বাংলাদেশের অনেকের জন্য বছরের শুরুতেই দুঃসংবাদ এল ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেশ থেকে। যারা যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণে কিংবা ব্যবসায়িক কাজে যেতে চান, তাদের এখন ভিসা ফির সঙ্গে জামানত হিসেবে জমা দিতে হবে ৬ থেকে ১৮ লাখ টাকা। একে বলা হয় ভিসা বন্ড। এই অর্থ অবশ্য ফেরত পাওয়া যাবে, তবে শর্ত ভাঙলে তা হারাবার ঝুঁকিও রয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে অভিবাসন ঠেকানোর নানা ফিকির খুঁজছেন। এর ধারবাহিকতায় গত আগস্টে ভিসা বন্ড চালু করেন পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে। দুটি দেশ দিয়ে শুরু হয়েছিল, পরে আরো পাঁচটি দেশ যুক্ত হয়। মঙ্গলবার একসঙ্গে ৩১টি দেশকে ভিসা বন্ডের আওতায় আনার ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর।
এই তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায়, আফ্রিকার দেশ উগান্ডা থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানও রয়েছে এখানে।
কেন এই বন্ড, কাদের জন্য
অভিবাসন ঠেকানোর যে পরিকল্পনা ধরে ট্রাম্প এগোচ্ছেন, তার ধারাবাহিকতায় এই ভিসা বন্ডের কৌশল নেয়া হয়েছে। গত বছর হোয়াইট হাউজে যাওয়ার পর অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর পাশাপাশি অভিবাসী কমাতে নানা নির্বাহী আদেশে সই করে চলেছেন তিনি।
অবৈধভাবে বসবাসরত কারো সন্তান এখন আর জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাচ্ছেন না। দক্ষ বিদেশি কর্মী হিসেবে বা এইচ-ওয়ান বি ভিসায় যুক্তরাষ্ট্র যেতে বাড়তি এক লাখ ডলার গুণতে হচ্ছে এখন।
তার সঙ্গে এখন যোগ হলো ভিসা বন্ড। এটা প্রযোজ্য হবে বি ওয়ান ও বি টু ভিসার ক্ষেত্রে। অর্থাৎ যারা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে, বেড়াতে, চিকিৎসার জন্য কিংবা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চান।
আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশের কেউ যদি এই দুই ক্যাটাগরির ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চান, তাহলে তাকে ৫ থেকে ১৫ হাজার ডলার জামানত হিসেবে জমা দিতে হবে। শিক্ষার্থী বা স্টুডেন্ট ভিসাপ্রার্থীদের জন্য অবশ্য এখনো ভিসা বন্ড দিতে হবে না।
অর্থ জমা কীভাবে, কখন বাজেয়াপ্ত হবে
ভিসার সাক্ষাৎকারের সময়ই ঠিক করা হবে বন্ডের পরিমাণ কত হবে। পাঁচ হাজার, ১০ হাজার, নাকি ১৫ হাজার ডলার। কার কত দিতে হবে, তা ঠিক করবে ভিসা কর্মকর্তা। আবেদনকারীর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি ও সাক্ষাৎকারের ওপর এটি নির্ধারণ করা হবে।
যখন ভিসা পাওয়া নিশ্চিত হবে, তখন বন্ডের অর্থ জমা দিতে বলা হবে। কনস্যুলার কর্মকর্তা আবেদনকারীকে নির্দেশ দেওয়ার পরে আবেদনকারীকে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের ‘আই-৩৫২’ ফর্ম জমা দিতে হবে। কনস্যুলার কর্মকর্তা বন্ড জমা দিতে বললে তখন আবেদনকারীকে পেমেন্ট করার একটি সরাসরি লিংক পাঠানো হবে। তাতে প্রবেশ করে অর্থ জমা দিতে হবে।
এক্ষেত্রে সতর্ক করে বলা হয়েছে, তৃতীয়-পক্ষের ওয়েবসাইট ব্যবহার করা যাবে না। কনস্যুলার কর্মকর্তার নির্দেশনা ছাড়া কেউ যদি বন্ড ফি পরিশোধ করেন, তাহলে সেই অর্থও ফেরত দেওয়া হবে না।
কেউ অনুমোদিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলে তা দেশটির অভিবাসন আইন বা ভিসা বন্ডের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ তখন আর বন্ডের অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে না।
আবার বন্ড জমা দিয়ে যারা ভিসা পাবেন, তাদের জন্য তিনটি বিমানবন্দর নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, বোস্টন লোগান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এবং ওয়াশিংটনের ডালেস ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। যদি কেউ অন্য কোনো বিমানবন্দর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকে, তারও অর্থ হারানোর ঝুঁকি থাকবে।
ভিসাধারী অনুমোদিত সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করলে, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ না করলে বা যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবন্দর থেকে ঢোকার অনুমতি না পেলে বন্ড বাতিল হবে এবং জমা দেওয়া অর্থ ফেরত দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। তবে কতদিনের মধ্যে অর্থ ফেরত দেওয়া হবে, সে বিষয়ে কিছু এখনো জানানো হয়নি।
বাংলাদেশে যে প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন, স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য যারা দেশটিতে গিয়ে থাকেন।
যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি গবেষণারত এক শিক্ষার্থী বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ইচ্ছা ছিল আমার সমাবর্তনের সময় মা-বাবা উপস্থিত থাকবেন। কিন্তু এখন সেটা প্রায় অসম্ভব হয়ে গেল।”
মোটা অঙ্কের ভিসা বন্ডের খবরে ভিজিট ভিসাপ্রত্যাশী অনেকেই হতাশ। কারণ এত অর্থ জমা রাখার সামর্থ্য অনেকের নেই।
আবার ভিসা বন্ডের কারণে টুরিস্ট ভিসাও কমে যাবে বলে মনে করেন ট্রাভেল এজেন্সির কর্মকর্তারা।
ভিসা বন্ডের তালিকায় নাম ওঠা বাংলাদেশের ভাবমূর্তির জন্যও ক্ষতিকর বলে মনে করা হচ্ছে। ট্রাভেল এজেন্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দেখাদেখি অন্য দেশও এখন বাংলাদেশিদের জন্যি ভিসা কঠিন করতে পারে।



