পশ্চিমবঙ্গে পালাবদল কি বদলে দেবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

ভারতে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি প্রথম সরকার গড়ল পশ্চিমবঙ্গে। সেই অনুষ্ঠানে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা দিলেন পশ্চিমবঙ্গকে অনুপ্রবেশকারী মুক্ত করার।

তিনি বলেন, “ভারতীয় জনতা পার্টি বাংলার মানুষকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, শুধু বাংলা নয়, সমগ্র দেশ থেকেই আমরা একে একে সমস্ত অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে বের করে দেব এবং দেশকে অনুপ্রবেশমুক্ত করব।”

এই অনুপ্রবেশকারী বলতে বাংলাদেশিদের বোঝানো হয়ে থাকে। মুসলমানদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর কথা বিজেপি নেতারা হরহামেশা বলে আসছেন। আবার বিজেপির যিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন, সেই শুভেন্দু অধিকারী গত দেড় বছর ধরে বাংলাদেশকে আক্রমণ করে একের পর এক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছিলেন।

ফলে জুলাই অভ্যুত্থানের পর দুই দেশের সম্পর্কে জমে থাকা বরফ বাংলাদেশে নতুন সরকার আসার পর কাটার লক্ষণ দেখা দিয়েছিল, তাতে আবার মেঘ জমার আশঙ্কা জেগে উঠেছে অনেকের মনে।

এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পররাষ্ট্র নীতির রাতারাতি বদলে না গেলেও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের সরকারকে সজাগ থাকতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বের মধ্যে যদি আন্ডারস্ট্যান্ডিং থাকে, তাহলে ফরেন পলিসির ক্ষেত্রে আমূল কোনো পরিবর্তন আসবে না।”

তবে সাবেক কূটনীতিক মুন্সি ফয়েজ আহমদ এক্ষেত্রে পুরোপুরি আশাবাদী হতে পারছেন না। কারণ তিনি মনে করছেন, দুই দেশই সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

ফয়েজ আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে ভারতের সরকারের সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছায়নি। দুইপক্ষ থেকেই ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে সুসম্পর্কের। কিন্তু এটার জন্য দুই দেশের মাঝে উচ্চপর্যায়ের সফর বিনিময় হলে বুঝতে পারবো সেই অঙ্গীকারটা আছে এবং তারপরে নির্দিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে অগ্রগতির চিন্তা তখন করা যাবে।”

পারস্পরিক এই সম্পর্কের মধ্যে নানা বিষয় জড়িত আছে। তার মধ্যে রয়েছে তিস্তার পানি বণ্টন। যে চুক্তি ঝুলে আছে দেড় দশক ধরে।

ভারতের নরেন্দ্র মোদীর কেন্দ্রীয় সরকার এই চুক্তিতে রাজি হলেও পশ্চিমবঙ্গের সদ্যসাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়রে কারণে তা আটকে রয়েছে। আর সেটাকেই কারণ দেখাচ্ছিল দিল্লি।

এখন কী হবে- প্রশ্নে লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, “কেন্দ্রীয় সরকার ছাড়া কোনো চুক্তিই হওয়া সম্ভব নয়। যেহেতু এটা বিজেপি নিয়ন্ত্রিত সরকার ছিল না, তাই মমতাকে এটার জন্য দায়ী করা বিজেপির পক্ষে সহজ ছিল।”

শ্চিমবঙ্গের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর নাম ঘোষণার পর তা সঙ্গে অমিত শাহ। ছবি: পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির ফেইসবুক পাতা

ফয়েজ আহমদ অবশ্য মনে করেন, এখন তিস্তা চুক্তি নিয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখতে পাওয়া যাবে। কারণ এখন কেন্দ্রে ও রাজ্যে একই দলের সরকার।

সীমান্তে নিরাপত্তা দুই দেশের মধ্যে টানাপড়েনের আরেকটি বিষয়। বাংলাদেশের বিএনপি সরকার সীমান্ত নিরাপত্তাসহ সব ক্ষেত্রেই ভারতের সঙ্গে আলোচনা করতে ইতিবাচক বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

ফয়েজ আহমদের মতে, সাময়িকভাবে উত্তেজনা এখন হলেও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় যাওয়ার পরে পরবর্তীতে সীমান্তের এপাশে-ওপাশে বড় রকমের আর কোনো ঝামেলা বা উত্তেজনা হবে না।

নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিজেপি নেতারা সে দেশের মুসলমানদের বাংলাদেশে পুশইন করার হুমকি দিয়েছিলেন। তাই নির্বাচনের পর বাংলাদেশও সীমান্তে পাহারা জোরদার করে।

তবে সাবেক কূটনীতিক ফয়েজ আহমদ বলছেন, ভোটের রাজনীতিতে করা কোনো মন্তব্য পরবর্তীতে সে দেশের পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে না।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছিল। ওই সময়ে ভারতের আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশন কার্যালয়ে হামলা ও পতাকা পোড়ানো, ভারতের ভিসা বন্ধ হওয়াসহ নানা ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ককে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি করে।

কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দুপক্ষই সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় দুই দেশের সম্পর্কের বিষয়টি বাংলাদেশের সরকার কীভাবে দেখছে, তা নিয়েও আলোচনা ওঠে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ তা নিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারে যেই থাকুক না কেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে বাংলাদেশ একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করবে।

এ সম্পর্কিত আরও খবর:

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads