বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করার অপরাধে পিটিয়ে শাহবাগ থানার সামনে ফেলে যাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে পুলিশের হেফাজতে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সোমবার ভোররাতে রোজা রাখার জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে সেহরি খেতে গিয়ে মারধরের শিকার হন রাহিদ খান পাভেল নামে ওই শিক্ষার্থী।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) দর্শন বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী তিনি।
এদিকে এ ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে রাতে শাহবাগ থানায় একটি মামলা হয়েছে। ১০ জনকে এজাহারনামীয় ও ১০-১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে ওই মামলায়।
শাহবাগ থানার একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গোয়েন্দা পুলিশ ও র্যাব আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করতে কাজ শুরু করেছে।
মামলায় এক নম্বর আসামি করা হয়েছে ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০২১-২২ সেশনের শিক্ষার্থী সাইফুল্লাহকে। নাম উল্লেখ করা অন্যান্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন, হাসিব-আল-ইসলাম, সাঈদ আফ্রিদি, রিয়াদ মাল, সর্দার নাদিম শুভ, মো. সাকিব, ফোরকান উদ্দিন মহি, বায়েজিদ হাসান, হিমেল, সজীব হোসেন।
মারধরের শিকার পাভেল জানিয়েছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক ঢাবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হাসিবুল ইসলাম, একই বর্ষের দর্শন বিভাগের সর্দার নাদিম মাহমুদ শুভ, জাতীয় ছাত্রশক্তির সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ সাইফুল্লাহসহ বেশ কয়েকজন তাকে মারধর করে থানার সামনে ফেলে যায়।

সর্দার নাদিম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ছিলেন। পরবর্তী তিনি গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদে যুক্ত হয়েছিলেন।
সোমবার ভোররাতের ঘটনা সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বুয়েট ক্যান্টিনে সেহরি খেতে গিয়ে আক্রান্ত হন পাভেল। এ সময় ৭ মার্চের ভাষণ ফেইসবুকে কেন শেয়ার করেছে তা নিয়ে তার সঙ্গে তর্কে জড়ান হাসিবসহ বাকিরা।
এক পর্যায়ে ঘটনাস্থলে একদফা মারধর করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিয়ে গিয়ে কয়েক দফা পেটানো হয় পাভেলকে।
আক্রান্ত ওই শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, মারধরে অবস্থার অবনতি হলে অভিযুক্তরা তড়িঘড়ি করে তাকে শাহবাগ থানার সামনে ফেলে যায়।
পরে রক্তাক্ত অবস্থায় পাভেলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করায় পুলিশ।
এ ঘটনার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। অনেকেই ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে তোফাজ্জল হোসেন নামে একজনকে পিটিয়ে হত্যার বর্বরতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
মানসিকভাবে অসুস্থ তোফাজ্জলকে সেদিন খাবার খাইয়ে পিটিয়ে হত্যা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী, যা নিয়ে সেসময় ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
৭ মার্চের ভাষণ ফেইসবুকে শেয়ার করার ‘অপরাধে’ পাভেল নামে ওই শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনা নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট মহিউদ্দিন মোহাম্মদ ও আলোচিত অ্যাক্টিভিস্ট ও সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের।
মারধরের ঘটনার পর থেকে ফেইসবুকে একাধিক পোস্ট দিয়েছেন মহিউদ্দিন মোহাম্মদ। একটি পোস্টে তিনি লেখেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে পুলিশ মামলা নিচ্ছে। এতিম ছেলে পাভেলকে সেহরির টেবিল থেকে উঠিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে জখম করার ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের বর্তমান অবস্থান জানিয়ে সহযোগিতা করুন। তাদের কাউকে ছাড়া হবে না।”
অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “জড়িতদের ধরতে পুলিশকে সহযোগিতা করুন।”

অপর একটি পোস্টে অভিযুক্তদের একজনের ছবি জুড়ে দিয়ে তিনি লেখেন, “এতিম ঢাবি ছাত্র পাভেলকে সেহরি খাওয়ার টেবিল থেকে উঠিয়ে পিটিয়ে জখমকারী আসামী সাইফুল্লাহ নিজেই ছাত্রলীগ করতো! গুপ্ত শিবির হিসেবে মেতে ছিলো মুজিব বন্দনায়।”
যদিও সাইফুল্লাহ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, তিনি মারধরের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত নন। ছাত্রলীগ ইস্যু থাকায় তিনি কেবল ফেইসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন।
পাভেল ‘খুবই ভালো বন্ধু’ বলেও দাবি করেন অভিযুক্ত সাইফুল্লাহ, যার ছবি ও ফেইসবুকে দেওয়া পোস্ট এরইমধ্যে সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে গেছে।
এ সম্পর্কিত আরও খবর:


