলে রাজস্ব কমতে পারে। বিদেশি দেশের প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার কারণে রাজস্ব আরও কমবে। যদি শুল্ক একত্রে আরোপ করা হয়, তাহলে আমদানি আরও কমবে। ফলে রাজস্ব হ্রাস পেতে পারে।

শুল্কের খরচ কে দেয়

গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা উচ্চ শুল্কের খরচ বহন করে। বিদেশি উৎপাদকরা হয়তো বিক্রির খরচ কমাতে পারে, অথবা আমদানিকারকরা কিছু খরচ নিজেরা গ্রহণ করতে পারে। তবে লাভ কমানোর ঝুঁকি এড়াতে কোম্পানিগুলো সাধারণত দাম বাড়িয়ে দেয় এবং কিছু খরচ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়।

এছাড়া, শুল্ক থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য একটি প্রক্রিয়া রয়েছে। এর মাধ্যমে কোম্পানিগুলো আবেদন করতে পারে, যদি শুল্ক পরিশোধ করা তাদের ব্যবসার জন্য ক্ষতিকর হয় বা অন্য কোনো দেশ থেকে পণ্য কেনার উপায় না থাকে।

শুল্ক আরোপের ফলাফল

শুল্ক আরোপ করা হলে কী ঘটে তা চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের ইতিহাস থেকে জানা যায়। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তিনি চীনা পণ্যের ওপর বিভিন্ন শুল্ক আরোপ করেন। এর মধ্যে ছিল ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও ইঞ্জিন।

এর ফলে ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম বাণিজ্য যুদ্ধের আগে চীন যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানির ২০ শতাংশ পণ্য সরবরাহ করত। কিন্তু ২০২৩ সালে এটি কমে ১৪ শতাংশ হয়ে যায়।

শুল্ক আরোপের ফলে আমদানিকারকরা অনেক সময় শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেন। তারা এটি করে বিভিন্ন উপায়ে। যেমন- পণ্য তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পাঠানো, পণ্যের মূল্য কম দেখানো, অথবা পণ্যের নাম ভুলভাবে উল্লেখ করা, যাতে কম শুল্ক দিতে হয়।

গোল্ডম্যান স্যাক্সের অর্থনীতিবিদরা সম্প্রতি জানিয়েছেন, শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার কারণে চীনের থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিতে ৯০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পতন ঘটেছে। এই পতনের মোট পরিমাণ ২৪০ বিলিয়ন ডলার হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে, যা বাণিজ্য যুদ্ধের আগে ছিল।

ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘এক্সটার্নাল রেভিনিউ সার্ভিস’ কী

ট্রাম্প প্রশাসন তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বাণিজ্য নীতির অংশ হিসেবে একটি আলাদা এক্সটার্নাল রেভিনিউ সার্ভিস প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছে। এই সংস্থাটি শুল্ক সংগ্রহ করবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শুল্ক রাজস্ব আসলে একটি ‘বহিরাগত’ উৎস নয়। কারণ শুল্ক পরিশোধ করে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকরা। তারা এর কিছু খরচ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেন। তবুও এই ধারণাটি ট্রাম্পের ইচ্ছা প্রকাশ করে যে, বিদেশী পণ্যের ওপর শুল্ককে এমন একটি রাজস্ব উৎস হিসেবে উপস্থাপন করা হবে, যা করদাতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে না।

বাণিজ্য চুক্তি কী

যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি বাণিজ্যিক অংশীদারের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। এর মধ্যে মেক্সিকো ও কানাডার সঙ্গে একটি চুক্তি রয়েছে, যা ইউএসএমসিএ বা নতুন এনএএফটিএ (নাফটা) নামে পরিচিত। এই চুক্তিতে দেশগুলো শুল্কের হার শূন্যের দিকে নামানোর প্রতিশ্রুতি দেয়।

তবুও ট্রাম্পের মেক্সিকো ও কানাডার ওপর স্থগিত শুল্ক এই চুক্তির বিপরীতে। এই তিন দেশের মধ্যে চুক্তিটি ২০২৬ সালে পুনঃনিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত। ট্রাম্প তার প্রথম কার্যদিবসে কলম্বিয়ার ওপরও শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো হয়।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সদস্য হিসেবে, যুক্তরাষ্ট্র কিছু নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য। এর মধ্যে ভর্তুকি ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা এবং বাণিজ্য বাধা যেমন শুল্ক ও কোটা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ট্রাম্পের চীনের ওপর নতুন শুল্কের প্রতিক্রিয়ায়, বেইজিংয়ের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ডব্লিউটিও-তে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি ‘মামলা’ করার হুমকি দিয়েছে। তারা এই শুল্ককে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়মের ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

আরও পড়ুন