বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত নিয়োগে ভারতের ব্যতিক্রম ঘটানোর নেপথ্যে কী?

প্রণয় ভার্মার উত্তরসূরি হিসেবে ঢাকার মিশন প্রধান হিসে আসছেন দীনেশ ত্রিবেদী।
প্রণয় ভার্মার উত্তরসূরি হিসেবে ঢাকার মিশন প্রধান হিসে আসছেন দীনেশ ত্রিবেদী।

প্রণয় ভার্মার উত্তরসূরি হিসেবে ঢাকার মিশন প্রধান হিসেবে যখন দীনেশ ত্রিবেদীর নাম ঘোষণা হলো, তখন অনেকের চোখই কপালে ওঠে। কারণ আগের নামগুলোর সঙ্গে এই নামটি ঠিক মেলানো যাচ্ছিল না।

প্রণয়ের আগে যিনি বাংলাদেশে হাই কমিশনার ছিলেন, সেই বিক্রম দোরাইস্বামী একজন পেশাদার কূটনীতিক, তার আগেরজন রীভা গাঙ্গুলি দাশও তাই। তার আগে হর্ষবর্ধন শ্রিংলা, পঙ্কজ সরণ থেকে শুরু করে একেবারে ১৯৭২ সালে প্রথম হাই কমিশনার সুবিমল দত্ত কিংবা দ্বিতীয় হাই কমিশনার সমর সেনকে ধরলেও কূটনীতিকের বাইরে কাউকে পাওয়া যায় না।

কিন্তু দীনেশ এই মিছিলে ঠিক অন্যরকম এক নাম। পেশাদার কূটনীতিক তিনি নন, বরং আপাদমস্তক রাজনীতিক। রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা তার, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে। এক সময় কংগ্রেস করেছেন, পরে জনতা দল। তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হয়েছিলেন তিনি। এখন তিনি ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপি শিবিরে। বর্ষীয়ান এবং নানা ঘাটের জল খাওয়া এই রাজনীতিককেই বাংলাদেশে মিশন প্রধান করে পাঠাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদী।

কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার লিখেছে, “বস্তুত, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের জমানায় দিল্লি এবং ঢাকার কূটনৈতিক সম্পর্কের আকাশে এক কালো মেঘ জমতে শুরু করেছিল। পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মসৃণ করতে উদ্যোগী হয়েছে দুই দেশই। এ অবস্থায় বাংলাদেশে হাই কমিশনার পদে দীনেশের নিয়োগের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।”

দীনেশ ত্রিবেদীর গুরুত্ব যেখানে

গুজরাটি দম্পতি হীরালাল ত্রিবেদী এবং উর্মিলাবেন ত্রিবেদীর ছোট ছেলে দীনেশ কথা বলেন ঝরঝরে বাংলায়। বাংলাভাষী দীনেশ শুধু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কেই নয়, সমগ্র বাঙালি সংস্কৃতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।

হিমাচল প্রদেশের বোর্ডিং স্কুল থেকে পড়াশোনার পর কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে কমার্সে স্নাতক ডিগ্রি নেন দীনেশ। তারপর যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে করেন এমবিএ।

গত শতকের আশির দশকে কংগ্রেসে যোগ দেন তিনি। কিন্তু ১৯৯০ সালে চলে যান জনতা দলে। ১৯৯০-৯৬ পর্যন্ত তিনি রাজ্যসভায় জনতা দলের সাংসদ ছিলেন। ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন, সেই দলে যোগ দেন দীনেশ এবং দলের প্রথম সাধারণ সম্পাদক হন।

২০০২-০৮ পর্যন্ত রাজ্যসভায় তৃণমূলের সাংসদ ছিলেন দীনেশ। ২০০৯ সালে ব্যারাকপুর থেকে তৃণমূলের হয়ে লোকসভা ভোটে প্রার্থী হন। ওই আসনে জিতে কেন্দ্রের মনমোহন সিংহ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রীও হন। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে জেতার পর মমতা রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়লে সেই দায়িত্ব সামলান দীনেশ। কিন্তু রেলের ভাড়া বাড়ানোয় তার উপর ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন মমতা। তখন তাকে রেলমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

২০১৯ সালে ব্যারাকপুর থেকে তিনি আবার তৃণমূলের প্রার্থী হন। কিন্তু সে বার বিজেপির অর্জুন সিংহের কাছে হেরে যান। তার পর তৃণমূল তাকে আবার রাজ্যসভায় পাঠায়। কিছু দিন পর তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় দীনেশের। ২০২১ সালে তিনি যোগ দেন গেরুয়া শিবিরে।

এই নিয়োগ কেন গুরুত্বপূর্ণ

আনন্দবাজার যেমন লিখেছে, অন্তর্বর্তী সরকার-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে তারেক রহমানের জমানায় নয়াদিল্লির এই নিয়োগ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। তেমনি বাংলাদেশের খ্যাতনামা সাংবাদিক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর চোখেও এর তাৎপর্য ধরা পড়েছে।

তিনি এক কলামে লিখেছেন, “দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে পরবর্তী হাই কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে ভারত তার কূটনৈতিক কর্মধারায় একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল।

“একজন পেশাদার জ্যেষ্ঠ কূটনীতিবিদকে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব দেওয়ার দীর্ঘদিনের রীতি থেকে বেরিয়ে এসে ভারত হয়ত এটাই বোঝাতে চাইছে যে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিছক আমলাতান্ত্রিক দক্ষতা আর যথেষ্ট নয়, প্রকাশ্য রাজনৈতিক মিথস্ক্রিয়াও প্রয়োজন।”

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতবিরোধিতার রব সবসময় থাকলেও নয়া দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের বড় ধরনের টানাপোড়েন কখনও ছিল না। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর সম্পর্কের উষ্ণতা অতীতের সব সময়কে ছাড়িয়ে যায়।

দিল্লির ক্ষমতা বদলে কংগ্রেস সরে বিজেপি এলেও শেখ হাসিনার সঙ্গে সম্পর্ক একই মাত্রায় থাকে। মনমোহন সিং কিংবা মোদী, দুজনই শেখ হাসিনাকে আস্থায় নিয়েই চলেন।

কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতন এবং শেখ হাসিনার দিল্লিতে আশ্রয়গ্রহণের পর সম্পর্কে দেখা দেয় টানাপোড়েন, তাতে এতটাই বরফ জমে যে এতটা নাজুক সম্পর্ক আগে কখনও দেখা যায়নি।

দীর্ঘদিন বিবিসিতে কাজ করে আসা তৌফিক ইমরোজ খালিদীর দৃষ্টিতে, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে স্পষ্টতই আনাড়ি মুহাম্মদ ইউনূস এবং সমভাবে অযোগ্য ও অপরিণত তার সহযোগীদের নেতৃত্ব ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি স্থিতিশীল ও মজবুত সম্পর্কে গুরুতর ধাক্কা দিয়ে গেছে। সে সময় ভারত সম্পর্কে তার প্রকাশ্য মন্তব্যগুলো প্রায়ই ছিল আলঙ্কারিক, যা প্রায় দুই দশক ধরে অনেক যত্নে গড়ে ওঠা পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বোঝাপড়ার কাঠামোকে চাপের মধ্যে ফেলে দেয়।

অথচ ভারতের ‘সবার আগে প্রতিবেশী’ নীতি, ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ কৌশল এবং বঙ্গোপসাগরীয় ভূরাজনীতির প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ। এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশে বিএনপির নতুন সরকার আসার পর রাষ্ট্রদূত বাছাইয়ে নতুনত্ব দেখাল বাংলাদেশ।

গঙ্গা চুক্তি যখন মেয়াদোত্তীর্ণের পথে, তিস্তা চুক্তি যখন ঝুলছে দশক ধরে, তখন ত্রিবেদীর অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে বলে মনে করার সুযোগ আছে।

তবে তৌফিক ইমরোজ খালিদী মনে করছেন, দীনেশ ত্রিবেদীকে বেছে নেওয়ার পেছনে তিস্তার বাইরেও বৃহত্তর একটি উদ্দেশ্য রয়েছে, আর তা হল প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার নানা ক্ষেত্র নিয়ে ব্যস্ত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে রাজনৈতিকভাবে আরও গতিশীল করা। বর্তমান সংবেদনশীল পরিস্থিতি মোকাবেলায় একজন কূটনৈতিক দূতের চেয়ে রাজনৈতিক দূত তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর হতে পারেন।

“পেশাদার কূটনীতিকরা অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক সতর্কতার বেড়াজালে আটকে যান। কিন্তু মিস্টার ত্রিবেদীর মতো একজন রাজনৈতিক পক্ষগুলোর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হতে পারেন, বয়ান তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারেন এবং এমন মাত্রার নমনীয়তা দেখাতে পারেন, যা অনেক সময় আমলাতান্ত্রিক চ্যানেলগুলোতে থাকে না।”

যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে ভারত, পাকিস্তান এমনকি বাংলাদেশেও রাজনীতিককে রাষ্ট্রদূত নিয়োগের নানা উদাহরণ টানেন দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক কূটনীতির গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে আসা তৌফিক ইমরোজ খালিদী।

তবে এমন ক্ষেত্রে যে ঝুঁকি আছে, তাও মনে করিয়ে দেন তিনি। তার মতে, অতিরিক্ত রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা অনেক সময় হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, বিশেষ করে এমন একটি দেশে, যেখানে সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে গভীর বিতর্ক চলমান। ফলে তার মেয়াদের সাফল্য শুধু তার কর্মকাণ্ডের ওপর নয়, বরং সেই কর্মকাণ্ডকে কী চোখে দেখা হচ্ছে তার ওপরও নির্ভর করবে।

ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর সম্পর্কের দিকটি দেখিয়ে তৌফিক ইমরোজ খালিদী লিখেছেন, অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা খাতে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা এ অঞ্চলে কৌশলগত প্রতিযোগিতাকে তীব্রতর করেছে। এর জবাবে ভারত সাধারণত সংযোগ, অভিন্ন ইতিহাস এবং ভৌগোলিক নৈকট্যের ওপর গুরুত্ব দেয়। এবার একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিল্লি হয়ত আরও জোরালোভাবে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার আগ্রহের কথাই বলতে চাইছে, আর সেটা সংঘাতের মাধ্যমে নয়, বরং সর্বোচ্চ রাজনৈতিক স্তরে সম্পৃক্ততা গভীর করার মাধ্যমে।

তবে নরেন্দ্র মোদি এক ধরনের জুয়া খেলল বলেই ইঙ্গিত করেছেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। তার ভাষায়, একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদকে বেছে নিয়ে ভারত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে- তা হল গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারা কূটনীতির প্রচলিত রীতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে প্রস্তুত।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads