রাজনীতির পাঁকে পড়ে ‘মঙ্গল’ ঝরিয়ে ‘আনন্দ’ পেরিয়ে এবার ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’

পহেলা বৈশাখে চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা। ফাইল ছবি
পহেলা বৈশাখে চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা। ফাইল ছবি

“এটা নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে”- বলছিলেন লেখক-কলামনিস্ট মহিউদ্দিন আহমদ। এখানে ‘এটা’ হচ্ছে মঙ্গল শোভাযাত্রা, যা নিয়ে চলছে তুমুল বিতর্ক।

বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এবার পহেলা বৈশাখের এই শোভাযাত্রার নাম হয়েছে বৈশাখী শোভাযাত্রা। এই নামেই মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বের হবে এই শোভাযাত্রা।

নাম পরিবর্তন অবশ্য এই প্রথম নয়, এই শোভাযাত্রা থেকে মঙ্গল শব্দটি বাদ পড়েছিল গত বছর মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। সেই নাম বাদ দেওয়ার পক্ষে নানা যুক্তিও তখন দেখিয়েছিলেন তৎকালীন সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।

নগরে বৈশাখ বরণের অনুসঙ্গ হয়ে ওঠা মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন আলোচনায় উঠে আসার মূল কারণটি হচ্ছে, এই ‘মঙ্গল’ নিয়ে ইসলামি বিভিন্ন দল ও সংগঠনের আপত্তি। তারা বলে আসছিল, এই মঙ্গল শোভাযাত্রা ‘হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি’। তাদের সন্তুষ্ট করতেই এই নাম পরিবর্তন বলে অনেকেই মনে করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ এই শোভযাত্রার আয়োজন করে এলেও এটা পহেলা বৈশাখের সকালে অনেকটা সরকারি কর্মসূচিতেই রূপ নিয়েছে। জাতিসংঘ সংস্থা ইউনেস্কোর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায়ও সগৌরবে স্থান নিয়েছে বাংলাদেশের এই আয়োজন।

এখন অপরাজনীতির কবলে পড়লেও এই শোভাযাত্রার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনীতি। ১৯৮৯ সাল, তখন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে, সেই ১৩৯৬ বাঙ্গাব্দের পহেলা বৈশাখে চারুকলা থেকে বেরিয়েছিল প্রথম শোভাযাত্রা।

তা ছিল প্রতিবাদের এক ধরনের প্রকাশ। গত শতকের ষাটের দশকে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের যেমন সূচনা হয়েছিল পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে, তেমনি মঙ্গল শোভাযাত্রাও ছিল লড়াইয়ের হাতিয়ার।

১৯৮৯ সালে প্রথমবার বেরিয়েছিল আনন্দ শোভাযাত্রা নামে। ছবি: সংগৃহীত

এরপর পহেলা বৈশাখ উদযাপনের অনুসঙ্গ হয়ে হাত ধরাধরি করে চলছিল রমনা বটমূলের অনুষ্ঠান এবং মঙ্গল শোভাযাত্রা। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর তাতে ছেদ ঘটে। অভ্যুত্থানের পর ইসলামী দলগুলোর উত্থানের পর দেখা গেল, ২০২৫ সালের পহেলা বৈশাখে শোভাযাত্রার নাম থেকে মঙ্গল ছেঁটে ফেলা হয়েছে।

তখন সরকারের পক্ষে যুক্তি দেখানো হয়, এটা প্রথম যখন শুরু হয়েছিল, তখন আনন্দ শোভাযাত্রা নামেই হয়েছিল। সুতরায় এখন আদি নামে ফেরত যাওয়া হলো।

তবে এই যুক্তি সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। এটা সেই মৌলবাদী শক্তিকে খুশি করার চেষ্টা হিসেবেই দেখা হয়, যারা দীর্ঘদিন ধরে এই শোভাযাত্রাকে অনৈসলামিক দাবি করে তা নিষিদ্ধের পক্ষে মত দিয়ে আসছিল।

আবার গত বছরের শোভাযাত্রায় ‘ফ্যাসিবাদের প্রতিকৃতি’ হিসেবে শেখ হাসিনার আদলে একটি মোটিফ তৈরি করা নিয়েও বিতর্ক উঠেছিল।

আনন্দ শোভাযাত্রা নামে ১৯৮৯ সালে শুরু হলেও কয়েক বছর পরই এটি মঙ্গল শোভাযাত্রা নাম নেয়। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পটভূমিতে ‘অমঙ্গলকে দূর করে মঙ্গলের আহ্বান’ জানিয়েই এ্ই নামকরণ।

এই বছর বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পর আবার মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে ফেরার আশা করা হলেও শেষ অবধি তা হয়নি। তারা নতুন নাম দেয় বৈশাখী শোভাযাত্রা।

এই নামকরণের পক্ষে যে যুক্তি বর্তমান সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী দেখিয়েছেন, তা অনেকটা বাঙালি জাতীয়তাকে বাংলাদেশি করে ফেলার মতো।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আনন্দ আর মঙ্গল…সবকিছুই আনন্দ, সবকিছুই মঙ্গল…বৈশাখ একটি আনন্দঘন পরিবেশ। অথচ এই নামটা নিয়ে দুটো পক্ষ হয়ে মারাত্মকভাবে একটি বিভাজন তৈরি হয়েছে। আমরা বিভাজন চাই না, অনৈক্য চাই না। আমরা ঐক্য ও বৈচিত্র্য চাই। বিভিন্ন জাতিসত্তা ও সংস্কৃতি তুলে ধরতে চাই। তাই, এটি অবসান করে আমরা নাম দিলাম বৈশাখী শোভাযাত্রা।’

তবে এটার পেছনে যে রাজনীতি রয়েছে, তা তুলে ধরে মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “মঙ্গল শোভাযাত্রার মাঝে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী অন্য একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর রাজনীতির গন্ধ পান। সেকারণ বর্তমান সরকার নিরাপদ অবস্থানে থাকার জন্য তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ নাম আবিষ্কার করলো।

মঙ্গল শোভাযাত্রার মোটিফের জন্য ইসলামী দলগুলো এর বিরোধিতা করে আসছে। ফাইল ছবি

“কিন্তু যারা এটিকে মঙ্গল বলে, তারা যদি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তাহলে তখন এই নাম বদলে যাবে আবার। আমাদের এখানে হলের নাম বদলায়, পার্কের নাম বদলায়, বিমানবন্দরের নাম বদলায়। এটা পিওর রাজনীতি।”

বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন এই নাম পরিবর্তনে ক্ষোভ জানিয়েছে। পহেলা বৈশাখে ধানমণ্ডিতে মঙ্গল শোভাযাত্রার কর্মসূচি দিয়েছে তারা, তাতে চারুকলার সাবেক শিক্ষার্থীদের অনেকেই যোগ দিচ্ছেন।

মহিউদ্দিন বলেন, মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে আপত্তির মূল কারণ ছিল এর মাঝে বিভিন্ন মোটিফ ব্যবহার করা নিয়ে। একদল লোক বললো, এটা হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি। তারপর গতবছর আনন্দ শোভাযাত্রা ফেরানো হলো। কিন্তু আনন্দ শব্দের মাঝেও চাইলে হিন্দুয়ানী গন্ধ পাওয়া যাবে।

কিন্তু নাম বদলে একটি সমস্যা দেখা দিয়েছে। তা হলো ইউনেস্কোর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকা নামটি মঙ্গল শোভাযাত্রা নামেই আছে। ফলে নাম বদলের প্রভাব জাতিসংঘের স্বীকৃতিতে পড়বে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে মন্ত্রী নিতাই বলেন, “আমরা তাদেরকে জানিয়ে দেব যে এখন শোভাযাত্রার নাম এটা। এটা এমন কিছু না।”

মজার বিষয় হলো মঙ্গল নাম সরে গেলেও এবার পহেলা বৈশাখ পড়েছে মঙ্গলবার। ফলে শোভাযাত্রাটি মঙ্গলবারই হচ্ছে। অর্থাৎ মঙ্গল নামটি বিযুক্ত করা যাচ্ছে না।

তা দেখিয়ে সোশাল মিডিয়ায় অনেকে কটাক্ষ করে বলছেন, তাহলে মঙ্গলবার নামটিও বদলে ফেলা যায়!

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads