ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন দেশটির ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ৪৭ বছরের ‘দম্ভকে’ চুরমার করে দিয়েছে। রাজধানী তেহরানসহ বড় শহরের পাশাপাশি প্রত্যন্ত ও ছোট শহরগুলোতেও মানুষ রাস্তায় নেমে আসায় এই বিক্ষোভ ব্যাপক রূপ নিয়েছে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায়।
বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কড়াকড়ি বাড়ানোর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানি কর্তৃপক্ষ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ ও মিত্রদের ওপর হামলার হুমকি দিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের আন্দোলনের মূল বৈশিষ্ট্য এর বিস্তার ও তীব্রতা।
সমাজবিজ্ঞানের গবেষক এলি খোরসান্দফার বিবিসিকে বলছেন, বড় শহরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত এমন সব ছোট শহরে ছড়িয়ে পড়েছে, যেগুলোর নাম অনেকেই আগে শোনেননি।
অতীতেও ইরানে একাধিক আন্দোলন হয়েছে। ২০০৯ সালের নির্বাচন-পরবর্তী আন্দোলন ছিল মূলত শহুরে মধ্যবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ, আর ২০১৭ ও ২০১৯ সালের বিক্ষোভ বেশি দেখা গিয়েছিল দরিদ্র এলাকাগুলোতে।
২০২২ সালে মাহশা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, সেটিকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় গণআন্দোলন বলা হলেও অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এবারের পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত।
ডিসেম্বরের শেষ দিকে ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দরপতনকে কেন্দ্র করে তেহরানের বাজার এলাকায় ধর্মঘট শুরু হয়। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিমাঞ্চলের তুলনামূলক দরিদ্র প্রদেশগুলোতে এবং পরে তা বড় আকার নেয়।
অল্প সময়ের মধ্যেই অর্থনৈতিক দাবির আন্দোলন রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও দীর্ঘস্থায়ী মন্দায় ক্ষুব্ধ হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে “স্বৈরাচার নিপাত যাক” স্লোগান দিতে থাকে।
অনেক জায়গায় বিক্ষোভকারীরা সরাসরি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলী খামেনি ও তার নেতৃত্বাধীন সরকারের পদত্যাগ দাবি করেছে।
এবারের আন্দোলনে একটি নতুন উপাদান হিসেবে সামনে এসেছেন নির্বাসিত বিরোধী নেতা রেজা পাহলভি।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শাহের পুত্র পাহলভি বিদেশ থেকে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তার উপস্থিতি আন্দোলনকারীদের মধ্যে এই ধারণা দিচ্ছে যে সরকার পতনের পর একটি বিকল্প নেতৃত্ব থাকতে পারে।
তবে পাহলভির প্রতি যে সমর্থন দেখা যাচ্ছে, তা রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার চেয়ে বেশি বর্তমান ইসলামি শাসনের বিকল্প শক্ত নেতৃত্বের অভাব থেকে জন্ম নেওয়া হতাশার প্রতিফলন বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও এবারের আন্দোলনকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের সমর্থন জানিয়ে কঠোর বক্তব্য দিয়েছেন, যা অতীতের আন্দোলনগুলোতে দেখা যায়নি। অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আন্দোলনকারীদের বিদেশি শক্তির মদদপুষ্ট বলে অভিযুক্ত করেছেন।
একই সঙ্গে আঞ্চলিক রাজনীতিতেও ইরানের অবস্থান আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে। সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের পতন, ইসরায়েলের হামলায় হিজবুল্লাহর ক্ষয়ক্ষতি- সব মিলিয়ে তেহরানের প্রভাববলয় সংকুচিত হচ্ছে বলে ধারণা করছেন অনেকেই।
এই আন্দোলন শুরু হয়েছে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার পরপরই।
সাংবাদিক আব্বাস আবদি বিবিসিকে বলেন, এই পরিস্থিতি সরকার চাইলে জনগণের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারত, কিন্তু তা কাজে লাগানো হয়নি।
সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর ভাবমূর্তিও সাধারণ মানুষের চোখে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
আর এ কারণেই হয়তো এবার নারীরাও আগের তুলনায় বেশি সংখ্যায় রাস্তায় নেমেছেন।
খোরসান্দফারের ভাষায়, “এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো ভয় ভেঙে যাওয়া। অনেক নারী বলছেন, দমনমূলক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভয় কাটিয়ে রাস্তায় নামতে পারাটাই তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।”
সব মিলিয়ে, অর্থনৈতিক অসন্তোষ, রাজনৈতিক ক্ষোভ, বিদেশি চাপ ও নেতৃত্বের নতুন ইঙ্গিত—এই সবকিছু একত্র হয়ে ইরানের চলমান আন্দোলনকে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আলাদা ও নজিরবিহীন করে তুলেছে।



