নির্বাচন হয়েছে, বিদায় নিয়েছে মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। তবে তাদের নিয়ে আলোচনার রেশ রয়ে গেছে এখনও। সেই আলোচনা নতুন করে জেগে উঠল তার সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের এক কথায়।
ইউনূসের সরকারের ভেতরে আরেক সরকার ছিল, সে কথা সম্প্রতি বলেছিলেন ওই সরকারের উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন। এখন আসিফ নজরুলও দিলেন একই ইঙ্গিত।
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিদেশ থেকে উড়ে এসে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়েছিলেন ইউনূস। তারপর অনেকটা নিজের পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়েই সরকার গঠন করেন তিনি।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ ছিল, ইউনূস বিশেষ মিশন নিয়ে বাংলাদেশে সরকারের দায়িত্ব নেন। পশ্চিমাদের স্বার্থ হাসিল করে দেওয়াই ছিল তার উদ্দেশ্য। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপনীয় বাণিজ্য চুক্তির কথাও আসে সে প্রসঙ্গে।
নানা ঘটনার পর গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপির সরকার গঠনের মধ্যদিয়ে ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায় হয়।
তার দেড় মাস পর বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আসিফ নজরুল বললেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেসব চুক্তি হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে তাকে কখনোই ডাকা হয়নি।
ইউনূসের সরকারে আইন বিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক আসিফ নজরুল। এর বাইরে যুবক ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ও সামলাতে হয়েছে তাকে।
আসিফ নজরুল বলেন, অর্থনীতি, ব্যাংকিং ও এনবিআর নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ও তাকে ডাকেননি ইউনূস। এ সব বিষয়ে ইউনূস কয়েকজন উপদেষ্টাকে নিয়ে বসতেন।
ইউনূস সরকারের একটি ‘কিচেন কেবিনেট’ ছিল এবং আসিফ নজরুল সেই কেবিনেটে ছিলেন বলেই আলোচনা ছিল।

সেই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আসিফ নজরুল পাল্টা প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন সরকারের আমলে ‘কিচেন কেবিনেট’ ছিল না?
এই প্রসঙ্গে সাবেক আরেক উপদেষ্টার কথা নিয়ে আসিফ নজরুল জানান, ওই উপদেষ্টা নিজেই বলেছেন—ইউনূস সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় তিনি ছিলেন না। কিন্তু শ্রম আইনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের আলোচনায় তিনি ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। নির্বাচন কমিশন যখন নির্বাচনী আইনের খসড়া নিয়ে আসে, তখন উপদেষ্টারা মিলে বসেন। সে সময় ওই উপদেষ্টাকে বেশি কথা বলতে বলা হয়, কারণ নির্বাচন বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা বেশি।
এই উপদেষ্টা হলেন এম সাখাওয়াত হোসেন। সাবেক এই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ওয়ান-ইলেভেনের পর নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। ইউনূস সরকারে শুরুতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাকে। পরে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং শ্রম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।
সাখাওয়াত হোসেন গত ফেব্রুয়ারি মাসে চ্যানেল ওয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের বেশিরভাগ ‘বড় সিদ্ধান্ত’ হত উপদেষ্টা পরিষদের বাইরে।
আসিফ নজরুল এক রকম বললেও সাখাওয়াত বলেছিলেন, নির্বাচনের বিষয়েও সরকারের কেউ তার সঙ্গে কোনো কথা বলেনি।
তিনি বলেন, “শুরু থেকেই প্রধান উপদেষ্টা বলে আসছিলেন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই নির্বাচন হবে। সেই নির্দিষ্ট সময় কতটুকু, নির্দিষ্ট সেটা উনি বলেননি। সেনাপ্রধান বলেছিলেন ১৮ মাস, আমরা দেখলাম ১৮ মাসের মধ্যেই নির্বাচনটা হল।”
উপদেষ্টাদের মধ্যে কেউ কেউ নির্বাচন দিতে অনীহ ছিলেন বলে কথা রয়েছে। সেই বিষয়ে প্রশ্নে সাখাওয়াত বলেছিলেন, “যারা ছিলেন, তারা নিজেরা মোটামুটি ক্লোজ ছিলেন। আমি কোনোদিন এসব আলোচনার মধ্যে আসিনি। আমাকে তারা কখনো ডাকেওনি, আমি থাকিওনি।”
তিনি বলেন, “আমরা সেখানে ২৭ জন। কিন্তু আনফরচুনেটলি এই ধরনের বড় সিদ্ধান্তগুলো কেবিনেটেও আলোচনা হত না। মোটামুটি কেবিনেটের বাইরে আলোচনা হত।”
এই কিচেন কেবিনেটে তাহলে কারা ছিল, সেই বিষয়ে মুখ খোলেননি সাখাওয়াত। তিনি বলেন, “আমি নাম শুনেছি। তারা আমার কলিগ ছিলেন, এটুকুই।”
অন্তর্বর্তী সরকার তার এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে অনেক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে বিএনপি নেতারাও সমালোচনা করে আসছিলেন।



