পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিক শুভেন্দু অধিকারীর একটি ভিডিও ফেইসবুকে আবার নতুন করে ছড়াচ্ছে হঠাৎ করেই। সেখানে এই বিজেপি নেতা বলছিলেন- শেখ হাসিনা এখনও বাংলাদেশের বৈধ প্রধানমন্ত্রী। পাকিস্তানের ষড়যন্ত্রে তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে। তিনি আবার বাংলাদেশে ফিরবেন বীরের বেশে।
ভিডিওটি নতুন নয়, এটি ২০২৪ সালে বাংলাদেশে অভ্যূত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর একথা বলেছিলেন শুভেন্দু। এখন তা নতুন করে ছড়াচ্ছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলের আভাসে। কারণ এই শুভেন্দু এখন বাংলাদেশ লাগোয়া ভারতীয় রাজ্যটির সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী।
পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভা নির্বাচনের ভোট গণনা হলো সোমবার। তাতে দেখা গেল, গেরুয়া ঝড়ে তছনছ হয়ে গেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের বাগান, যা গত দেড় দশক ধরে সাজিয়ে আসছিলেন তিনি।
ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি উন্মেষ যার হাতে হয়েছে, সেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার মসনদে নরেন্দ্র মোদীর নজর অনেক দিন ধরেই। ৩৪ বছরের বাম শাসন হটিয়ে ২০১১ সালে মমতা যখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কুরসিতে বসেন, সেবার বিজেপি কোনো আসনই জেতেনি এই রাজ্যে। তার আগে মমতার তৃণমূলের সঙ্গে জোট গড়েও খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি কেন্দ্রে তখনকার বিরোধী দল বিজেপি।

তবে ২০১৪ সালে মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দৃশ্যপট পাল্টে যেতে শুরু করে। অসাম্প্রদায়িক বাম শাসনে দীর্ঘকাল থাকা পশ্চিমবঙ্গে ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনটি আসনে জয় পায় বিজেপি। পরের নির্বাচনে এক লাফে আসন বেড়ে হয় ৭৭।
এরপর ২০২৬ এর নির্বাচনকে পাখির চোখ করে মোদীর দল। ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে রণকৗশল সাজানো হয়। নির্বাচনী কাজে রাজ্য প্রশাসনকে একেবারে ঠুঁটো জগন্নাথ করে কেন্দ্রীয় কর্মকর্তাদের দিয়ে সব সারা হয়। তার আগে ভোটার তালিকা সংশোধন করে প্রায় কোটি ভোটারকে বাদ দেওয়া হয়, যারা মূলত মুসলমান এবং তৃণমূলের জোড়া ফুলের সমর্থক বলেই মনে করা হচ্ছে।
পরিস্থিতি আঁচ করে মমতা শুরু থেকে এর বিরোধিতা করছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বিজেপির ‘চানক্য’ অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গে ঘাঁটি গেঁড়ে বসে সব এক হাতে সামলান। তৃণমূলকে নবান্ন থেকে বিদায় করেই ছাড়লেন তিনি।
ভোটের যে ফল ভারতের নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট সোমবার রাতে দেখাচ্ছিল, তাতে দেখা যাচ্ছে যে বিজেপি ২০৪ আসনে জিতেই গেছে, আরও দুটি আসনে রয়েছে এগিয়ে। আর তৃণমূল জিতেছে ৭৫ আসনে, এগিয়ে আছে আরো ছয়টি আসনে।

তৃণমূলের শুভেন্দুর কাছে ভবানীপুরের আসনে হেরেছেন খোদ মমতা। নিজের নন্দীগ্রাম আসনের পাশাপাশি মমতাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ভবানীপুরেও প্রার্থী হয়েছিলেন শুভেন্দু এবং জিতেই ছেড়েছেন। ২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ১৪৮ আসন পাওয়াই সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট। দেখা যাচ্ছে, বিজেপির আসনে তার চেয়ে অনেক বেশি।
‘দিদি’র রাজ্যে এই জয়ে উৎফুল্ল হয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী ধুতি পরে বাঙালি বাবু সেজে উপস্থিত হন দিল্লির বিজেপি অফিসে। তার আগে ফেইসবুকে লেখেন- ‘পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটল’। পদ্ম বিজেপির ভোটের প্রতীক। ২০১৬ সালে যার কলি বেরিয়েছিল, ১০ বছরের যত্নে তা ফুটিয়ে তুললেন শুভেন্দু অধিকারীরা।
অভাবনীয় এই জয়ের পর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপি তােদর ফেইসবুক পেজে লিখেছে- অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ। প্রাচীন ভারতে কলিঙ্গ ছিল বিহার এলাকা নিয়ে গঠিত, অঙ্গ গঠিত ছিল উড়িষ্যা এলাকা নিয়ে। আর বঙ্গ তো বাংলা। বিহার ও উড়িষ্যা রাজ্যের ক্ষমতা আগেই নিয়েছে বিজেপি, এখন বঙ্গদখলও সারা হলো।
এর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশকেও দৃশ্যত ঘিরে ফেলল বিজেপি। পূর্বের ত্রিপুরা রাজ্য আগেই গিয়েছিল পদ্ম শিবিরে। পশ্চিমে আসামও তাই, মেঘালয়েও ক্ষমতায় বিজেপির মিত্ররা। পশ্চিম বাদ ছিল, এখন পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপি। বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ শুধু ভৌগলিক কারণে নয়, ঐতিহাসিকভাবেও জড়িত।

ভারত ভাগের সময় বাংলা ভাগ হলেও দুই দেশের বাংলাভাষীরা এক প্রাণ বলেই নিজেদের মনে করেন। একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কোটি বাঙালির আশ্রয়স্থল ছিল এই পশ্চিমবঙ্গ। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিতে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্টের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর অবদান কার না জানা।
এর বিপরীতে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি ঝুলে আছে এক যুগ হলো। মমতার আপত্তির কা খেদারণে এই চুক্তি করা যাচ্ছে না বলে দিল্লির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল। এখন মমতার বিদায়ে মোদী কী বলেন, তাই দেখার বিষয়।
আবার বিজেপির কিছু বিষয় বাংলাদেশের জন্য শঙ্কারও। ‘বাঙালি খেদাও’ স্লোগান তুলে তারা আসামে ক্ষমতায় গিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে এবার নির্বাচনেও তারা ‘অনুপ্রবেশকারী’ খেদানোর স্লোগান তুলেছে। এর লক্ষ্য যে বাংলাদেশি এবং মুসলমানরা, সে বিষয়ে দলটির রাজ্য নেতারা রাখঢাক না রেখেই বলছেন। ভোটে জয়ের পর অমিত শাহ প্রথমেই বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গের জনগণ অনুপ্রবেশকারী ও তাদের স্বার্থরক্ষাকারীদের শিক্ষা দিয়েছে।
বিজেপির কেন্দ্রীয় সরকার সীমান্তে আরো কড়াকড়ির পক্ষে। এজন্য সীমান্ত এলাকায় জলে কুমির এবং ডাঙ্গায় সাপ ছাড়ার উদ্ভট এক পরিকল্পনাও নিয়েছে তারা।
আবার পশ্চিমবঙ্গের যেখানে ১৫ শতাংশ মুসলমান, সেখানে এই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেই যাচ্ছেন রাজ্যের বিজেপি নেতারা। মুসলমানদের ‘জিহাদি’ হিসেবে দেখানোর একটি প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়। পাশের রাজ্যে যখন মুসলমানরা আক্রান্ত হবে, মুসলমানপ্রধান বাংলাদেশে তার প্রতিক্রিয়া পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। আবার ওপারে উগ্র হিন্দুদের আস্ফালনের প্রতিক্রিয়ায় এপারে উগ্র মুসলমানদের উত্থান ঘটতে পারে।
এসব মিলিয়ে বাংলাদেশিদের জন্য উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা যখন প্রধানমন্ত্রী হন, তখন ভারতে ক্ষমতায় কংগ্রেস। ঐতিহাসিকভাবেই কংগ্রেসের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল আওয়ামী লীগের। ২০১৪ সালে দিল্লিতে বিজেপি ক্ষমতায় গেলে সেই সম্পর্কে চিড় ধরবে বলে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু ঘটেছে তার বিপরীত। দেখা গেছে, মোদীর সঙ্গে শেখ হাসিনার আরো ভােলা বোঝাপড়া গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশে বিএনপির নতুন সরকারের সময় তা কী হয়, দেখার বিষয়।
বিজেপি তো ভোটে জিতল, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী হবেন কে? আলোচনায় আছে রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, রাজ্য বিজেপির সাবেক সভাপতি দিলীপ ঘোষ, সুকান্ত মজুমদার, রাজ্যসভার সাবেক সদস্য স্বপন দাশগুপ্ত প্রমুখ।
তবে তাদের ছাপিয়ে আসছে বিধান সভায় বিরোধী দলের নেতা, রাজ্য বিজেপির সাবেক সভাপতি শুভেন্দু অধিকারীর নাম। তাকে মুখ্যমন্ত্রী সম্বোধন করে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সমর্থকদের অভিনন্দন বার্তায় এখন সয়লাব ফেইসবুক।

বার্তা যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকেও। তার একটি রাজ্য বিজেপির সমর্থক গোষ্ঠী তাদের ফেইসবুক পেজে পোস্ট করেছে।
তাতে লেখা আছে- “বাংলাদেশ থেকে অভিনন্দন/শুভেন্দু অধিকারী Suvendu Adhikari পশ্চিমবঙ্গের নয়াকর্তা/ অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম একজন মানুষকে শূন্য থেকে মহাশূন্যে নিয়ে যেতে পারে, আপনি তার জ্বলন্ত উদাহরণ । ৫ আগষ্টের পর থেকে বাংলাদেশে চলমান অন্যায়, অত্যাচার ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে আপনার প্রতিবাদ জারী থাকুক….. জয় জয় জয় শ্রীরাম।”
এখন কথা হচ্ছে, এই নির্বাচনে জয় শ্রীরাম দিয়েই মাত করেছে বিজেপি; সেখানে মমতার স্লোগান ছিল- ‘জয় বাংলা’।



