ট্রাম্প কি তবে যুক্তরাষ্ট্রের কবর খুঁড়ছেন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের যে আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, ট্রাম্পের মধ্যদিয়ে কি তার যবনিকাপাত হচ্ছে?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের যে আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, ট্রাম্পের মধ্যদিয়ে কি তার যবনিকাপাত হচ্ছে?

ইরানে আক্রমণের পর নতুন এক দৃশ্য দেখলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতদিন ধরে যারা যুক্তরাষ্ট্রের ছায়াতলে ছিল, যারা যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষার চাদরে নিজেদের নিরাপত্তা খুঁজত, তারা এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের পাশে নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের যে আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, ট্রাম্পের মধ্যদিয়ে কি তার যবনিকাপাত হচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন ব্রিটিশ সংবাদপত্র গার্ডিয়ানের কূটনৈতিক সম্পাদক প্যাট্রিক উইনটোর।

যুক্তরাজ্যে ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও দে আগুয়ার পাত্রিওতা সম্প্রতি এক ভাষণে চলমান বিশ্বকে তুলে ধরতে গিয়ে অস্বস্তকির একটি চিত্রই এঁকেছেন। তিনি বলেন, বিশ্ব আজ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও পরিবেশগত অবক্ষয়, একের পর এক সংঘাত, সামরিক ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবতার প্রতি নিদারুণ উপেক্ষা, বাণিজ্যে বিঘ্ন, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অবক্ষয় এবং এমন প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, যা একদিকে উত্তেজনা, অন্যদিকে ভীতি সৃষ্টি করছে— এমন সব সমস্যায় জর্জর।

এটুকু বলেই শেষ করেননি তিনি। তার সঙ্গে যোগ করেন, “তবে এর আড়ালে কিছু একটা ঘটছে। কিছু একটা কাঁপছে।”
পাত্রিওতা দেখছেন যে ‘গ্লোবাল নর্থ’-এ একটি নতুন বিভাজন তৈরি হয়েছে। একদিকে একতরফা নীতিতে বিশ্বাসী একটি পরাশক্তি, অন্যদিকে বহুপাক্ষিকতাকে সমর্থনকারী সংখ্যাগরিষ্ঠরা।

তিনি বলেন, “ইরানে অত্যন্ত অজনপ্রিয় ও অবৈধ যুদ্ধ দ্রুতই একতরফা নীতির ফলে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে উঠছে। এটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে বিশ্ব আর এক মেরুর থাকবে না।”

যুক্তরাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ আধিপত্য ও আইনবহির্ভূত সামরিক নীতির এই অন্ধকার যুগ হয়তো দ্রুত শেষের দিকে—এমন ধারণা এখন জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে যখন অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলো নিজেদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভর না করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

তারা দেখেছে, উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর জন্য সেই নিরাপত্তা কাজেই আসেনি এবং ইউক্রেন সঙ্কটেও ইউরোপের স্বার্থ কতটা উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে অনেকেই বুঝতে পেরেছে, নানামুখী ও বহুমাত্রিক জোটই তাদের জন্য বেশি উপযোগী।

সম্প্রতি চীনে দেওয়া এক বক্তৃতায় স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, “আজ যা ঘটছে, তা ক্ষমতার স্থানান্তর নয়, বরং শক্তির কেন্দ্রগুলোর বহুগুণ বৃদ্ধি—শুধু ক্ষমতার নয়, সমৃদ্ধিরও।”

এটাকে উদযাপনের বিষয় মনে করছেন তিনি। তার ভাষায়, “আধুনিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বের নানা প্রান্তে একসঙ্গে ভিন্ন কিছূর অঙ্কুরোদগম হচ্ছে—চীন ও এশিয়ায়, আফ্রিকায়, এমনকি স্পেনের কাছাকাছি লাতিন আমেরিকাতেও।”

শুধু বামপন্থীরাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব হ্রাস পাচ্ছে—এই ধারণা এখন প্যারিস, ব্রাসেলস, ওয়ারশ ও বার্লিনের নীতিনির্ধারণেও জায়গা করে নিয়েছে।

জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্ৎস, যিনি শুরুতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বৈধতা নিরপেক্ষ অবস্থানে ছিলেন, সেই তিনিই এখন মুখ খুলেছেন; বলছেন, ইরান ভালোমতোই অপদস্থ করেছে যুক্তরাষ্ট্রকে। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের তেহরানে হামলার সিদ্ধান্তকে ইরাক ও আফগানিস্তানে পূর্বসূরিদের ভুল সিদ্ধান্তের সঙ্গেও তুলনা করেন।

ইউরোপীয় দেশগুলো আর ভীত বা নির্ভরশীল না থেকে নিজেদের প্রতিরক্ষা জোরদার করছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে একটি বিকল্প কাঠামো তৈরি হচ্ছে।

একইভাবে বৈশ্বিক পর্যায়েও দাবি উঠছে যে পশ্চিমা শক্তিগুলো, শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, তাদের অতিরিক্ত প্রভাব ছেড়ে দিয়ে গ্লোবাল সাউথকে বেশি প্রতিনিধিত্ব দিতে হবে।

এই পরিবর্তনগুলো রাতারাতি ঘটবে না। তবে ইরান সঙ্কট ও ট্রাম্প-ইউরোপ দ্বন্দ্ব এই বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক স্টিফেন ওয়াল্টের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব শুধু অর্থনীতি বা সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না, এটি নির্ভর করে বিশ্ব তাকে কীভাবে দেখে তার ওপরও।

তিনি বলেন, মিত্রদের বিশ্বাস করতে হয় যে যুক্তরাষ্ট্র জানে সে কী করছে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এমন বার্তা দিয়েছে যে তা আর সত্য নয়। ফলে ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কম নির্ভরশীল হবে।

ওয়াল্ট আরও বলেন, এই যুদ্ধ দেখিয়েছে যে ট্রাম্প প্রশাসন মূলত একটি দেশ—ইসরায়েলের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে, যার ফলে ইউরোপ ও এশিয়ার মিত্ররা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত জেন হার্টলি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য কী ছিল? এই যুদ্ধের আইনি ভিত্তি কী? বিকল্প পরিকল্পনা কী ছিল? আমরা এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—জনগণ আর যুক্তরাষ্ট্রকে ইতিবাচক শক্তি হিসেবে দেখে না।”

তবে এই পরিবর্তন স্থায়ী করতে হলে শুধু মনোভাব বদল নয়, নতুন শক্তিকেন্দ্র ও বিকল্প সহযোগিতা গড়ে তোলা জরুরি, যে প্রক্রিয়া এখন শুরু হয়ে গেছে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি মধ্যম শক্তিগুলোর একটি জোটের ধারণা দিয়েছেন। ইতোমধ্যে কানাডা ২০টিরও বেশি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা চুক্তি করেছে, যার মধ্যে চীনও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে নতুন বাণিজ্য করিডোর ও জোট গড়ে উঠছে।

ব্রাজিলের দৃষ্টিতে এগুলো ‘দায়িত্বশীল জোট’, যেখানে বিভিন্ন অঞ্চল, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় হচ্ছে।

পাত্রিওতা আরও বলেন, নতুন আত্মবিশ্বাসী রাজনৈতিক জোটগুলো এখন মার্কিন সামরিকতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করছে।

সানচেজ বলেন, “ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলেও ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ডানপন্থীরা জিতছে বলে চিৎকার করছে না, বরং তারা জানে তাদের সময় ফুরিয়ে আসছে।”

ইরান যুদ্ধকে অবৈধ বলায় ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হলেও সানচেজ জানেন যে ট্রাম্প এখন অনেকের কাছে রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠেছেন।

ট্রাম্প স্পেনকে ন্যাটো থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন, যা তার ক্ষমতার বাইরে। একইভাবে জার্মানি থেকেও সেনা প্রত্যাহারের হুমকি দিয়েছেন। ফলে ন্যাটোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি এখন দরকষাকষির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সতর্ক করে বলেন, ট্রাম্পের এই অবস্থান ন্যাটোর ভিত্তিকে দুর্বল করছে।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের লর্ডস কমিটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য এখন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে, শক্তি প্রয়োগ আর শেষ অবলম্বন নয়, এবং নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। ফলে যুক্তরাজ্যের পক্ষে আগের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করা সম্ভব নয়।

প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে, ইউরোপকে ন্যাটোর মধ্যে আরও বড় ভূমিকা নিতে হবে।

ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ইউনিয়নের ধারণা এখন গুরুত্ব পাচ্ছে, যেখানে যুক্তরাজ্য, নরওয়ে ও ইউক্রেনও যুক্ত থাকতে পারে।

বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার বলেন, “আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পথে বলব না, এটি ইতোমধ্যেই ভেঙে পড়েছে।”

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড ২০২৫ সালকে ‘শিকারিদের বছর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

সংস্থাটির প্রতিবেদনে গাজায় গণহত্যা, ইউক্রেনে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুক্তরাষ্ট্রের বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং ভেনেজুয়েলা ও ইরানে হামলার উল্লেখ রয়েছে।

ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের পরিচালক মার্ক লিওনার্ড বলেন, বিশ্ব এখন ‘অরাজকতার যুগে” প্রবেশ করেছে, যেখানে নিয়মগুলো কেবল ভঙ্গেই হচ্ছে না, বরং তার তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।

এসব দেখেই পাত্রিওতা বলছেন, কিছু একটা কাঁপছে।

একসময় এক মেরুর বিশ্ব গড়তে চাওয়া শক্তিগুলো এখন সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছে এবং তাদের প্রভাব আর আগের মতো নেই।

আগামী বছর নতুন জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের সুযোগ থাকবে, যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ীরা এখনও আধিপত্য ধরে রেখেছে।

ওয়াশিংটনের ওপর আর আগের মতো নির্ভর করা যাচ্ছে না, আর বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কও উপেক্ষা করা যাচ্ছে না— বিশ্ব এখন এই নতুন বাস্তবতায় গড়ে ওঠার পথে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ব্যর্থতা হয়তো সায়গন বা কাবুলের মতো দৃশ্যমান প্রতীক হবে না হয়তো, কিন্তু এর প্রভাব হতে পারে সমান গভীর ও বিস্তৃত।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads