বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ভেতরে পাকিস্তানি জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার খবর দিয়েছেন ভারতের এক সাংবাদিক। বিষয়টি বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম অনেকটা এড়িয়ে গেলেও আকস্মিকভাবে পুলিশের সতর্ক হয়ে ওঠার মধ্যে এর ভিত্তি পাওয়া যাচ্ছে।
ভারতের সাংবাদিক চন্দন নন্দী গত ২৩ এপ্রিল নর্থ ইস্ট নিউজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিমান বাহিনীর কিছু সদস্যের পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবানের সম্পৃক্ততার খবর দেন। এরপর তার লেখা আরও দুটি প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়।
এই প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, বিমান বাহিনীর চট্টগ্রামের জহুরুল হক ঘাঁটিতে কর্মরত একজন ওয়ারেন্ট অফিসারকে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) একটি আস্তানা থেকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই কর্মকর্তা দুই মাস ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন।
তেহরিক-ই-তালেবান (টিটিপি) পাকিস্তানে নিষিদ্ধ। সংগঠনটির সঙ্গে আফগান তালেবানের যোগাযোগ রয়েছে।
চন্দন নন্দীর দাবি অনুযায়ী, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং পুলিশ কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে ওই ওয়ারেন্ট অফিসার সব স্বীকার করেন। বিমান বাহিনীর অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে টিটিপির যোগাযোগের কথাও তিনি জানান।
নর্থ ইস্ট নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, টিটিপি নেটওয়ার্কের খবর ছড়িয়ে পড়লে বিমান বাহিনীর আরও অন্তত ছয়জন ওয়ারেন্ট অফিসার তুরস্ক, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড ও পর্তুগালে পালিয়ে যান।
চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত জহুরুল হক বিমানঘাঁটির প্রধান মসজিদের ইমাম আবদুস শুকুরকে টিটিপির প্রধান নিয়োগকারী হিসেবে সন্দেহ করছেন বাংলাদেশি তদন্তকারীরা। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নানা সূত্রের বরাতে চন্দন নন্দী লিখেছেন, বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার উখিয়ায় টিটিপির জন্য একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের চেষ্টা করছিল।
চট্টগ্রামের পাশাপাশি ঢাকার কুর্মিটোলায় এ কে খন্দকার ঘাঁটি এবং যশোরের মতিউর রহমান ঘাঁটিতেও অভিযান চালানো হয়। এর ফলে অন্তত দুজন স্কোয়াড্রন লিডার এবং প্রায় দশজন জুনিয়র কমিশনড অফিসার ও বিমানসেনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও খবর দিয়েছে নর্থ ইস্ট নিউজ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, টিটিপির নেটওয়ার্কে যুক্ত চার থেকে পাঁচজন বিমান সেনা বিমান বাহিনীর কক্সবাজার ইউনিটে নিযুক্ত ছিলেন। এছাড়া দুজন চট্টগ্রাম ও যশোরের স্কোয়াড্রনে কর্মরত ছিলেন।

বাংলাদেশে প্রতিরক্ষা বাহিনীরে ভেতরের খবর নিয়ে এর আগেও নানা খবর প্রকাশ করেছিলেন চন্দন নন্দী। তার অনেক খবরের সত্যতা পাওয়া গিয়েছিল।
নর্থ ইস্ট নিউজের এই খবর নিয়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে উচ্চবাচ্য না হলেও এই খবরটি এসেছে যে বাংলাদেশ পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনার ভেতরে ও আশেপাশে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ দিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার রেঞ্জ ডিআইজি, মেট্রোপলিটন কমিশনার ও জেলার পুলিশ সুপারসহ (এসপি) পুলিশের সব ইউনিটকে জরুরি নির্দেশনা দিয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়। সেখানে নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সমর্থকদের হামলার আশঙ্কার কথা জানিয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়।
নির্দেশনায় বলা হয়, সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠনটির সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদের সঙ্গে একটি বাহিনীর চাকরিচ্যুত দুই সদস্যের নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য মিলেছে। গোয়েন্দা তথ্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, এই চক্রটি জাতীয় সংসদ ভবন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্থাপনা ও সদস্য, ধর্মীয় উপাসনালয়, বিনোদনকেন্দ্র এবং শাহবাগসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় হামলার পরিকল্পনা করতে পারে।
বোমা বিস্ফোরণের পাশাপাশি দেশীয় ধারালো অস্ত্র বা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে হামলার আশঙ্কান কথা জানানো হয় ওই চিঠিতে। এছাড়া বিভিন্ন বাহিনীর অস্ত্রাগারে হামলার পরিকল্পনার বিষয়েও সতর্ক করা হয়।
গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, ইশতিয়াক আহমেদকে জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ সুনির্দিষ্ট তথ্য পেতে সক্ষম হয়েছে। সিলেটের মোহাম্মদ রাহেদ হোসেন মাহেদ এবং মোহাম্মদ রাকিব হাসান ওরফে উবাইদা আল ওসামা নামে দুজনের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন শনিবার সাংবাদিকদের কাছে জঙ্গি হামলার শঙ্কার কথা স্বীকার করেন। তবে তিনি বলেন, এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো সংগঠন বা গোষ্ঠীকে শনাক্ত করা যায়নি।
প্রতিরক্ষা বাহিনীর কতজন সদস্য এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য তিনি জানাতে পারেননি।
এদিকে নর্থ ইস্ট নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশের এই পদক্ষেপ বিমান বাহিনীতে জঙ্গি নেটওয়ার্ক শনাক্তের বিষয়টি নির্দেশ করে।
এতে বলা হয়, গত আট থেকে নয় দিন ধরে বিমান বাহিনী এবং অন্যান্য সামরিক গোয়েন্দা ইউনিট অন্তত তিনটি বিমানঘাঁটি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিরক্ষা অবকাঠামোতে অভিযান চালিয়েছে।
চন্দন নন্দী লিখেছেন, বিমান সেনা এবং টিটিপির মধ্যে এ ধরনের যোগসূত্র আবিষ্কৃত হওয়ায় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলো চরম অস্বস্তিতে পড়েছে। একই সাথে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর সদস্যদের সাথেও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর এমন কোনো সংযোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।



