‘দিদি’ জমানার অবসান হলো পশ্চিমবঙ্গে; এখন ‘দাদা’ জমানা শুরুর অপেক্ষা। যেমন ধারণা করা হয়েছিল, তেমনই হচ্ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক সময়ের সহচর থেকে প্রতিপক্ষ বনে যাওয়া শুভেন্দু অধিকারীই এই রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হতে চলেছেন।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দিল্লি থেকে উড়ে এসে শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভায় বিজেপির নবনির্বাচিত সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করে দলের বিধায়ক পরিষদের নেতা হিসেবে শুভেন্দুর নাম ঘোষণা করেন। এর মধ্যদিয়ে তার মুখ্যমন্ত্রী হওয়া নিশ্চিত হলো। সেই সঙ্গে বাংলা অনুপ্রবেশমুক্ত করার ঘোষণাটিও দিলেন এই প্রথম পশ্চিম বাংলার ক্ষমতায় বসতে যাওয়া বিজেপির ‘চানক্য’ অমিত শাহ।
তিনি বলেছেন, “ভারতীয় জনতা পার্টি বাংলার মানুষকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, শুধু বাংলা নয়, সমগ্র দেশ থেকেই আমরা একে একে সমস্ত অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে বের করে দেব এবং দেশকে অনুপ্রবেশমুক্ত করব … অনুপ্রবেশমুক্ত বাংলা, নিরাপদ নারী এবং নিরাপদ জনতা-এটাই আমাদের অঙ্গীকার।”
এপ্রিলে দুই দফায় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যবিধান সভায় ভোটগ্রহণ শেষে গত ৪ মে গণনা ও ফল প্রকাশের পরই পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যায়। দেখা যায়, দেড় দশক ধরে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস উড়ে গেছে গেরুয়া ঝড়ে।
হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির এই রাজ্যের প্রথম সরকারে নেতৃত্বদাতা হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর নামটিই শোনা যাচ্ছিল বেশি। তখন থেকে বাংলাদেশ নিয়ে তার গত দুই বছরে করা নানা বক্তব্যও আসছিল আলোচনায়। বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে ‘বৈধ প্রধানমন্ত্রী’ বলার কথাটি।
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাও বিবৃতি দিয়ে শুভেন্দুকে অভিনন্দন জানান। আওয়ামী লীগের ফেইসবুক পেজে শুক্রবার প্রকাশিত সেই বিবৃতির ভাষা ছিল এমন- ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভাপতি ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা আজ এক অভিনন্দন বার্তায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রতিনিধিগণসহ বিজয়ী সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।
“বার্তায় তিনি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপির নেতা শ্রী শুভেন্দু অধিকারীকে বিশেষভাবে অভিনন্দন জানিয়েছেন। পাশাপাশি বিজয়ী সকলের উত্তরোত্তর সাফল্য এবং পশ্চিমবঙ্গ-সহ সমগ্র ভারতের জনগণের সমৃদ্ধি ও কল্যাণ প্রত্যাশা করেন।”
মমতার কাছ থেকে দূরে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার শুভেন্দুর রাজনীতিতে হাতেখড়ি কংগ্রেস দিয়ে। পরে অবশ্য বাংলা কংগ্রেসে যোগ দেন তিনি।
গত শতকের শেষ দিকে মমতা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তৃণমূল কংগ্রেস গড়ে তুললে শুভেন্দু ‘দিদি’র হাত ধরেন। তার আগে ১৯৯৫ সালে কাঁথি পৌরসভার কাউন্সিলর হয়েছিলেন শুভেন্দু। পরে ওই পৌরসভার প্রধানও হন।
২০০৬ সালে কাঁথি দক্ষিণ আসন থেকে জিতে প্রথম গিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভায়। অবশ্যই তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে। পূর্ব মেদিনীপুরের যে নন্দীগ্রামে শিল্পের জন্য কৃষিজমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে বামফ্রন্ট সরকারের পতনের শুরুটা হয়েছিল, সেই নন্দীগ্রামে আন্দোলনের নেতা ছিলেন শুভেন্দু।

কৃষি জমি রক্ষার লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার পর ২০০৯ সালে পূর্ব মেদিনীপুর থেকে লোকসভার সদস্য হন শুভেন্দু, সেবারও জোড়া ফুল প্রতীকে। দিল্লিতে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। ২০২৬ সালে নন্দীগ্রাম থেকে বিধান সভা সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর মমতা প্রথমে রাজ্যের পরিবহনমন্ত্রী করেন শুভেন্দুকে। দুই বছর পর সেচ ও জলসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। এরমধ্যে চিট ফান্ড কেলেঙ্কারিতে শুভেন্দুর নাম আসে। আবার মমতার ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে শুভেন্দুর বিরোধ শুরু হয়। তখন তৃণমূল ছেড়ে পদ্ম শিবিরে নাম লেখান শুভেন্দু।
২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর অমিত শাহর হাত ধরে বিজেপিতে যোগ দেন তিনি। তিনি নিজে যতটা না বিজেপির, তার চেয়ে বেশি ‘অমিত শাহর লোক’ হিসেবে পরিচয় দেন। বিজেপিতে যোগ দিয়ে ২০২১ সালের বিধান সভার নির্বাচনে মমতাকে চ্যালেঞ্জ জানান শুভেন্দু। নন্দীপুর আসনে মমতাকে হারিয়েও দেন তিনি। হন বিধান সভার বিরোধী নেতা। রোখের বশে এবারও মমতা নন্দীগ্রামে প্রার্থী হন, তবে এবারও তার কপালে শুভেন্দুর কাছে হারই লেখা ছিল। শুভেন্দু এবার দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে মমতার নিজের আসন ভবানীপুরে প্রার্থী হন এবং নাটকীয়ভাবে সেখানেও জয়ী হন। এবার মমতার কাছ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর আসনটিও নিয়ে নিচ্ছেন তিনি।
শুভেন্দুর যত কথা ২০২৪ সালে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নাজুক হয়ে ওঠে। বিজেপি নেতা শুভেন্দু তখন সরব হয়ে উঠেছিলেন। শেখ হাসিনাকে বৈধ প্রধানমন্ত্রী বলার পাশাপাশি বাংলাদেশকে হুমকি দিয়ে একের পর এক বক্তব্য দিতে থাকেন তিনি। তার সেই বক্তব্যগুলো তুলে ধরেছে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার।
২ ডিসেম্বর, ২০২৪: সম্মিলিত সনাতন জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মুক্তির দাবিতে সরব ছিলেন শুভেন্দু। চিন্ময়কে মুক্তি না দিলে সাময়িকভাবে পেট্রাপোল স্থলবন্দর বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন শুভেন্দু। এতে কাজ না হলে নতুন বছর থেকে স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে আলু ও পেঁয়াজ বাংলাদেশে আসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেন তিনি।
বেনাপোল স্থলবন্দরের ওপারে পেট্রাপোলে বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, “আজ সিনেমার ট্রেলার দেখিয়ে গেলাম। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার বন্ধ না হলে এবং চিন্ময় কৃষ্ণ দাস মুক্তি না পেলে পাঁচ দিন স্থলবন্দর বন্ধ থাকবে। তারপর ২০২৫ সালে লাগাতার বন্ধ করে দেওয়া হবে। আলু-পেঁয়াজ কী করে যায়, তা আমরা দেখব।”
৮ ডিসেম্বর ২০২৪: এক সমাবেশে শুভেন্দু বলেছিলেন, “কতগুলো অর্বাচীন ঢাকাতে দাঁড়িয়ে কাল বলছে, চার ঘণ্টার মধ্যে নাকি কলকাতা দখল করবে। ওই লোকগুলো কোন স্কুল-কলেজে পড়েছে বলে জানা নেই আমার। বিজ্ঞানের ন্যূনতম ধ্যান-ধারণা আছে বলে জানা নেই আমার। কতগুলো মাদরাসাতে পড়েছে, ওই জন্য ঢাকা থেকে ওই ধরনের কথাবার্তা বলছে।’ ৯ ডিসেম্বর ২০২৪: আরেক বিক্ষোভ সমাবেশে শুভেন্দু বলেন, “বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন তারা ভারতকে শত্রু রাষ্ট্র ঘোষণা করার কথা বলছে, হিজবুত তাহরীর—এরা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল ৭১ সালে। তখন ভারত ছেড়ে দিয়েছিল। এবারও এরা ধরা পড়বে, এবার যাতে ছাড়া না হয়। যে ভাষায় উত্তর দিলে এরা সন্তুষ্ট হয় সেই ভাষায় উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত থাকব।” তিনি আরও বলেছিলেন, “ওখানে মৌলবাদী জঙ্গিদের হাতে রাষ্ট্রযন্ত্র চলে গেছে। আমেরিকা এসে ওসামা বিন লাদেন বা হামাস প্রধানের যে অবস্থা করেছে, সেই একই অবস্থা বাংলাদেশের জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ, এই র্যাডিক্যাল ফোর্সকে শিকড়সুদ্ধ তুলে উপড়ে ফেলার কাজ বিশ্ব সমাজ করবে।”
১০ ডিসেম্বর ২০২৪: পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার ঘোজাডাঙ্গা সীমান্ত এলাকায় একটি কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে শুভেন্দু বলেন, “হাসিনা ওয়াজেদ বৈধ প্রধানমন্ত্রী। এরা অবৈধ। হাসিনা ওয়াজেদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই ঢাকাতে শাহজালাল এয়ারপোর্টে নামবেন।”
তিনি আরো বলেছিলেন, “আমরা ওই দেশ সৃষ্টি করেছি। আমাদের ১৭ হাজার সেনা বলিদান দিয়েছে। আমরা মুজিবুর রহমানকে প্রোটেকশন দিয়েছি। আমাদের দেশ দালাই লামাকে প্রোটেকশন দিয়েছে। ভারত এটা করে। হাসিনা ওয়াজেদকে সরাতে গেলে আরেকটা ভোটে নির্বাচনে গিয়ে সরাতো। এটা অবৈধ কেয়ারটেকার। আমার বিশ্বাস, আমেরিকা-ভারতসহ মানবতাবাদী দেশগুলো এগিয়ে এসে অবৈধ সরকারকে উৎখাত করবে।”
১২ জানুয়ারি ২০২৫: বাংলাদেশের দিকে ইঙ্গিত করে শুভেন্দু বলেছিলেন, “ভারত এখন পৃথিবীর তৃতীয় সামরিক শক্তিশালী দেশ। ভারত অত্যন্ত দায়িত্বশীল দেশ, দুর্বল দেশকে আক্রমণ করে না। এরা জানে না যে সেনা পাঠানোর দরকার হবে না। আমরা এখন ড্রোনে এত এত বেশি উন্নত, এরা জানেই না। গোটা পাঁচ-সাতেক ড্রোন পাঠিয়ে দিলেই ওদের কাজ শেষ হয়ে যাবে। ওসামা বিন লাদেনের থেকেও খারাপ অবস্থা হবে।”
১৯ জানুয়ারি ২০২৫: পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বারাসাতে হিন্দু সম্মিলিত সংঘের এক অনুষ্ঠানে এসে স্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচির উদ্বোধনের সময় শুভেন্দু বলেন, “ইউনূস যুদ্ধ লাগিয়ে রাষ্ট্রপ্রেমের জিকির তুলে টিকে থাকতে চাইছে। কিন্তু ভারতীয় বিএসএফ সংযমের পরিচয় দিচ্ছে। কারণ বাংলাদেশের সঙ্গে যুদ্ধ ভারতের কাছে তো কয়েকদিনের ব্যাপার নয়, কয়েক মিনিটেই ফয়সালা হয়ে যাবে। চিমটি কাটছে, আঁচড় কাটছে—আমরা বড় ভাই হিসেবে সহ্য করছি।”
২২ ডিসেম্বর ২০২৫: বাংলাদেশে দীপু দাস হত্যায় প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভে শুভেন্দু বলেন, “আমরা এখানে ভারত সরকারের কমার্স অফিসেও যাব। গিয়ে বলব এক টন এক্সপোর্ট পারমিটও এখান থেকে দেওয়া যাবে না। এক কেজি পেঁয়াজও ওখানে পাঠানো যাবে না। যতক্ষণ না দীপু দাসের হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা হয়।”
২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫: দীপু দাস হত্যার প্রতিবাদে আয়োজিত আরেক কর্মসূচিতে শুভেন্দু বলেন, “এই লোকদের অবশ্যই একটা শিক্ষা দিতে হবে। ঠিক যেমনটা ইসরায়েল গাজাকে দিয়েছে। আমাদের সরকার হিন্দু এবং দেশের স্বার্থে কাজ করছে। অপারেশন সিঁদুরে আমরা যেভাবে পাকিস্তানকে শিক্ষা দিয়েছিলাম, ঠিক তেমনি একটা শিক্ষা তাদেরও দিতে হবে।”
আরও খবর:



