দুই অভ্যুত্থানের পরের সংসদের যাত্রা শুরুর মিল-অমিল

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন, যা আক্রান্ত হয়েছিল ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। এখানেই বসছে নতুন অধিবেশন। ফাইল ছবি
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন, যা আক্রান্ত হয়েছিল ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। এখানেই বসছে নতুন অধিবেশন। ফাইল ছবি

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর নির্বাচন হলো, তাতে নির্বাচিতদের শপথ পড়াবেন কে, তা নিয়ে চলছিল জটিলতা। নিয়ম অনুসারে আগের স্পিকারের কাছ থেকে নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ নেওয়ার কথা। কিন্তু আগের স্পিকার জাতীয় পার্টির ছিল বলে তার কাছ থেকে শপথ নিতে অনীহা দেখায় বিএনপি। শেষে বিকল্প হিসেবে তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুর রউফ নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়িয়েছিলেন।

ঘটনার সেখানেই শেষ নয়, ১৯৯১ সালের ৫ এপ্রিল যখন সংসদ অধিবেশন বসবে, তখন আবার গোল বাধে, অধিবেশন কার সভাপতিত্বে শুরু হবে। বিদায়ী স্পিকার শামসুল হুদা চৌধুরীকে দিয়ে অধিবেশন শুরু করাতে আপত্তি তুলেছিল সদ্য ক্ষমতায় যাওয়া বিএনপি। শোনা যায়, শামসুল হুদা চৌধুরী তখন বলেছিলেন, অধিবেশনের শুরুতে তার লাশ হলেও সংসদে যাবে। শপথ পড়াতে ডাকা না হলেও অধিবেশনের শুরুটা নিয়ম অনুযায়ী করতে অনড় ছিলেন তিনি।

শেষে শামসুল হুদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়েছিল। তার পরিচালনায় নতুন স্পিকার হিসেবে আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং ডেপুটি স্পিকার হিসেবে শেখ রাজ্জাক আলী নির্বাচিত হওয়ার পর সসম্মানে বিদায় নিয়েছিলেন তিনি।

এবার জুলাই অভ্যুত্থানের পর আবার সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিদায়ী সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন, ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু কারাগারে। শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ কে এম নাসির উদ্দিন নবনির্বাচিতদের শপথ পড়ান।

কিন্তু বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্ব কে করবেন, তা নিয়ে জটিলতা কাটেনি। ফলে সংসদের এ অধিবেশনটির সূচনা হচ্ছে স্পিকারের শূন্য আসন নিয়ে।

সেবারের মতো এবারও ক্ষমতাসীন দল বিএনপি বুধবার দলের সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে জানিয়েছে, সংসদ নেতা তারেক রহমানের প্রারম্ভিক বা স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে এই অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে। বক্তৃতায় তিনি কোনো একজন সংসদ সদস্যকে অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্ব করার আহ্বান জানাবেন এবং সেই সভাপতির সভাপতিত্বেই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ এই প্রক্রিয়া সংবিধান কিংবা সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির সঙ্গে যায় না। কারণ স্পিকার পদত্যাগ করলেও পরবর্তী স্পিকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করা অবধি তিনি পদে আছেন বলেই সংবিধানে রয়েছে। আর ডেপুটি স্পিকার কারাগারে থাকলেও তিনি সংসদ সদস্য পদ হারানোর মতো অযোগ্য এখনও হননি, ফলে প্যারোলে মুক্তি নিয়েও তার আসার সুযোগ ছিল।

কিন্তু তার কিছুই হয়নি। ফলে ত্রয়োদশ সংসদের শুরুই হচ্ছে বিধি উপেক্ষা করে। এমনটা যে হবে, তা বিশ্লেষকরা আগেই ধারণা দিয়েছিলেন। কারণ এবার সংসদ নেতা যিনি হয়েছেন, সেই তারেক রহমান এবারই প্রথম সংসদে গেলেন, বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানেরও এবারই প্রথম আইনসভায় যাওয়া। সংসদ সদস্যদের ৭৫ শতাংশই নতুন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন প্রদীপ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “তাদের অনেকেরই কার্যপ্রণালী বিধি সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা নেই। যে কারণে এবারে সংসদে কিছু কিছু ব্যতিক্রমী বিষয়ও দেখা যেতে পারে।”

সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অধিবেশনে সভাপতিত্বকারীই শুধু নয়, নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারও ঠিক করে দেবেন বলে জানিয়েছেন বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ ও প্রধান হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।

নিয়ম অনুসারে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি মো, সাহাবুদ্দিন। তারপর এরপর নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে অধিবেশনের কার্যক্রম শুরুর পরপরই ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি।

আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ভাষণ বর্জনের ইঙ্গিত এরই মধ্যে দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের নির্বাচনী মিত্র দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

তা যদি হয়, তবে তার সঙ্গেও ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদের শুরুর অধিবেশনের মিল পাওয়া যাবে। ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ যখন ভাষণ দিয়েছিলেন, তখন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা ওয়াকআউট করেছিলেন। দলীয় চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদকে বন্দি রাখার প্রতিবাদ এভাবেই জানিয়েছিলেন তারা।

১৯৯১ সাল আর ২০২৬ সাল, দুই বারেই অভ্যুত্থানের পর গঠিত সংসদের ব্যতক্রিমী যাত্রায় মিল আছে, কাকতালীয়ভাবে দুই রাষ্ট্রপতির নামেও মিল, বর্জনের ঘটনাও মিলতে পারে।

তবে অমিলও আছে কিছু, এর মধ্যে বড় অমিল হচ্ছে, সেবার ক্ষমতাচ্যুত জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৩৫টি আসনে জয়ী হয়ে সংসদেও গিয়েছিল। কিন্তু এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগই পায়নি। ফলে দেশের পুরনো এবং বৃহত্তম দলটিকে বাদ রেখেই যাত্রা শুরু করছে নতুন সংসদ।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads