মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতার স্বাদ

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভেঙ্গে ফেলা হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এরকম সকল প্রতিকৃতি।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভেঙ্গে ফেলা হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এরকম সকল প্রতিকৃতি।

১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর থেকে ৫২তে পাকিস্তানের পূর্বাংশে ভাষা সংগ্রামে জীবনদান মায়ের ভাষার দাবি অর্জনসহ প্রতি পদে পদে পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য, লাঞ্ছনা,বঞ্ছনা,অপমান, পূর্বাংশের মানুষের জীবনের অংশে হয়ে দাঁড়িয়েছিল।পশ্চিম অংশের শোষণে অতিষ্ঠ বাঙালি। পাকিস্তানে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা ছিল অর্ধেকেরও বেশি। তারপরেও আমরা ছিলাম একপ্রকার দয়ারপাত্র। বাঙালি অপমান সহ্য করেছে কিন্তু ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছে প্রতিবাদ, প্রতিরোধের প্রস্তুতি, যার ভিত্তি একদিনে তৈরি হয়নি।

বাঙালির প্রথম বড় বিস্ফোরণ ঘটে ওই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে। সেই আন্দোলন শুধু ভাষার দাবি ছিল না; এটি ছিল বাঙালির সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম। ইতিহাসবিদদের মতে, ভাষা আন্দোলনই পরবর্তী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে (তথ্যসূত্র: বদরুদ্দীন উমর, ভাষা আন্দোলন ও তার পটভূমি)।

আর ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ হচ্ছে আমাদের জাতীয় জীবনের ‘টার্নিং পয়েন্ট’। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এই ২৩ বছর অনেক উত্থান-পতন, লড়াই-সংগ্রাম জীবন দানের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ মাসে আসে সেই ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। জ্বরে আক্রান্ত শরীর আর ঘরে বাহিরে অনেক চাপ মাথায় নিয়ে নিজের চিন্তা ও কৌশলে স্বাধিকারের আওয়াজ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। খুব দীর্ঘ ছিলো না সেই ভাষণ। ঘোষণা দিলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” ১৮ মিনিটের বক্তব্যের মধ্য দিয়েই মূলত অসহযোগের ডাক দিয়ে স্বাধীনতার পথে হাঁটলেন বঙ্গবন্ধু (তথ্যসূত্র: সেলিনা হোসেন সম্পাদিত, ৭ মার্চের ভাষণ: প্রেক্ষিত ও বিশ্লেষণ)।

এর মধ্য দিয়েই তিনি দেশের মানুষ ও বিশ্ববাসীকে স্বাধীনতার বার্তা দিয়েছিলেন। বিশেষত স্বীকার করতেই হয় বঙ্গবন্ধু ছিলেন ঘটনার কেন্দ্রীয় চরিত্র। এই সংগ্রামে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা হিসেবে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামান, যারা পরবর্তীকালে মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

একই সঙ্গে ছাত্রসমাজও এই আন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। সিরাজুল আলম খান, কাজী আরেফ আহমেদ, আব্দুর রাজ্জাক, শেখ ফজলুল হক মনি, তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকী, আব্দুল কুদ্দুস মাখনসহ বহু ছাত্রনেতা কেন্দ্র থেকে নানা প্রান্তে জনগণকে সংগঠিত করেন। তাদের সক্রিয় ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

আর বঙ্গবন্ধুর নিজের বুদ্ধি, যুক্তি,পরিশ্রম, মাটি ও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আর অন্তর জ্বালাময় বক্তব্য- যা মানুষকে স্বপ্নবান করেছিল। ছয়দফা ম্যাজিকের মতন কাজ করেছে। আর তা প্রণয়নে বঙ্গবন্ধুর সহযোগী ছিলেন তাজউদ্দিন আহমদ, রেহমান সোবহান, নুরুল ইসলাম,আনিসুর রহমান, খোন্দকার মো. ইলিয়াস, বুদ্ধিজীবী খায়রুল কবির, কামরুজ্জামান আহমেদ চৌধুরী এবং খান সারোয়ার মুর্শেদ। মুক্তির সংগ্রামে ছাত্রদের ১১ দফা বাড়তি শক্ত জুগিয়েছিল তথ্যসূত্র: রেহমান সোবহান, From Two Economies to Two Nations)।

৭০ এর নির্বাচনে পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি ছিল বাঙালি। তাদেরই ভোট বিজয় এনে দেয় আওয়ামী লীগকে। আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে বিজয়ী হয় এবং স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে (তথ্যসূত্র: ইলেকশন কমিশন অব পাকিস্তান, ১৯৭০)। সে সময় পাকিস্তানকে অবিভক্ত রাখতে ধর্মকে বর্ম করে, পাকিস্তান শাষকদের পক্ষ নিয়েছিলো কিছু দল ও নেতা। ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামী, কনভেনশন মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামী ও পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। এই দলগুলো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহায়তায় রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী গঠন করে বাঙালি নিধনযজ্ঞে অংশ নেয়। আর এই বিরোধিতায় অন্যতম নেতৃত্ব দানকারী হিসেবে যার নাম আসে তিনি গোলাম আযম।

ভোটে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তরে বিলম্ব, ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং সামরিক শাসনের দমননীতির ফলে পরিস্থিতি দ্রুত সংঘাতের দিকে এগিয়ে যায়, যা পরবর্তীতে বাঙালিকে যুদ্ধে যেতে বাধ্য করে, আসে ৭ মার্চ, ১৯৭১। সবাইকে ছাপিয়ে নিজ গুণে তখন বাঙালির মনজগতে স্থীর আসন বঙ্গবন্ধুর। তিনি তখন একমাত্র নেতা যার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করে ঠিক কতদূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব? বঙ্গবন্ধুর ডাকে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে, যা চিরন্তন সত্য।

কাউকে কাউকে ইদানিং বলতে শুনি- পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থেকে বঙ্গবন্ধু কীভাবে বাঙলার স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নেত! ভুলে গেলে চলবে না, তিনিই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা। যুদ্ধকালে বঙ্গবন্ধুর জন্য হাজারো মানুষ রোজা রেখেছেন, প্রার্থনা করেছেন। কারণ, তারা জানতেই এই লড়াইয়ে পরাজিত হলে বঙ্গবন্ধুকে বরণ করে নিতে হতো রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে ফাঁসির দণ্ড। মৃত্যুদণ্ড মেনে নেওয়া ছাড়া আর কীইবা করার ছিল তার?

বঙ্গবন্ধু জীবনভর বাঙালির অধিকারের জন্য লড়েছেন; জেল, জুলুম, হুলিয়া ছিল তার নিত্যসঙ্গী। ভারত ও পাকিস্তান বিভাজনের পর ১৯৪৮ তেকে ১৯৭১ পর্যন্ত সময়ে ১৩ বছরের বেশি সময় কারান্তরীণ থাকতে হয়েছে তাকে। আত্মত্যাগী, সাহসী , মানবদরদি মানুষটা সর্বোচ্চ না হলেও, ন্যূনতম শ্রদ্ধা পাবেন, এটাই স্বাভাবিক।

বর্তমানে বিএনপি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। যে দলের প্রতিষ্ঠাতা মুক্তিযুদ্ধের জেড ফোর্সের প্রধান শহীদ প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান, বীর উত্তম। ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর নামে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। ১৯৭২ সালে তিনি একটি নিবন্ধে লিখেছিলেন: ‘একটি জাতির জন্ম’, যেখানে বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার অপরিসীম শ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে। ৭২ সালের ২৬ মার্চ দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত হয় ওই নিবন্ধ।

সেই জিয়ার ছেলে যখন ক্ষমতায়, যখন তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী, তার শাসন পরিচালনার শুরুতেই কেন তাহলে ৭ মার্চ অবহেলিত হলো! এটা কি আপস নাকি কৌশলি অবস্থান? অথচ জনাব তারেক রহমানের হাতে মুক্তিযুদ্ধ নিরাপদ থাকবে এটাই প্রত্যাশিত ছিল অনেকের কাছে।

১৯৭১ এ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শাসকরা আমাদের বিজয়কে পরাস্ত করতে চেয়েছিল। ৫৫ বছর পরে আজ আমরা আমেরিকার শুল্ক, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা চুক্তির মতো নানা জালে আবদ্ধ। এটা কি চুক্তির নামে পুরানো প্রতিশোধ? আমেরিকা – ইসরাইলের আক্রমণে জ্বলছে ইরান, আর পুড়ছে বিশ্ববাসীর শান্তির বাসনা।

৭ মার্চকে উপেক্ষা করে কি ২৬ মার্চ বা ১৬ ডিসেম্বরের ইতিহাস পূর্ণতা পায়? বাস্তবে এই তিনটি দিন একই ধারার অংশ। ৭ মার্চের আহ্বান, ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়। এই ধারাবাহিকতাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ণ ইতিহাস। এর কোনো একটি অংশকে অস্বীকার করলে স্বাধীনতার সেই পূর্ণ স্বাদ অপূর্ণই থেকে যায়।

ভুলে গেলে ইতিহাসের প্রতি ভীষণ অবিচার করা হবে- সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বপ্নকে সামনে রেখে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ এক অসম যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তখন দেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে সাত কোটি। প্রশিক্ষিত ও সুসজ্জিত পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ ছিল মূলত সাধারণ মানুষের যুদ্ধ, এককথায় জনযুদ্ধ। সেই সংগ্রামে লাখো মানুষ জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছে স্বাধীনতার জন্য।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দমন–পীড়নের মুখে প্রায় এক কোটির বেশি মানুষ শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়, যা সে সময়ের বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী সংকট হিসেবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে (তথ্যসূত্র: ভারত সরকার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রতিবেদন, ১৯৭১)। ভারতের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী অঞ্চলে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয়ে শরণার্থী শিবির গড়ে ওঠে এবং সেখানেই অনেক মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ কমান্ড পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে এই যৌথ বাহিনীর আক্রমণের মুখেই পাকিস্তানি বাহিনী পরাজিত হয়। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে প্রায় ৩,৯০০-এর বেশি ভারতীয় সৈন্য শহীদ হন (তথ্যসূত্র: ভারত সরকার, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, নাইনটিন সেভেনটি ওয়ান ওয়ার রেকর্ডস)। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে তাঁদের এই আত্মত্যাগও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধ কোনো ধর্মীয় যুদ্ধ ছিল না; বরং এটি ছিল একটি জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতার লড়াই। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, সব ধর্মের মানুষই একই লক্ষ্য নিয়ে লড়াই করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে ধর্ম নয়, দেশপ্রেমই ছিল মানুষের প্রধান পরিচয়। এর বিপরীতে যদিও পাকিস্তানি সামরিক জান্তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মকে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা সেই বিভাজনকে অতিক্রম করে একটি অসাম্প্রদায়িক জনযুদ্ধের রূপ নেয়।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন পেয়েছিল এই লড়াইয়ে। বিশেষ করে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কূটনৈতিক সহায়তা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে (তথ্যসূত্র: ইউএন সিকিউরিটি কাউন্সিল ডিবেটস, ১৯৭১)। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠন পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করে।

এই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে অসীম ত্যাগের বিনিময়ে। বাংলাদেশ সরকারের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হন এবং প্রায় দুই লাখ নারী নির্যাতনের শিকার হন (তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সরকার, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়)। এই ত্যাগের ইতিহাস আমাদের জাতীয় চেতনার ভিত্তি।

কিন্তু কোথা থেকে এলো এমন জীবন বিলিয়ে দেওয়ার চেতনা, কোথায় পেল বাঙালি এমন অসীম সাহস? যে যেভাবেই ইতিহাসে ঘষামাজা করুক না কেন, এটা মেনে নিতেই হবে যে এই সংগ্রামের রাজনৈতিক ও নৈতিক দিকনির্দেশনা এসেছিল মূলত ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ থেকেই। সেই ভাষণই বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা বা বিতর্ক থাকতেই পারে। এটাই গণতান্ত্রিক বাস্তবতা। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা বা অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

বঙ্গবন্ধু নিজেই একাধিকবার বিভিন্ন জায়গায় ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছেন, “আমি ফেরেশতা নই, শয়তানও নই; আমি মানুষ। মানুষ হিসেবে আমার ভুল হতেই পারে।” তাঁর এই বক্তব্য বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সততা ও আত্মসমালোচনার মানসিকতা ফুটিয়ে তোলে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বামপন্থী রাজনীতিও বিভিন্নভাবে এই সংগ্রামে যুক্ত ছিল। যদিও বামপন্থী শক্তিগুলো তখন নানা ধারায় বিভক্ত ছিল, তবু অনেক সংগঠন সক্রিয়ভাবে স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ববাংলা সমন্বয় কমিটি’ একটি জনসভায় ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’ প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি ঘোষণা করে, যার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন রাশেদ খান মেনন। ইতিহাসবিদদের মতে, এই কর্মসূচি স্বাধীনতার প্রশ্নে বামপন্থী রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানকে তুলে ধরে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এসেছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে ঘিরে। ২০১৭ সালে ইউনেস্কো এই ভাষণকে “মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার”-এ অন্তর্ভুক্ত করে, যা বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত (তথ্যসূত্র: ইউনেস্কো, মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টার, ২০১৭)। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক ভাষণ নয়; এটি একটি জাতির মুক্তির সংগ্রামের ঐতিহাসিক দলিল।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়, যে ভূখণ্ডের মানুষ স্বাধীনতার জন্য এত ত্যাগ স্বীকার করেছে, সেই মানুষের কাছে কি সত্যিই গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও অসাম্প্রদায়িকতার স্বপ্ন পূর্ণতা পেয়েছে? আজও সমাজে বিভাজন, অসহিষ্ণুতা, দুর্নীতি ও সহিংসতা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করে। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে হলে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে নতুন করে ধারণ করা জরুরি। কারণ ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়- জনগণ যখন রাষ্ট্রের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখনই রাষ্ট্র শক্তিশালী ও স্থিতিশীল হয়।

পরিশেষে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, ৭ মার্চকে উপেক্ষা করে কি ২৬ মার্চ বা ১৬ ডিসেম্বরের ইতিহাস পূর্ণতা পায়? বাস্তবে এই তিনটি দিন একই ধারার অংশ। ৭ মার্চের আহ্বান, ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়। এই ধারাবাহিকতাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ণ ইতিহাস। এর কোনো একটি অংশকে অস্বীকার করলে স্বাধীনতার সেই পূর্ণ স্বাদ অপূর্ণই থেকে যায়।

সাব্বাহ আলী খান কলিন্স: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads