মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা মব সন্ত্রাস যেন থামানোই যাচ্ছে না। শুধু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এ ধরনের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ১৯৭ জন, যা আগের বছরের তুলনায় ৭১ জন বেশি।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) বাৎসরিক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
সেইসঙ্গে বেড়েছে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন, কারা হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক সহিংসতা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা।
আসক বলেছে, কোনো ধরনের প্রমাণ, তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে, সন্দেহ, গুজব সৃষ্টি করে মানুষকে মারধর ও হত্যা করা হয়েছে। ‘তৌহিদি জনতার’ নামে বেআইনিভাবে মব তৈরি করে শিল্প-সংস্কৃতি কেন্দ্র ভাঙচুর, বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা—এমনকি কবর থেকে তুলে লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে।
মুক্তিযোদ্ধাসহ বিরুদ্ধ মতের মানুষকে নানাভাবে হেনস্তা করার ঘটনাও ঘটছে প্রতিনিয়ত। এসব ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে উদাসীনতার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে।’
আসকের হিসাব অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মব সন্ত্রাসে কমপক্ষে ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছিলেন অন্তত ১২৮ জন। অন্তর্বর্তী সরকারের এই সময়কালে কমপক্ষে ২৯৩ জন মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন।
আসকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ২০২৫ সালে ঢাকা জেলায় সর্বাধিক ২৭, গাজীপুরে ১৭, নারায়ণগঞ্জে ১১, চট্টগ্রামে ৯, কুমিল্লায় ৮, ময়মনসিংহে ৬, বরিশালে ৬, নোয়াখালীতে ৬, গাইবান্ধায় ৬, শরীয়তপুরে ৬, লক্ষ্মীপুরে ৫, সিরাজগঞ্জে ৫, টাঙ্গাইলে ৫, নরসিংদীতে ৪, যশোরে ৪ জনসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় মব সন্ত্রাসে কমপক্ষে ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন।
হেফাজতে মৃত্যু ১০৭ জনের
২০২৫ সালে কমপক্ষে ১০৭ জন দেশের বিভিন্ন কারাগারে মারা গেছেন। এর মধ্যে ৬৯ জন হাজতি এবং কয়েদি ৩৮ জন। সারা দেশের কারাগারগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মারা গেছেন ৩৮ জন এবং এরপর রয়েছে গাজীপুর, যেখানে ৭ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া বাকিদের মৃত্যু হয়েছে দেশের অন্যান্য কারাগারে।
২০২৪ সালে দেশের কারাগারগুলোতে ৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। যার মধ্যে হাজতি ৪২ এবং কয়েদি ছিলেন ২৩ জন।
১৪ জুন ২০২৫ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ঢাকা জেলার সাভার এলাকার বিরুলিয়া ইউনিয়নের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান সুজনের (৪৫) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কারা কর্তৃপক্ষ এটিকে আত্মহত্যা বললেও আসকের কাছে পরিবারের দাবি অনুযায়ী তিনি হৃদ্রোগে ভুগছিলেন এবং কারাগারে যথাযথ চিকিৎসা পাননি। পাশাপাশি তিনি আত্মহত্যা করতে পারেন বলে পরিবার মনে করে না।
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন জেল হেফাজতে থাকাকালীন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ আউটপোস্টের ইন্সপেক্টর মো. ফারুকের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে আগের দিন হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং ২৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ২০ মিনিটে তিনি মারা যান।
তবে মৃত্যুর পর একটি বিষয় জনপরিসরে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ছবিতে দেখা যায়, মৃত্যুর পরও তাঁর হাতে হাতকড়া পরানো অবস্থায় তাঁকে বহন করা হয়েছে।
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ দাবি করে আসছে, তাদের নেতাকর্মীদের নির্যাতন করে কারাগারে হত্যা করা হচ্ছে।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
২০২৫ সালে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনাও অব্যাহত ছিল। আসকের তথ্য সংরক্ষণ ইউনিটের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কমপক্ষে ৩৮ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনা সংঘটিত হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে, নির্যাতনে, কথিত ‘গুলিতে’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে। বছরের বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত এসব ঘটনা আবারও প্রমাণ করে যে বিচারিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ একটি চলমান মানবাধিকার সংকট হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে।
২০২৫ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যার ৩৮টি ঘটনার মধ্যে শারীরিক নির্যাতন, যৌথ বাহিনীর হেফাজতসহ তথাকথিত ‘গুলিতে’ বা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন ২৬ জন। এ ছাড়া কমপক্ষে ১২ জন দেশের বিভিন্ন থানায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যুবরণ করেছেন। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ২১ জন।
রাজনৈতিক সহিংসতা
আসক বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা একটি চরম ও ধারাবাহিক রূপ ধারণ করেছে, যা ২০২৫ সালে আরও বিস্তৃত ও সহিংসতর হয়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশে অন্তত ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রায় ৪ হাজার ৭৪৪ জন আহত এবং ১০২ জন নিহত হয়েছেন।

আসকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে অন্তত ৩৫টি সংঘর্ষের ঘটনায় ৪৫৪ জন আহত এবং নিহত হয়েছেন ১০ জন; বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ৩৩টি সংঘর্ষের ঘটনায় ৫২০ জন আহত এবং ৩ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে ৪টি সহিংস সংঘর্ষের ঘটনায় শতাধিক আহত হয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, দলীয় অভ্যন্তরীণ সহিংসতার মাত্রা বিশেষত বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফলে ১৯২টি সংঘর্ষে অন্তত ৩৯ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২ হাজার ৩৮০ জন।
আসক বলছে, এসব ঘটনা রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের সংকট ও সহিংসতার সংস্কৃতিকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। এ ছাড়া সারা দেশে দুর্বৃত্তদের হামলা, নির্যাতন ও গুলিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কমপক্ষে ১১১ জন নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন।
সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানি
২০২৫ সালে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও আইনি নিপীড়নের ঘটনা একটি উদ্বেগজনক ধারায় পৌঁছেছে বলে মনে করে আসক।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে অন্তত ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারা নির্যাতন, হয়রানি বা হুমকির শিকার হয়েছেন অন্তত ২৩ জন সাংবাদিক। প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন ২০ জন। প্রকাশিত সংবাদ বা মতামতকে কেন্দ্র করে মামলার সম্মুখীন হয়েছেন কমপক্ষে ১২৩ জন সাংবাদিক। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সরাসরি হামলার শিকার হয়েছেন ১১৮ জন সাংবাদিক। এ সময়কালে দুর্বৃত্ত কর্তৃক হত্যার শিকার হয়েছেন ৩ জন সাংবাদিক এবং দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে রহস্যজনকভাবে ৪ জন সাংবাদিকের লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে।
আসক বলেছে, ‘এ সময়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হুমকির মধ্যে পড়েছে। গণমাধ্যমের ওপর বাংলাদেশের ইতিহাসের জঘন্যতম হামলা হয়েছে ১৮ ডিসেম্বর। এ দিন রাতে একদল প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে নজিরবিহীনভাবে ভাঙচুর, লুটতরাজ ও আগুন–সন্ত্রাস চালায়। এই হামলার ফলে সেখানে কর্মরত সংবাদকর্মীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন। এমনকি হামলার সময় ফায়ার সার্ভিসের কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনাও ঘটে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। এর ফলে পত্রিকা দুটির ইতিহাসে মুদ্রিত ও অনলাইন সংস্করণ এক দিনের জন্য বন্ধ রাখতে হয়।’
ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, ভয়ভীতি, লুটপাট, আগুন ও প্রতিমা ভাঙচুরের মতো একাধিক সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এই বছর হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর কমপক্ষে ৪২টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই হামলাসমূহে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৩টি বাড়িঘর, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ৩৬টি বসতঘরে। এ ছাড়া ৪টি মন্দিরে হামলা, ৬৪টি প্রতিমা ভাঙচুর, ৯টি জমি দখলের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ জন, আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৫ জন।
একই সময়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মন্দিরে ১টি হামলার ঘটনা ঘটে। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, রাজনৈতিক বিদ্বেষ ও ভূমি দখলের প্রবণতা এ ধরনের সহিংসতার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে, যা সংবিধানপ্রদত্ত ধর্মীয় স্বাধীনতার লঙ্ঘন। ২০২৫ সালে মব তৈরি করে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে। কখনো এক বা একাধিক ব্যক্তির ওপর হামলা, পুরো সম্প্রদায়ের ওপর হামলা করে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠনের মতো ঘটনা ঘটে।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মণীন্দ্র কুমার নাথ প্রথম আলোকে বলেন, সংখ্যালঘুদের অধিকারকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়নি সরকারের কোনো স্তর থেকে; বরং সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়নকে উপেক্ষা করা হয়েছে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বছরের বিভিন্ন সময়ে মব সন্ত্রাস, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে বলে মনে করেন আসকের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবীর।
তিনি সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে বলপ্রয়োগ ও জবাবদিহির ঘাটতি আইনের শাসনের ওপর আস্থা আরও দুর্বল করেছে।
“একই সঙ্গে সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের ওপর হামলা, সাংবাদিকদের ভয়ভীতি ও চাপ মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করেছে, যা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য গভীরভাবে রেখাপাত করেছে।”
আবু আহমেদ ফয়জুল কবীর আরও বলেন, নারীর চলাচল, পোশাক ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক নারীর মৌলিক অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং মানবাধিকার সুরক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সহনশীলতার সংকটের প্রতিফলন।



