বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজানো, ফুল হাতে শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়াও এখন সন্ত্রাসী কাজ!

গ্রেপ্তার হওয়ার আগে শনিবার রাতে শাহবাগ থানার সামনে শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিসহ অন্যরা মারধরের শিকার হন। ছবি ভিডিও থেকে নেওয়া
গ্রেপ্তার হওয়ার আগে শনিবার রাতে শাহবাগ থানার সামনে শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিসহ অন্যরা মারধরের শিকার হন। ছবি ভিডিও থেকে নেওয়া

ঐতিহাসিক ৭ মার্চ পালনের মধ্যে ঢাকায় গ্রেপ্তার হলেন সাতজন। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে। অথচ তাদের তিনজন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি বাজিয়েছিলেন। অন্য চারজন বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিলেন ফুল নিয়ে।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের কাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা এলে ৭ই মার্চও বাংলাদেশে পড়ে গেছে আড়ালে। ১৯৭১ সালের এই দিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বজ্রকণ্ঠে ভাষণে বলেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

স্বাধীনতার স্থপতির এই ভাষণই ছিল স্বাধীনতার দিক-নির্দেশনা। এই ভাষণের ধারায় আসে ২৬ মার্চের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের পর পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয়ের মধ্য দিয়ে জন্ম হয় বাংলাদেশের।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় বসে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার বঙ্গবন্ধুর নাম সব কিছু থেকে মুছে ফেলার কাজটি অনেকটাই সেরে ফেলে। নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পরও সেই ধারাই চলছে।

৭ মার্চ পালনে শনিবার সকালে ঢাকার ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধু ভবনের দিকে ফুল নিয়ে যাওয়ার পথে চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে পাঠানো হয় কারাগারে।

সেদিন দুপুরে চানখাঁরপুল এলাকায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সাউন্ড বক্সে বাজানোর সময় শহীদুল্লাহ হল শাখা ছাত্রলীগের কর্মসংস্থান সম্পাদক আসিফ আহমেদকে ধরে নিয়ে যায় শাহবাগ থানার পুলিশ।

সেই খবর শুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল সংসদের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি প্রতিবাদ জানান।

গ্রেপ্তার হওয়ার আগে শনিবার রাতে শাহবাগ থানার সামনে শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি। ছবি ভিডিও থেকে নেওয়া

তিনি ফেসবুকে লেখেন, “চাঁনখারপুল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে, তাকে না ছাড়া পর্যন্ত প্রত্যেকদিন ক্যাম্পাসে ৭ মার্চের ভাষণ বাজাইতে চাই। কে কে সাথে থাকবেন?”

ইমি ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে শামসুন্নাহর হল ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি প্রার্থী হয়েছিলেন স্বতন্ত্র জোট থেকে।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন ইমি। তিনি সাংস্কৃতিক সংগঠন স্লোগান-৭১-এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। যুক্ত ছিলেন স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের সংগঠন বাঁধনের সঙ্গে। গত বছর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে ইমি বাম সমর্থিত একটি প্যানেল থেকে ভিপি প্রার্থী হয়েছিলেন, তবে খুবই অল্প ভোট পান।

ইমি শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে শাহবাগ থানার সামনে অবস্থান নিয়ে মাইকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজানো শুরু করেন। তার সঙ্গে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ছাত্রলীগের সহসম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ কয়েকজন।

এ সময় ছাত্রশবিরের কয়েকজন এসে ইমিকে বাধা দেয়। এসময় মামুনকে মারধর করা হয়। এরপর তাকে ও ইমিকে থানার ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হলে পুলিশ তাদের আটক করে রাখে।

রোববার ইমি, মামুন ও আসিফের বিরুদ্ধে ‍সন্ত্রাসবিরোধী আইনে শাহবাগ থানার মামলা করে পুলিশ। তারপর তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারগারে পাঠানো হয়।

মামলায় বলা হয়, আসামিরা সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রের উদ্দেশে নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম সচলের চেষ্টা করেন। তাঁরা পুলিশের কাজেও বাধা দিয়ে থানা হেফাজতে আটক থাকা আসিফ আহমেদ সৈকতকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।

তাদের এভাবে গ্রেপ্তার এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেওয়ার সমালোচনা চলছে ফেসবুকে।

শেখ তাসনিম আফরোজ ইমির মুক্তি দাবিতে এই কার্ড ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকে।

লেখক মহিউদ্দিন মোহাম্মদ লিখেছেন, “মামলা করে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করলো, ৭ই মার্চের ভাষণ বাজানো কেবল অপরাধ নয়, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড!”

তিনি আরো লেখেন, “কল্পনা করুন বিষয়টা। ক্ষমতায় বিএনপি, ৭ই মার্চের ভাষণ বাজাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র, যেটির নেতৃত্বে ছিলেন একজন নারী শিক্ষার্থী শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি, যেই ইমি পুরো ছাত্রজীবনে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে রাজপথে শ্লোগান দিয়েছেন, সংগ্রাম করেছেন! এবং তাদেরকে কেবল মুক্তিযুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অংশ ৭ই মার্চের ভাষণ বাজানোর কারণে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হলো! পুলিশে দেয়া হলো রাজাকারদের দিয়ে! কী বলবো? ক্ষমতায় কে? বিএনপি নাকি রাজাকাররা?”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক সামিনা লুৎফা লিখেছেন, “ইমি আমার ছাত্রী। ওর সব মতামত আর কাজকে আমি সমর্থন করি না৷ কিন্তু বিএনপি সরকারের পুলিশের কাছে জানতে চাই, ৭ মার্চের ভাষণ বাজানো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কেন হবে!

“এসব ফাজলামো বন্ধ করেন। আর যারা থানার সামনে নাগরিকদের উপর হামলা করে তাদের খুজে বের করুন আর শাস্তির ব্যবস্থা করুন। আইনের ডিউ প্রসেস টপকানো বন্ধ করুন! ইমিকে নিঃশর্ত মুক্তি দিন। আসুন, সবাই প্রতিদিন সকালে এক বার করে ৭ই মার্চের ভাষণ শুনি।”

আওয়ামী লীগও এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে। দলটির ফেসবুক পেজে এক পোস্টে বলা হয়, “৭ই মার্চের ভাষণ বাজানোর ‘তাদের ভাষায় অপরাধে’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গ্রেফতার ও হামলা করা হয়েছে। এর প্রতিবাদ করুন আপনার সোশ্যাল একাউন্টে। তাদেরকে জানিয়ে দিন- বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সমার্থক শব্দ। মব করে, প্রশাসন দিয়ে ইতিহাসকে দমন করা যায় না।”

এ সম্পর্কিত আরও খবর:

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads