তারেক রহমানের ভুল কেন বারবার হচ্ছে?

টাঙ্গাইলে কৃষক কার্ড বিতরণের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: বিএনপির মিডিয়া সেল
টাঙ্গাইলে কৃষক কার্ড বিতরণের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: বিএনপির মিডিয়া সেল

ভুল একটি তথ্য দিয়ে নতুন বছরের যাত্রা শুরু করলেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার এই ভুল নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় চলছে আলোচনা। তারেক রহমানের নির্বাচনী যাত্রায়ও এমন ভুল হয়েছিল। যা দেখে তার পরামর্শকদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে খোদ বিএনপি সমর্থকদের মধ্য থেকেই।

গত ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখে টাঙ্গাইলে এক কর্মসূচির মধ্যদিয়ে কৃষক কার্ড উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই জেলারই বাসিন্দা ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং পরবর্তীকালে ন্যাপের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী।

সেখানে এক অনুষ্ঠানে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭৯ সালে নির্বাচনের আগে মওলানা ভাসানী ধানের শীষ প্রতীকটি জিয়াউর রহমানকে দিয়ে গিয়েছিলেন।

বিএনপির নির্বাচনী প্রতীক ধানের শীষ আগে ন্যাপ-ভাসানীর নির্বাচনী প্রতীক ছিল, এ বিষয়টি তর্কাতীত। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরের প্রেক্ষাপটে জিয়া ক্ষমতাবান হয়ে ওঠার পেছনে মওলানা ভাসানীর আশীর্বাদ পেয়েছিলেন, তাও মিথ্যা নয়।

তাহলে ভুলটা কোথায়? তা হচ্ছে, সময়কাল। কারণ ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় মওলানা ভাসানী বেঁচেই ছিলেন না। তিনি ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর মারা যান। ফলে ১৯৭৯ সালে জিয়ার হাতে সরাসরি প্রতীক তুলে দেওয়ার সুযোগ তার ছিল না।

ভাসানী পাকিস্তান আমলে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ প্রতিষ্ঠার পর প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ধানের শীষ। ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনে দলটি এই প্রতীকেই অংশ নেয়। ১৯৭৬ সালে ভাসানী মারা যাওয়ার পর ন্যাপের এই অংশটির তখন ছন্নছাড়া অবস্থা।

এর মধ্যে ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি গঠন করলে ভাসানীর ন্যাপের একটি বড় অংশ তাতে যোগ দেয়। তাদের মধ্যে ছিলেন ন্যাপের তৎকালীন মহাসচিব মশিউর রহমান যাদু মিয়া। তার মাধ্যমেই ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপি হাতে চলে আসে। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে বিএনপি এই প্রতীকে অংশ নেওয়ার পর এখনও তা ধরে রেখেছে।

তবে টাঙ্গাইলে তারেক রহমান বলে বসেন, “১৯৭৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে ধানের শীষ তুলে দিয়ে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন- তোমার হাতে আমি ধানের শীষ তুলে দিলাম’।”

এর আগে গত ডিসেম্বরে নির্বাচনী প্রচার চালানোর সময়ও কিছু ভুল তথ্য দিয়েছিলেন তারেক রহমান। কুমিল্লায় জনসভায় গিয়ে তিনি সেখানে ইপিজেড স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, অথচ জেলাটিতে ইপিজেড আছে অনেক দিন ধরে। আবার মৌলভীবাজারে গিয়ে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দেন তিনি, যেখানে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।

এরপর গত ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার পর মোনাজাত করেন তারেক রহমান। তখন বিএনপির মিডিয়া সেল তাদের ফেসবুক পেজে একটি পোস্টে দাবি করেন, ‘ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের এক অভূতপূর্ব দৃশ্য, যা অতীতে কখনো দেখা যায়নি।’

অথচ কথাটি সত্য নয়। শহীদ মিনারে মোনাজাতের আরো নজির তখন আসতে থাকে সোশাল মিডিয়ায়। এমনকি ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মোনাজাতের একটি ছবিও পাওয়া যায়।

তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার আগেই তার উপদেষ্টা হিসেবে নবীন কয়েকজনকে নিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার তাদের সরকারি পদও দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংও নতুন করে সাজিয়েছেন তিনি। কিন্তু এসব ঘটনায় তার সেই ব্যক্তিদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমান ১৭ বছর পর দেশে ফিরেছেন, ফলে তার কাছে হালনাগাদ তথ্য নাই থাকতে পারে। কিন্তু তার সহযোগীদের দায়িত্ব তাকে সঠিক তথ্যটি সরবরাহ করা। প্রবীণদের এড়িয়ে এখন তারেক রহমান যাদের ওপর দায়িত্ব দিয়েছেন, তাদের অতিতৎপরতা তাকে ডুবিয়ে দিতে পারে।

সর্বশেষ ধানের শীষ নিয়ে বক্তব্যের পর বিএনপি সমর্থক সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা এলাহী নেওয়াজ খান ফেইসবুকে লিখেছেন, “টাঙ্গাইলের ওই মঞ্চে এমন কোনো অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, যিনি কানে কানে ভুলটা শুধরিয়ে দেবেন। এতে আবারো প্রমাণ হলো, অভিজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads