তুরাগে আওয়ামী লীগের ৭ জনের লাশের খবরে তোলপাড়, আসলে কী

আওয়ামী লীগ সমর্থকরা এমন প্রতীকী ছবি তৈরি করে তা ফেইসবুকে দিয়ে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সমর্থকরা এমন প্রতীকী ছবি তৈরি করে তা ফেইসবুকে দিয়ে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

ঢাকার পাশের তুরাগ নদীতে আওয়ামী লীগের সাতজনের লাশ ভাসার খবরে তোলপাড় চলছে সোশাল মিডিয়ায়। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের অভিযোগ, মিছিল থেকে এই সাতজনকে ধরে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেয় পুলিশ ও বিএনপি সমর্থকরা। তবে পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করছে।

তবে যা রটে, তার কিছু তো বটেই, এমন প্রবাদের ভিত্তি পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে আসা প্রতিবেদনে। তাতে তিনজনের লাশ উদ্ধারে খবর আসছে। তাদের আওয়ামী লীগ সম্পৃক্ততার কথাও জানা যাচ্ছে। তবে তিনটি ঘটনায়ই পুলিশ অপমৃত্যুর মামলা করেছে।

অভিযোগ উঠেছে, ঘটনা ধামাচাপা দিতে তৎপরতা চালাচ্ছে পুলিশ। পিকনিক করতে গিয়ে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা সাজানো হচ্ছে। মৃতদের পরিবারগুলোও ভয়ে কিছু বলছে না।

আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ছিল গত ২৩ জুন। জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে রেখেছে সরকার। ফলে দলটির প্রকাশ্য তৎপরতা চালানোর সুযোগ নেই। তবে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলটির নেতারা সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে মিছিল-সমাবেশের কর্মসূচি দিয়েছিলেন।

আওয়ামী লীগের কর্মীদের রাজপথে নামা ঠেকাতে বিএনপি সরকার তৎপর হয়ে ওঠে। পুলিশকে সতর্ক করার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে বিজিবি ও সেনাবাহিনী নামানো হয়। জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিও রাজপথে থাকার ঘোষণা দেয়।

এতসব প্রতিকূলতার মাঝেও বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা ঝটিকা মিছিল নিয়ে নামে। বিভিন্ন স্থানে পুলিশ অনেককে গ্রেপ্তারও করে। তারমধ্যেই রাজধানীর পশ্চিম পাশে আশুলিয়া এলাকায় মিছিল থেকে সাতজনকে ধরে হত্যা করে তুরাগ নদীতে ফেলে দেওয়া হয় বলে আওয়ামী লীগের অভিযোগ।

পরিকল্পিত খুন, বলছে আওয়ামী লীগ

আওয়ামী লীগ সমর্থকদের গত তিন দিন ধরে তুরাগ নদীতে সাতজনকে খুনের অভিযোগ করে আসছে। ফেইসবুকে বিভিন্ন পেজ ও আইডি থেকে ‘রক্তাক্ত নদী তুরাগ’ এমন ফটোকার্ড পোস্ট করা হচ্ছে।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল একটি পোস্ট দিয়েছেন, যা আওয়ামী লীগের ফেইসবুক পেজে শেয়ার করা হয়েছে।

নওফেল লিখেছেন, আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করতে দলের তৃণমূল কর্মীরা নিজ উদ্যোগে মিছিল করেছে, মিটিং করেছে। এটি থামিয়ে দেওয়ার জন্য সারা দেশে পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করার পর আবার সেনাবাহিনী নামিয়েছে তারেক রহমানের বিএনপি সরকার। পাশাপাশি বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীসহ সরকারি ও বিরোধী দলের লোকজন মাঠে নেমেছে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন ঠেকানোর জন্য।

তার দাবি, ২২ জুন তুরাগ থানা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের একটি মিছিল হয়। এটি প্রতিহত করতে ‘বিএনপির সন্ত্রাসীরা’ ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওই মিছিল থেকে সাতজন নিখোঁজ হন। পরে তুরাগ নদীতে ৩ জনের অর্ধগলিত লাশ ভেসে উঠেছে। তাদের বেদম মারধর করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। আরও ৪ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছে।

“এসব হত্যাকাণ্ড বিএনপি পরিকল্পিতভাবে করছে। কারাগারের হত্যাগুলোও পরিকল্পিতভাবে করা হচ্ছে, যাতে আমাদের নেতাকর্মীদের দমিয়ে রাখা যায়.” বলেছেন নওফেল।

আওয়ামী লীগের পেজে রি-পোস্ট করা আরেকটি পোস্টে দাবি করা হয়, তুরাগ হত্যাকাণ্ড একটি সংঘবদ্ধ ঘটনা। এর সঙ্গে তুরাগ থানা বিএনপির নেতাদের পাশাপাশি আশুলিয়া থানা বিএনপি এবং আশুলিয়া থানা পুলিশ জড়িত।

এই পোস্টে আশুলিয়া থানার এক এএসআইসহ বিএনপির ১২ নেতার নাম দিয়ে বলা হয়েছে, এরাই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।

অভ্যুত্থানের পর নিষিদ্ধ হওয়া ছাত্রলীগ এক বিবৃতিতে এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে বলেছে, ২২ জুন ঢাকার তুরাগ থানায় যা ঘটেছে, তা মানুষের পক্ষে বিশ্বাস করা কিংবা মেনে নেয়া দুরূহ। তুরাগ থানা ছাত্রলীগের কর্মী আরিফুল, ৫৩ নং ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা বিপ্লব এবং ৫৩ নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের কর্মী সুমনকে পাশবিকভাবে পিটিয়ে হত্যা করে তুরাগ নদীতে ছুড়ে ফেলা হয়েছে, যেন তাঁরা মানুষ নন — আবর্জনা। এই দৃশ্য কোনো সভ্য রাষ্ট্রে সম্ভব নয়, কিন্তু আজকের বাংলাদেশে এটাই বাস্তবতা।

নিখোঁজ চারজনের মধ্যে একজন তুরাগ থানা শ্রমিক লীগের সভাপতি মো. মামুন সরকার বলে ছাত্রলীগ জানিয়েছে।

পুলিশের অস্বীকার

সোশঅর মিডিয়ায় ব্যাপক শোরগোলের পর ২৭ জুন শনিবার পুলিশ সদর দপ্তর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠায়। তাতে তুরাগ নদীতে আওয়ামী লীগ সমর্থক সাতজনের লাশ ভাসার খবর অস্বীকারের পাশাপাশি ভুয়া খবর ছড়ালে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।

ঢাকার তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার মো. সুমনের (গোল চিহ্নিত) এই ছবি ফেইসবুকে ঘুরছে। বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের মিছিলে এটাই তার শেষ ভিডিও ছিল।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “তুরাগ নদীতে ভাসছে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সাত নেতা-কর্মীর লাশ- শিরোনামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের কোনো ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। এ ধরনের মিথ্যা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সবার প্রতি বাংলাদেশ পুলিশ অনুরোধ জানাচ্ছে।”

অপপ্রচারকারীদের হুঁশিয়ার করে পুলিশ বলেছে, “একটি মহল এ ধরনের বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল নষ্ট করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। যারা এ ধরনের বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে তৎপর রয়েছে। কেউ এ ধরনের অপপ্রচারে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

তুরাগ থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তুরাগ নদের আশুলিয়া থানা এলাকা থেকে ২২ জুনের পর একটি লাশ উদ্ধার হয়েছে। ওই দিন মিছিল হয়েছিল, বেশ কিছু আসামি গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল, সবই হয়েছে আশুলিয়া থানা এলাকায়। তবে কারও মৃত্যুর কথা তার জানা নেই।

সংবাদমাধ্যমে যে খবর আসছে

গত কয়েকদিন ধরে দেশের বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যম বিষয়টি চেপে গেলেও শনিবার কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমে তুরাগ নদী থেকে কয়েকদিনে তিনটি লাশ উদ্ধারের কথা জানানো হয়।

প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৪ ও ২৫ জুন মোট তিনজনের লাশ তুরাগ নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তারা হলেন- ঢাকার তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার মো. সুমন (১৭), একই এলাকার আরিফ হাসান রাকিব (২৫) এবং রাজধানীর মিরপুর থানা এলাকার পশ্চিম মনিপুরের মোল্লাপাড়ার রনি মোল্লা (৩৫)।

আশুলিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন, ২৫ জুন দিবাগত রাতে আশুলিয়া বাজারের পাশে তুরাগ নদীর পাশের এক চক থেকে সুমনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই অপমৃত্যুর মামলা করেছেন।

ওসির ভাষ্য অনুসারে, ২২ জুন পিকনিকের কথা বলে সুমন বাসা থেকে বের হন। পরে তুরাগ নদীতে পড়ে যান। তিনি সাঁতার জানতেন না।

দারুস সালাম থানার ওসি মো. দুলাল হোসেন বলেন, নৌ পুলিশ তুরাগ নদী থেকে গত ২৪ জুন আরিফ হাসান রাকিবের লাশ উদ্ধার করে। এ ঘটনার নিহতের চাচা মো. আরশাদুল ইসলাম বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছেন।

আমিনবাজার নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই হুমায়ুন কবির বলেন, ২৪ জুন সকালে আরিফের লাশ উদ্ধারের পর দুপুরে দিয়াবাড়ি ঘাটে গোসলের সময় রনি মোল্লা ডুবে যান। ঘণ্টাখানেক পর তাকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় সাভার মডেল থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।

রনি মোল্লার বাবা কফিল উদ্দিন মোল্লা বলেন, উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় একটি হোটেলে কাজ করতেন রনি। হোটেলের লোকজন জানিয়েছেন, ২৪ জুন সকালে রনি হোটেল থেকে বের হয়েছিলেন। তিনি রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন না।

বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন বলা হয়, স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যে মৃত তিনজনের মধ্যে দুজন আওয়ামী লীগে যুক্ত ছিলেন।

শনিবার দুপুরে রানাভোলা এলাকায় সুমনের ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা যায়, ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ মো. শাহ আলম ও তার স্ত্রী। তারা এবং সুমনের আত্মীয়-স্বজনরা কোনো কথা বলতে রাজি হচ্ছিলেন না। সুমন কামারপাড়া আড়তে কাঁচামালের ব্যবসা করতেন বলে জানান তারা।

ফেইসবুকে সুমন আহমেদ চৌধুরী নামের একটি আইডি দেখানো হলে সেটি সুমনের বলে নিশ্চিত করেন পরিবারের সদস্য ও কয়েকজন প্রতিবেশী। ওই আইডিতে দেখা যায়, ছয় দিন আগে সর্বশেষ একটি পোস্ট। তা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিলের একটি ভিডিও। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় দলীয় কার্যক্রমের ভিডিও এই আইডিতে রয়েছে।

আরিফের চাচা মো. আরশাদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সে যে রাজনীতি (আওয়ামী লীগের) করতো, আমরা জানতাম না। মৃত্যুর পর কয়েকজন ভিডিও-ছবি দেখানোর পর জানছি যে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা। আমরা জানি না, কীভাবে মারা গেছে। সাঁতার খুব একটা ভালো পারতো না আরিফ। লাশ উদ্ধারের পরও মামলা করতে চাইনি। কিন্তু থানা পুলিশের একটা নিয়মের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাই মামলা করছি।’

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ads