‘গুপ্ত’ নিয়ে শুরুতে বিতর্ক, এরপর প্রকাশ্যে দ্বন্দ্বে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির

চট্টগ্রাম সিটি কলেজে গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধের দেয়াল লিখন করে ছাত্রদল।
চট্টগ্রাম সিটি কলেজে গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধের দেয়াল লিখন করে ছাত্রদল।

জামায়াতে ইসলামীর একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা নিয়ে এখন যতটা উচ্চকণ্ঠ বিএনপি, তা এর আগে কখনোই ছিল না। জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে তা ক্রমেই বাড়ছে। তার রেশ গিয়ে পড়ছে দল দুটির সহযোগী সংগঠনগুলোর ওপরও। তারই ধারাবাহিকতায় প্রকাশ্যে মারামারিতে জড়াল ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবির।

বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন শাহবাগে দুই পক্ষের মারামারিতে আহত হয়েছেন ডাকসুর দেই নেতা, যারা ছাত্রশিবিরের প্যানেল থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। একজন যুবাইর বিন নেছারী (এ বি জুবায়ের) ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক। অন্যজন মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ ডাকসুর সাহিত্য সম্পাদক।

ঘটনার শুরু গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামের সিটি কলেজ থেকে এবং তা একটি দেয়াল লিখন নিয়ে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, ছাত্রশিবির দেয়ালে লিখেছিল- ‘ছাত্র রাজনীতি ও ছাত্রলীগ মুক্ত ক্যাম্পাস’। ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা সেখানে ‘ছাত্র রাজনীতি’ থেকে ‘ছাত্র’ মুছে দিয়ে ‘গুপ্ত’ লিখে দেয়।

তা নিয়ে দুই পক্ষের মারামারিও বাঁধে। তারপর ছাত্রদল বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ‘গুপ্ত’ রাজনীতির বিরুদ্ধে কর্মসূচি ঘোষণা করে, যা দৃশ্যত ছাত্রশিবিরকে উদ্দেশ্য করে। আর তা নিয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুখোমুখি হয় দুই সংগঠন।

গুপ্ত শব্দের অর্থ গোপন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের তৎপরতা ছিল প্রায় বন্ধ। তখন জামায়াতের সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা গোপনে কাজ চালাত। ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের কয়েকদিন আগে জামায়াত ও শিবিরকে নিষিদ্ধও করেছিল।

গুপ্ত এল যেভাবে

তবে অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় গিয়ে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করে। অভ্যুত্থানের পর ছাত্রশিবির যখন বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আত্মপ্রকাশ করে, তখন দেখা যায়, সংগঠনটির অনেক নেতা এতদিন ছাত্রলীগ পরিচয়ে ক্যাম্পাসে ছিলেন। ডাকসুর ভিপি যিনি হলেন, সেই সাদিক কায়েমকে ছাত্রলীগের মিছিলে হরহামেশা দেখা যেত। ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদও ছাত্রলীগের একটি কমিটিতে ছিলেন বলে প্রকাশ পায়।

এটা ছাত্রশিবিরের একটি কৌশল ছিল বলে সংগঠনটির বিভিন্ন নেতা বলে আসছিলেন। আর আওয়ামী লীগবিহীন রাজনীতির মাঠে প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠা জামায়াতকে ঘায়েল করতে এটাই হাতিয়ার হিসেবে নেয় বিএনপি। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও জামায়াতের ‘গুপ্ত’ রাজনীতির সমালোচনা করতে থাকেন।

তারেক নির্বাচনী জনসভায় বলেছিলেন, “অনেকেই এসে আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে। যারা আপনাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করবে, দেখামাত্র তাদের বলবেন- গুপ্ত তোমরা। কারণ, তাদের গত ১৬ বছর আমরা দেখি নাই। তারা ওদের সঙ্গে মিশে ছিল, যারা ৫ তারিখে (৫ই অগাস্ট) পালিয়ে গিয়েছে।”

নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর শিবিরের ‘গুপ্ত’ রাজনীতি নিয়ে ছাত্রদলের নেতারা উচ্চকণ্ঠ হন। ছাত্রদলের নেতারা দাবি করছেন, ছাত্রশিবির বিভিন্ন ক্যাম্পাসে কমিটি গঠন করলেও সবার নাম প্রকাশ করছে না। এভাবে অপ্রকাশ্যে থাকারা ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তুলছেন। এভাবে ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হলে অন্য সংগঠনগুলো গুটিয়ে গেলেও শিবির গোপনে তৎপরতা চালিয়ে তার ফায়দা নেবে।

অপ্রকাশ্য থাকা নিয়ে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আমাদের চার হাজার সাংগঠনিক থানা আছে। চার হাজার থানার আশি হাজার লোকের তালিকা কেন দেব আমি।“

তার দাবি, বিএনপি দেশ পরিচালনায় ব্যর্থতা ঢাকতেই এখন ‘গুপ্ত’ নিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিতর্ক তৈরি করতে চাইছে।

অন্যদিকে ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বিবিসি বাংলাকে বলেন, গোপন রাজনীতি কখনও কোনো দেশকে স্থিতিশীল রাখতে দেয় না। চূড়ান্ত পতনের ভয়ে ছাত্রশিবির এখন পর্যন্ত তাদের সবার পরিচয় প্রকাশ্যে আনেনি।

গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামের সিটি কলেজ ভবনের দেয়ালে লেখা মুছে দেওয়া নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির।

চট্টগ্রামে কী হয়েছিল

শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, সিটি কলেজে টানানো তাদের দলীয় পোস্টার নামিয়ে দেয় ছাত্রদল। এনিয়ে কলেজটির অধ্যক্ষের কাছে অভিযোগ দিয়ে বেরিয়ে আসার পর ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা।

বিভিন্ন ক্যাম্পাসে এমন দেয়াল লিখন করেছে ছাত্রদল।

ডাকসুর জিএস ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, “আপনি গুপ্ত ডেকে গ্রাফিতি আঁকবেন, নো প্রবলেম। কিন্তু সেখানে শিবিরের আস্তানা ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও বলে স্লোগান দিলেন। তখন তো আমি রিয়্যাক্ট করব।”

অন্যদিকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন বলেন, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা গ্রাফিতি বা দেয়াললিখনে ‘গুপ্ত’ লেখার কারণে ছাত্রশিবির তাদের ওপর হামলা করে। এরপর তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উসকানি দেয় এই বলে যে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা নাকি লেজ গুটিয়ে চলে গেছে। এরপরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

‘গুপ্ত’ নিয়ে বিতর্কের মধ্যে তারেক রহমান ও তার মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় একটি অশালীন পোস্ট আসে, যা ছাত্রশিবির ছড়ায় বলে ছাত্রদল নেতাদের অভিযোগ।

ঢাবিতে সংঘর্ষ

তা নিয়ে উত্তেজনার এক পর্যায়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর শাহবাগ থানার সামনে মারধরের শিকার হন ডাকসু নেতা জুবায়ের ও মুসাদ্দিক। তার আগের দিন ছাত্রদলের হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়ে শাহবাগ থানায় জিডি করতে গিয়েছিলেন তারা। খবর পেয়ে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা সেখানে জড়ো হয়।

প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে উত্তেজনা চলে। পরে জুবায়ের ও মুসাদ্দিককে শাহবাগ থানা জামে মসজিদের ফটক দিয়ে বের করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

ডাকসুর জিএস ফরহাদ বলেন, ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা বহিরাগতদের নিয়ে জুবায়ের ও মুসাদ্দিকের ওপর হামলা চালিয়েছে।

তিনি বলেন, “ঈশান চৌধুরী নামে ছাত্রলীগের একটি আইডি থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ একটি পোস্ট দেওয়া হয়। এর পরে অরণ্য আবির নামে একটি আইডি থেকে পোস্টটি ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্যানেল থেকে ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আবদুল্লাহ আল মাহমুদ দেয় বলে প্রচার করা হয়।

“বিষয়টি মাহমুদ নিজের আইডি থেকে ক্লিয়ার করে। এরপরও ছাত্রদল তাকে হুমকি দিয়ে আসছিল। মাহমুদ শাহবাগ থানায় ডিজি করতে গেলে তাকে এক ঘণ্টার বেশি সময় বসিয়ে রেখে জিডি নেওয়া হয়নি। এখানে ছাত্রদলের লোকজন বহিরাগতদের নিয়ে মাহমুদকে থানায় আক্রমণ করতে যায়। তখন বিষয়টি সমাধানের জন্য এ বি জুবায়ের, মুসাদ্দিকসহ কয়েকজন থানায় গেলে ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা বহিরাগতদের নিয়ে তাদের ওপর হামলা করে।”

ছাত্রদলের একজন নেতা ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, “আমরা জাইমা রহমানকে নিয়ে ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানোর প্রতিবাদে শাহবাগ থানায় আসি। এসে যে এই ফটোকার্ড ছড়িয়েছে, তাকে থানায় জিডি করতে দেখতে পাই। তখন আমরা পুলিশকে বলি তাকে হেফাজতে নিতে। এর কিছুক্ষণ পর ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা থানা থেকে বের হওয়ার সময় ডাকসুর কয়েকজন নেতা উসকানিমূলক কথা বলতে বলতে থানায় প্রবেশ করার চেষ্টা করে। সে সময় এই মারধরের ঘটনা ঘটে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের আন্তর্জাতিক সম্পাদক মেহেদী হাসান বলেন, “ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে এ বি জুবায়েরসহ ছাত্রশক্তি ও শিবিরের নেতা–কর্মীরা থানায় আসলে সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা ও বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের মারধরের চেষ্টা করে। কিন্তু সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপনসহ ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।”

রাত পৌনে ৯টায় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম শাহবাগ থানায় উপস্থিত হন। এর কিছুক্ষণ পর ছাত্রদলের সভাপতি ও পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মাসুদ আলম আহত জুবায়েরসহ বাকিদের শাহবাগ থানা জামে মসজিদের ফটক দিয়ে বের করে নিয়ে যান।

ছাত্রশিবির এরপর ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমের নেতৃত্বে ক্যাম্পাসে মিছিল বের করলে সেখানেও উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে মিছিল নিয়ে ঢাকা মেডিকেলের দিকে চলে যান সাদিক কায়েম।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads